‘হেমদাদু লিখেছেন, দেশের পরিস্থিতি এখন অনেকটিই ভাল। প্রায় স্বাভাবিকই বলা যায়। কিছুদিন আগে যে অশান্তি আর ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল আর তা নেই। তারা নির্বিঘ্নেই আছেন। বিহারি মুসলমানরা এপার থেকে গিয়ে যে তুমুল উৎপাত শুরু করেছিল, রাজদিয়া অঞ্চলের অনেক বাঙালি মুসলমান তাদের রুখে দিয়ে শাসিয়েছে, এতকাল যারা পাশাপাশি রয়েছে পুরুষানুক্রমে, তাদের কোনওরকম ক্ষতি করা চলবে না।
‘হেমদাদু জানতেন তুই আমাদের কাছেই আসিস। তিনি তোকে আশীর্বাদ জানিয়েছেন, চিঠি দিতেও লিখেছেন। দিদি, আনন্দদা আর ওদের বাড়ির সবাইকার খবর জানতে চেয়েছেন। পরে প্রত্যেককে আলাদা আলাদা চিঠি লিখবেন।
‘আমার চিঠি পাওয়া মাত্র উত্তর দিবি। আমাদের স্নেহ নিস।–ইতি ছোটদি।‘
.
চিঠিটা পড়া হলে কিছুক্ষণ নিঝুম বসে রইল বিনয়। এই তো সেদিন সে হাজারখানেক উদ্বাস্তুর সঙ্গে আন্দামানে এল। এর মধ্যে কত ঘটনা ঘটে গেছে কলকাতায়। দুঃখ, বিষাদ, আনন্দ–নানারকমের অনুভূতি তার ভেতর বেশ খানিকটা সময় আলোড়ন তুলে গেল।
দ্বারিক দত্ত’র মৃত্যুটা বিনয়ের কাছে খুবই কষ্টের। এটা ঠিকই তার যথেষ্ট বয়স হয়েছিল। সুধার আগের চিঠিগুলোতে জানা গেছে তিনি মাঝে মাঝেই ভুগছিলেন, আবার ভালও হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু হঠাৎই চলে যাবেন, ভাবা যায় নি। রাজদিয়া থেকে কলকাতায় আসার পর ধর্ষিতা ঝিনুককে নিয়ে সে যখন দিশেহারা, যেখানেই তাকে নিয়ে যাচ্ছে, কেউ সুনজরে ঝিনুককে দেখছে না, অনন্ত সহানুভূতিতে তাকে কাছে টেনে তো নেয়ই নি, বরং তার ওপর যে নারকীয় নির্যাতন হয়েছে সেই অপরাধটা যেন ঝিনুকেরই–স্পষ্টভাবে তা বুঝিয়ে দিয়ে ঘৃণায় মেয়েটাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে নোংরা, দূষিত আবর্জনার মতো। এটা ঠিক, সেই সময় হিরণ আর সুধা তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, আশ্রয় দিয়েছিল নিজেদের বাড়িতে। আতঙ্কগ্রস্ত, গ্লানিবোধে কুঁকড়ে থাকা ঝিনুককে ক্রমশ সুস্থ, স্বাভাবিক করে তুলেছিল। কিন্তু দ্বারিক দত্ত যদি আশ্রয় দিতে রাজি না হতেন সুধাদের পক্ষে তা আদৌ সম্ভব হত না। সংস্কারমুক্ত বৃদ্ধটির মৃত্যু বিনয়ের কাছে বিরাট এক ক্ষতি। = আশু দত্ত আদ্যোপান্ত একজন আদর্শবাদী শিক্ষক, মানুষ গড়ার কারিগর। আজীবন ছাত্র পড়িয়ে এসেছেন। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে উদ্বাস্তুদের সঙ্গে পড়ো জলাজমিতে তাদের জবরদখল কলোনির অধিকার বজায় রাখতে আন্দোলনে নেমে পড়বেন, কে ভাবতে পেরেছিল। পুলিশের লাঠির ঘায়ে তিনি যে রক্তাক্ত, আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, তা জেনে বিনয় উৎকণ্ঠিত যত হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রদ্ধা বেড়েছে এই পরমাশ্চর্য মানুষটির ওপর। শুধু শিক্ষাদানের মতো মহৎ কাজই নয়, নিজে উদ্বাস্তু হয়ে অন্য ছিন্নমূল মানুষগুলোর মহাসংকটের সময় তাদের পাশে গিয়ে এই বয়সে যে দাঁড়াবেন তা কি ভাবা যায়! কলকাতায় ফিরে গিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আশু দত্ত’র সঙ্গে সে দেখা করবে। তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন, আপাতত এই প্রার্থনা ছাড়া আর কী-ই বা সে করতে পারে।
হেমদাদুরা যে ভাল আছেন, নিত্য দাসের দালালদের মারফত নয়, সরাসরি চিঠি লিখতে পারছেন, পশ্চিমবাংলা এবং পূর্বপাকিস্তানে ডাক-চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে, এটা একটা বড় খবর। তবে সবচেয়ে বিরাট স্বস্তির ব্যাপার হল রাজদিয়া এবং তার চারপাশের এলাকাগুলোতে অবাঙালি আর এক শ্রেণির বাঙালি মুসলমানের হিন্দুদের ওপর হামলা বন্ধ হয়েছে। হেমদাদুদের জন্য সারাক্ষণ কী দুশ্চিন্তার মধ্যে যে কাটাতে হয়। সুধার এই চিঠি পেয়ে বিনয় অনেকটাই চাপমুক্ত। পোর্টব্লেয়ার থেকেই সে হেমদাদুকে চিঠি লিখবে।
সুধার চিঠির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রসঙ্গ হল ঝুমা। ঝিনুকের সঙ্গে আন্দামানে দেখা হওয়ার পর থেকে ওই মেয়েটাকে নিয়ে বিনয় আর ভাবতেই চায় না। সে বোঝে এটা ভয়ঙ্কর অন্যায়, বিশ্বাসভঙ্গের মতো মারাত্মক অপরাধ। সুধা ঠিকই লিখেছে, ঝুমার ভালবাসা তুচ্ছ করার মতো বিষয় নয়। আন্দামান থেকে ফেরার পর একবছর হোক, দু’বছর হোক কিংবা আরও কয়েক বছর বাদে এই মেয়েটাকে নিয়ে নতুন এক জীবন শুরু করবে তা একরকম স্থির হয়েই ছিল। কিন্তু কে জানত, কলকাতা থেকে আট, ন’শা মাইল দূরে নিরুদ্দেশ ঝিনুকের সঙ্গে ফের দেখা হয়ে যাবে। ঝুমা সুন্দরী, ঝকঝকে মেয়ে। লেখা পড়ায় ভাল; অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস পাবেই, তার মাথার ওপর মা বাবা দাদু আছেন। ওদের প্রচুর পয়সা। বিনয়ের সঙ্গে বিয়েটা না হলে সে কষ্ট পাবে, ভীষণ ভেঙে পড়বে। কিন্তু সব কষ্ট, সব দাহ তো চিরস্থায়ী নয়। একদিন না একদিন সে নিশ্চয়ই সামলে নিতে পারবে। কিন্তু বিনয় ছাড়া ঝিনুকের পাশে দাঁড়াবার মতো কে আছে? আরও কয়েকজন ছিলেন হেমনাথ, স্নেহলতা, শিবানী। কিন্তু তারা তো সুদূর পূর্ব-পাকিস্তানে। অন্য এক দেশে। সেখান থেকে এস্ত, আতঙ্কগ্রস্ত ঝিনুক একদিন বিনয়ের সঙ্গে চলে এসেছিল। কোনওদিনই তাকে সেখানে পাঠানো যাবে না। মরে যাবে, তবু ঝিনুক সেখানে যাবে না। কিন্তু মধ্য আন্দামানে সমুদ্র-পাহাড় ঘেরা এক সৃষ্টিছাড়া সেটলমেন্টে বাকি জীবনটাকে সে ক্ষইয়ে ক্ষইয়ে শেষ করে দেবে তা তো হয় না। যেভাবেই হোক, তাকে কলকাতায় নিয়ে গিয়ে ঝুমা এবং তাদের পরিবারের সবার কাছে জোড়হাতে ক্ষমা চেয়ে নেবে। নিশ্চয়ই ওঁরা বুঝবেন। সুধার চিঠির উত্তরে ঝুমার কেমনও উল্লেখই আপাতত করবে না বিনয়। কলকাতায় ঝিনুককে নিয়ে গেলে আত্মীয়-পরিজন তো বটেই, সুধাও চমকে যাবে। বার বার সে চিঠি লেখা সত্ত্বেও কেন ঝুমা সম্পর্কে একেবারে নীরব থেকেছে বুঝতে পারবে। বিনয়ের গভীর বিশ্বাস সুধা এবং হিরণরা খুশিই হবে। সে যে তার কর্তব্য পালন থেকে এক চুলও সরে আসেনি। সেজন্য তার প্রতি ওদের শ্রদ্ধাই হবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।