কিন্তু না, লা-পোয়েদের পাওয়া গেছে। বাবার চিঠিগুলো নিয়ে সে ঝিনুককে দেখাবে শেষ শয্যায় শায়িত বৃদ্ধ মানুষটি কাশীর এক আশ্রমে তার জন্য কতটা মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করছেন। নিশ্চয়ই ঝিনুকের করুণা হবে।
প্রথম চিঠিটা পাওয়ার পর নিজের সংকল্পকে দৃঢ় করে নিয়েছিল, এবারও তাই করল। মধ্য আন্দামানে তাকে যেতেই হবে। যেতেই হবে।
.
একদিন পর সকালে পরটা-তরকারি এবং চা খেয়ে জেফ্রি পয়েন্টে চলে গেলেন শেখরনাথ। বেলা একটু বাড়লে ভাত টাত খাইয়ে উলুপী আর তার ছেলেকে কালীপদর সঙ্গে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হল। উলুপীরা আর এখানে ফিরবে না। বিকেলের ভিজিটিং আওয়ার্স শেষ হলে কালীপদ তাদের রিফিউজি ট্রানজিট সেন্টারে রেখে আসবে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই অন্য একটা গাড়িতে বিশ্বজিৎও বেরিয়ে পড়লেন।
উলুপীদের ট্রানজিট সেন্টারে রাখার কারণও রয়েছে। লক্ষ্মণের বিরুদ্ধে থানায় ডায়েরি করেছে সে। কেসটা উঠবে বিশ্বজিতের কোর্টে। উলুপীরা তার বাংলোয় থাকলে পক্ষপাতিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। তাই শেখরনাথের সঙ্গে পরামর্শ করে ওদের ট্রানজিট সেন্টারে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিশ্বজিৎ।
বাংলোয় তিনজন কাজের লোক ছাড়া অন্য কেউ নেই। বিশ্বজিত্রা বেরিয়ে গেলে বিনয় লেখার টেবিলে গিয়ে বসে পড়ল। কাল বেশ ক’টা চিঠি লিখেছে। আজ অন্তত দুটো প্রতিবেদন শেষ করতেই হবে। কাল এবং পরশু আরও যে ক’টা সম্ভব হয় লিখে ফেলবে।
বাইরে বেরুবার তাড়া নেই। তাই বিশ্বজিৎদের সঙ্গে স্নান-খাওয়া চুকিয়ে ফেলে নি বিনয়। প্রথম প্রতিবেদনটা লেখা হলে ধীরেসুস্থে খাওয়া দাওয়া করবে।
দুপুরে সূর্য যখন সোজাসুজি মাথার ওপর উঠে এসেছে, বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউগুলোর মাথায় তীব্র রোদ ঝলকে যাচ্ছে, সেদিকে তাকালে মনে হয় চোখে আগুনের ঝঝ এসে লাগছে, সেই সময় প্রথম লেখাটা শেষ হল। কাগজ কলম টেবিলের দেরাজে রেখে স্নান টান করে খেয়ে শুয়ে পড়ল সে। কাল জেফ্রি পয়েন্ট থেকে আসার ক্লান্তি এখনও পুরোপুরি কাটে নি। দিবানিদ্রার অভ্যাস না থাকলেও আজ ঘুমিয়ে নিল বিনয়। ঘুম যখন ভাঙল রোদের সেই তাপ আর নেই। দিনের নির্জীব আলোর রং এখন বাসি হলুদের মতো। ম্যাড়মেড়ে, কেমন যেন বিষাদ-মাখানো। ১ চা খেয়ে লেখার টেবিলে বসে কিছুক্ষণ জানলার বাইরে বেলাশেষের সমুদ্র, ছোটবড় দ্বীপ, আর পাহাড় জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে রইল বিনয়। তারপর দ্বিতীয় প্রতিবেদনটি লিখতে শুরু করল। সেটা শেষ হতে হতে সন্ধে পেরিয়ে গেল।
গোপাল ঘরে আলো জ্বেলে দিয়ে গিয়েছিল। এবার দুটো প্রতিবেদনই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ে দু-চারটে সেনটেন্স বদলে, কিছু শব্দ পালটে নতুন শব্দ জুড়ে ঠিকঠাক গুছিয়ে পিন দিয়ে গেঁথে দেরাজে রেখে দিল। আজ এখানেই ইতি। কাল সকাল থেকে ফের শুরু করা যাবে।
এই সময় বিশ্বজিৎ ফিরে এলেন। তাঁর গলার আওয়াজ শুনে ঘর থেকে ড্রইংরুমে বেরিয়ে এল বিনয়।
বিশ্বজিৎ হাসিমুখে বললেন, আপনি একটু বসুন বিনয়বাবু, আমি হাতমুখ ধুয়ে চেঞ্জ করে আসি। জাস্ট টেন মিনিটস।ভুবন, আমাদের জন্যে চা করে নিয়ে এস।
বিনয় একটা সোফায় বসে পড়ল। বিশ্বজিৎও চলে এলেন কিছুক্ষণের মধ্যে। বেশ তরতাজা দেখাচ্ছে তাকে। স্পষ্ট বোঝা যায় শুধু হাতেমুখে জল নয়, একেবারে স্নানই করে এসেছেন। পরনে ধবধবে পাজামা-পাঞ্জাবি। সোফায় আয়েশ করে বসে জিগ্যেস করলেন, ‘লেখা টেখা হল?
‘হ্যাঁ’–বিনয় বলল, ‘দুটো বড় লেখা শেষ করেছি।‘
‘বাহ, প্রোগ্রেস তো বেশ ভালই।‘
বিনয় হাসল।
ভুবন একটা ট্রেতে দুকাপ চা এবং সেই সঙ্গে ঘরে তৈরি নিমকি আর চমচম দিয়ে গেল।
খেতে খেতে এলোমেলো কিছু কথা। তারপর হঠাৎ যেন জরুরি কোনও বিষয় মনে পড়ে গেছে, তেমন একটা ভাব করে বিশ্বজিৎ বললেন, ‘লক্ষ্মণ ভক্তকে আজই কোর্টে প্রডিউস করা হয়েছিল।‘
উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকে বিনয়।
‘লোকটা অত্যন্ত ধূর্ত, ধুরন্ধর। এমন ক্যারেক্টার খুব কমই দেখা যায়।‘
‘কিরকম—’
‘লোকে কোর্টে এলে ভয়ে কুঁকড়ে যায়। এই লোকটার ভয়ডর তেমন কিছু আছে মনে হয় না। বিশ্বজিৎ বলতে লাগলেন, ‘জিগ্যেস করতে জানালে তার উকিলের দরকার নেই। নিজেকে সে নিজেই ডিফেন্ড করতে পারবে। একেবারে বিনয়ের অবতার। হী ইজ অ্যান ইন্টারেস্টিং পার্সন। ভেরি কানিং।‘
লক্ষ্মণ ভক্ত ব্যক্তিটি যে সোজাসাপটা নয়, আগেই বুঝতে পেরেছিল বিনয়। সে তাকিয়ে রইল।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘পরশু ফের তাকে কোর্টে তোলা হবে। কিভাবে সে নিজেকে বাঁচায়, জানার ইচ্ছে হচ্ছে। অপনার হচ্ছে না?
লইয়ার না নিয়ে একজন নিরক্ষর, শিক্ষাদীক্ষাহীন লোক আদালতে দাঁড়িয়ে আত্মপক্ষ কিভাবে সমর্থন করে, জানার তীব্র কৌতূহল হচ্ছিল, সত্যিই বিনয়ের। আস্তে মাথা হেলিয়ে দিল সে।’হচ্ছে।
‘আপনি পরশু আমার সঙ্গে কোর্টে চলুন। কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সে কী বলে শুনবেন। হয়তো লেখার মতো মেটিরিয়াল পেয়ে যাবেন।
বিনয় বলল, ‘ঠিক আছে, যাব।‘
.
মাঝখানে একটা দিনে আরও তিনটে প্রতিবেদন লিখে ফেলল বিনয়। তারপর আজ স্নান করে খেয়ে বিশ্বজিতের সঙ্গে আদালতে চলে গেল।
দেশে থাকতে একবার হেমদাদুর সঙ্গে কম বয়সে মুন্সিগঞ্জে আদালতে গিয়েছিল বিনয়। কী কারণে দাদুকে যেতে হয়েছিল, এখন আর মনে নেই।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।