‘বিনু, আমরা একটা বটগাছের তলায় ছিলাম। বিপদে সংকটে সবসময় আমাদের আগলে আগলে রাখতেন দাদাশ্বশুর। মাথার ওপর থেকে একটা বড় আশ্রয় চিরদিনের মতো চলে গেল। আমরা একেবারে অনাথ হয়ে গেলাম রে।
‘তোকে আরও একটা দুঃসংবাদ দিই। মাস্টারমশাই মানে আশু দত্ত মারাত্মক আহত হয়ে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন। যুগল তাদের মুকুন্দপুর কলোনিতে তাকে নিয়ে গিয়ে স্কুল খুলিয়ে ছিল। মাস্টার মশাই পাকিস্তান থেকে এসে তার মাকে নিয়ে কালীঘাটের ঈশ্বর গাঙ্গুলি স্ট্রিটে তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছিলেন। প্রথমটা তিনি মুকুন্দপুরে যেতে চাননি। তুই তাঁর প্রিয় ছাত্র। যুগলের সঙ্গে তুইও তাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে মুকুন্দপুরে পাঠাস। তাঁকে দিয়ে কলোনির ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য একটা স্কুল খোলা হয়।
‘শুধু স্কুলে পড়ানোই নয়, মুকুন্দপুরের ভিটে মাটি খুইয়ে আসা মানুষগুলোর সুখদুঃখের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন মাস্টার মশাই। তুই আন্দামানে যাওয়ার আগে দেখে গেছিস জবরদখল কলোনিগুলো থেকে উদ্বাস্তুদের উৎখাত করার জন্য জমি-মালিকদের পক্ষে সরকার একটা আইন পাশ করতে চলেছে। তাই নিয়ে উদ্বাস্তুদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ শুরু হয়েছিল। সেটা এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। আশু দত্ত শুধু স্কুল নিয়েই পড়ে থাকেন নি; মুকুন্দপুর আর তার চারপাশের কলোনিগুলোর আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে দিনচারেক আগে রাজভবন অভিযানে শত শত উদ্বাস্তুকে নিয়ে আসেন। এদিকে যাদবপুর, গড়িয়া, ঢাকুরিয়া– দক্ষিণ কলকাতার উদ্বাস্তুরাও মিছিল করে রাজভবনের দিকে যায়। উত্তর এবং দক্ষিণের এত মানুষ মিলিত হওয়ায় জনসমুদ্রের সৃষ্টি হয়। তাদের ঠেকাবার জন্য পুলিশ লাঠি চার্জ করে, টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, এমনকি গুলিও চালায়। আশু দত্ত মিছিলের সামনের দিকে ছিলেন। পুলিশের লাঠির আঘাতে তার মাথা, বাঁ হাত এবং পাঁজর ভেঙে যায়। প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। যুগল তোর হিরণদার অফিসে এসে এই খবরটা দিয়ে গেছে। তোর হিরণদা মাস্টারমশাইকে দেখে এসেছে। অবস্থা বেশ সংকটজনক। বেঁচে হয়তো যাবেন, কিন্তু বেশ কিছুদিন তাঁকে হাসপাতালে থাকতে হবে।
‘দাদাশ্বশুরের শ্রাদ্ধের দিন আত্মীয়স্বজন অনেকেই এসেছিল। আনন্দদা, দিদি ছাড়াও ওর শ্বশুরবাড়ির সবাই। দিদি বলল, কাশী থেকে বাবা তোকে একটা চিঠি লিখেছেন। আনন্দদারা সেই চিঠি বিশ্বজিৎ রাহার ঠিকানায় পাঠিয়ে দিয়েছে। বাবার শারীরিক অবস্থা একেবারেই ভাল নয়। চিঠিটা আনন্দদারা খোলে নি। তাদের আলাদা চিঠি লিখে জানিয়ে দিয়েছে অবিলম্বে তোর চিঠি যেন তোকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
‘এবার ঝুমার কথা বলি। ওরাও দাদাশ্বশুরের শ্রাদ্ধর দিন আমাদের বাড়ি এসেছিল। আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছে, তোকে দু-তিনটে চিঠি লিখেছে। তুই একটারও উত্তর দিস নি। বিনু, নিরুদ্দেশ ঝিনুককে আর কোনওদিন পাওয়া যাবে না বলেই আমার বিশ্বাস। খোঁজটোজ তো কম করিসনি।
‘বিনু, ঝিনুকের মতো ঝুমা সেই কোন কম বয়স থেকে তোকে ভালবেসেছে। যতদিন ঝিনুক ছিল সে নিজেকে দূরে দূরেই সরিয়ে রেখেছে। কষ্ট পেয়েছে কিন্তু কোনওদিন তা প্রকাশ করে নি। ঝিনুক চলে যাওয়ার পর তোর জীবন যখন শূন্য হয়ে গেছে সেই সময় ঝুমা অনন্ত সহানুভূতিতে তোর পাশে দাঁড়িয়েছে। শোক, দাহ, দুঃখ, মানসিক যন্ত্রণা, এসব নিয়েই জীবন। একসময় প্রচণ্ড আঘাতে মনে হয় বেঁচে থাকাটাই দুর্বিষহ। কিন্তু সময়ের হাতে এমন জাদুকাঠি আছে যার ছোঁয়ায় সব শূন্যতা ভরে যায়।
‘ঝিনুক নিখোঁজ হওয়ার পর তোর জীবনের অনেকটা অংশ ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। তখন ভেতরে ভেতরে কতটা কষ্ট পেয়েছিস, কতখানি উতলা হয়েছিলি, সব বুঝতে পারতাম। একটা পাগল পাগল ভাব। কিন্তু ঝুমা তোর জীবনের কঁকা জায়গাটা কিন্তু ভরে দিয়েছে। ঝিনুকের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তোকে দখল করতে চায় নি। অবাঞ্ছনীয় কোনও কাজ সে করেনি। তুই আন্দামানে যাওয়ার আগে স্থিরই করেছিলি ঝুমাকে গ্রহণ করবি। তা হলে তাকে এত কষ্ট দেওয়ার কী কারণ? কেন মেয়েটাকে চিঠি লিখিস না? সবাইকে লিখিস, সে-ই শুধু বাদ! কী এমন ঘটেছে যে তাকে এড়িয়ে যাচ্ছিস? মেয়েটা এবং তার পরিবার তোর জন্য অপেক্ষা করে আছে। ওর বাবা-মা স্থির করেই ফেলেছেন, তুই ফিরে এলেই দুজনের বিয়েটা চুকিয়ে ফেলবেন, অবশ্য তোর মতামত নিয়েই।
‘বিনু, ঝুমা কিন্তু লঘু ধরনের সামান্য মেয়ে নয়। তার একটা বিরাট হৃদয় আছে, তার ভালবাসা তুচ্ছ করার জিনিস নয়। সেটা করলে একদিন না একদিন তোকে অনুশোচনা করতে হবে। ঝুমাকে অবশ্যই চিঠি লিখবি। সাবধানে থাকিস। নতুন ভারত’-এ তোর লেখাগুলো পড়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছি। পোর্টব্লেয়ার থেকে চল্লিশ মাইল দূরে ঘোর জঙ্গলে চরম বিপদের মধ্যে তোকে থাকতে হয়। যত তাড়াতাড়ি পারিস কাজ শেষ করে কলকাতায় ফিরে আয়। কতকাল যে তোকে দেখি না!
‘ও, একটা বড় খবর দিতে ভুলে গেছি। খুবই ভাল খবর। দিন পঁচিশেক আগে হেমদাদুর একটা চিঠি কাল পেয়েছি। তোর হিরণদাকে লিখেছেন। না, নিত্য দাস যে বর্ডারের এপারে ওপারে লোকজন। দিয়ে প্রচুর টাকা নিয়ে চিঠিপত্র চালাচালি করে, সেভারে নয়। এসেছে ডাক মারফত। দুই বাংলায় কচ্ছপের গতিতে হলেও ডাক-চলাচল শুরু হয়েছে। খুব সম্ভব সেটা খুব তাড়াতাড়িই স্বাভাবিক হবে। রাজদিয়া থেকে চিঠি আসতে হেমদাদুর পঁচিশ দিন লাগল। আশা করি, এরপর তিনি চিঠিপত্র লিখলে দু-তিন দিনের মধ্যে পেয়ে যাব। দালাল টাউটদের দিন একদিক থেকে শেষ।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।