ঝুমা যে একেবারে স্তব্ধ হয়ে যাবে, বিনয় সে ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত। তার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। হঠাৎ এত বড় একটা আঘাত সে কিভাবে সইবে, ভাবতেও শুধু অস্বস্তি নয়, ভীষণ কষ্টই হয়। তীব্র অপরাধবোধে নিজেকে হাজার বার ধিক্কার দিতে থাকে সে। ঝুমার মতো একটি নিষ্পাপ মেয়ের তার প্রতি বিশ্বাস, অগাধ আস্থাকে সে ভেঙে ধূলিসাৎ করে দিতে চলেছে। কলকাতায় গেলে তার গায়ে চেনাজানা সব মানুষ লম্পট, দুশ্চরিত্র, বিশ্বাসঘাতক– এই তকমাগুলো দেগে দেবে না? তখন কোন বিবরে মুখ লুকোবে বিনয়?
বিনয় নিশ্চিত, ঝুমার মা-বাবা এবং ওদের পরিবার তাকে একেবারেই ক্ষমা করবেন না। তাঁরা চরম অপমান করবেন। ঝুমার সঙ্গে বিয়েটা ভেঙে দিলে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে তাঁদের সামাজিক সম্মান কি এতটুকু থাকবে? তারাই বা কী করে মুখ দেখাবেন?
না, আর ভাবতে পারছে না বিনয়। কপালের দু’পাশের শিরাগুলো সমানে দপ দপ করছে। মনে হচ্ছে সমস্ত শিরাস্নায়ু ছিঁড়ে পড়বে।
বাইরে সমুদ্রের ঢেউগুলি আছড়ে পড়ছিল কোন আদিকাল থেকে, কে জানে। ক্লান্তিহীন। রাতচরা পাখিগুলো কখন থেমে গেছে টের পাওয়া যায়নি। তবে পূর্ণিমার চাঁদ তার অনন্ত মহিমা নিয়ে কোটি কোটি বছর ধরে যেমন আলো ঢেলে যায়, আজও তেমনি ঢেলে যাচ্ছে। সন্ধে থেকেই সেসোস্ট্রেস বে’র দিক থেকে হাওয়ার তেজ আরও বেড়েছে।
দূরমনস্কর মতো সুদূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল বিনয়। ধীরে ধীরে ভেতরের অস্থিরতা, গ্লানি এবং অপরাধবোধের তীব্রতা কমে আসে।
এবার ধীরে ধীরে জানলার বাইরে থেকে চোখ ফিরিয়ে অন্য চিঠি দু’টো তুলে নিল বিনয়।
আনন্দর চিঠিটা খুব ছোট। মাত্র কয়েক লাইলের। বিনয় কেমন আছে, আর কতদিন আন্দামানে তাকে থাকতে হবে, অনিয়ম যেন না করে, শরীর-স্বাস্থ্যের দিকে যেন নজর রাখে, ইত্যাদি ইত্যাদি। শ্বশুরমশাই, মনে অবনীমোহনের একটা চিঠিও যে পাঠিয়েছে তাও লিখেছে।
চার নম্বর অর্থাৎ শেষ যে খামটা তুলে নিল বিনয় সেটার ওপর তার নাম এবং আন্দামানের ঠিকানা, ঠিক অন্য খামগুলোর মতোই। সুধা এবং আনন্দ লিখেছে এর মধ্যে একটা চিঠি অবনীমোহনেরও আছে। কিন্তু খামের ওপর হস্তাক্ষরটি সম্পূর্ণ অচেনা মনে হয়। বাবার হাতের লেখার ছাঁদ এধরনের নয়। ভুল করে কি আনন্দ অন্যের চিঠি তার কাছে পাঠিয়েছে। একটু দোনোমোনো করে শেষপর্যন্ত খামের মুখ ছিঁড়ে চিঠি বের করল বিনয়। পড়তেও শুরু করল। বয়ানটা এরকম।
‘স্নেহের বিনু, আমি যে চলচ্ছক্তিহীন, অথর্ব হইয়া গুরুতর পীড়িত অবস্থায় বিছানায় পড়িয়া আছি, তোমাকে ইতিপূর্বে তাহা জানাইয়াছি। আগের পত্রগুলি স্বহস্তে লিখিয়াছিলাম। বর্তমানে সেই শক্তিও নাই। তাই আমার এক গুরুভাইকে মুখে মুখে বলিয়াছি; তিনি অনুগ্রহ করিয়া লিখিয়া দিয়াছেন।
‘তুমি কি আমার পূর্বের চিঠিগুলি পাও নাই? পাইয়া থাকিলে উত্তর দাও নাই কেন? না পাইয়া থাকিলে তোমাকে জানাই, শরীরের যে হাল তাহাতে এই পৃথিবীতে আর বেশি দিন বাঁচিয়া থাকিব না। আমার অন্তিম কাল ঘনাইয়া আসিতেছে।
‘তোমাকে আগেই লিখিয়াছিলাম, ঝিনুককে অস্বীকার করিয়া আমি চরম অন্যায় করিয়াছি। আমারই জন্য সে নিরুদ্দেশ হইয়া গিয়াছে। সম্পূর্ণ নিষ্পাপ একটি মেয়ের জীবন হয়তো আমার কারণে ধ্বংস হইয়াছে। অন্ধ কুসংস্কারে আমার মতিচ্ছন্ন ঘটিয়াছিল। ঝিনুকের জন্য আমার প্রাণটি কোনও রকমে ধুকধুক করিয়া টিকিয়া আছে। তুমি যেমন করিয়া যেখান হইতে পার তাহাকে খুঁজিয়া বাহির করিয়া কাশীতে আমার কাছে লইয়া আসো। তাহার নিকটে ক্ষমাপ্রার্থনা করিতে না পারিলে মরিয়াও আমারও শান্তি নাই। আত্মগ্লানিতে জর্জরিত হইয়া আছি। ঝিনুক ক্ষমা করিলে আমার জীবনব্যাপী অনুশোচনার কিঞ্চিৎ উপশম হইবে।
‘কিছুদিন পূর্বে সুনীতিকে একটি চিঠি দিয়াছিলাম। তাহার উত্তরে সে লিখিয়াছে, তুমি, সংবাদপত্রে চাকুরি লইয়াছ এবং আন্দামানে উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের তথ্য সংগ্রহ করিয়া তোমাদের কাগজে রিপোর্ট
পাঠাইবার দায়িত্ব লইয়া গিয়াছ। বর্তমানে তুমি কি আন্দামানে আছ, নাকি কলকাতার ফিরিয়া আসিয়াছ? আরেকবার স্মরণ করাইয়া দিতেছি ঝিনুককে সঙ্গে করিয়া কাশীতে আমাদের আশ্রমে চলিয়া আসিবে।
‘তোমাকে জানাইয়া ছিলাম আশ্রমে আসিবার পর আমার নাম পালটাইয়া গিয়াছে। গৃহী জীবনের সমস্ত কিছু ত্যাগ করিয়া এখানে থাকিতে হয়। আমিও তাই আসিয়াছিলাম। কিন্তু ঝিনুককে কোনও মতেই ভুলিতে পারিতেছি না।
‘তোমার উত্তরের আশায় রহিলাম। সংসার জীবনের নামটাই এখানে লিখিলাম। ইতি–
অবনীমোহন বসু’
চিঠিটা পড়ার পর বিচলিত হয়ে পড়ল বিনয়। খুবই উতলা। আগের চিঠিগুলো পেয়েও ঠিক এমনটাই হয়েছিল। অবনীমোহন যেভাবে সমস্ত অতীত, সন্তান সন্ততি, প্রায় পঞ্চান্ন বছরের সংসার জীবন পেছনে ফেলে গুরুর আশ্রমে চলে গিয়েছিলেন সেটা মেনে নিতে পারেনি বিনয়। বাবাকে এসপেটিস্ট অর্থাৎ পলাতক মনে হয়েছিল। মন শুদ্ধ থাকলে, সৎপথে জীবনকে চালিত করলে গুরুর প্রয়োজন কী? বিশেষ করে ঝিনুকের প্রতি তাঁর আচরণে সে অত্যন্ত আঘাত পেয়েছে। মর্মাহত হয়েছে। বাবার প্রতি তার শ্রদ্ধা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু জীবনের শেষ পর্বে অনুতপ্ত, অপরাধবোধে বিপর্যস্ত মানুষটির জন্য সহানুভূতিই হয় বিনয়ের। বাবার আগের চিঠির জবাব সে দেয় নি। ঝিনুকের সঙ্গে আন্দামানে তার দেখা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মেয়েটা সম্পূর্ণ ভাবলেশহীন মুখে এমন ভান করেছে যেন তাকে চেনেই না। তাকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছে। এমনটা ভাবতে পার নি সে। মধ্য আন্দামানে গিয়ে বাবার চিঠি দেখিয়ে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাকে কলকাতায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, সেখান থেকে কাশী– এমনটাই ভেবে রেখেছিল। কিন্তু মধ্য আন্দামানে যাওয়া সম্ভব হয় নি। কে জানত, মাত্র ষাট মাইল দূরের দ্বীপে পৌঁছনো এত কঠিন! মনে হয় ওই দ্বীপটা অন্য কোনও অচেনা গ্রহে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।