বিশ্বজিৎ বললেন, হ্যাঁ। আমাদের আসতে দেরি হয়ে গেল।
লম্বাচওড়া শক্তিমান লোকটি এবং বাকি সকলে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, নমস্তে সাহাব–’বোঝা গেল তারা অবাঙালি।
ঘাড় সামান্য কাত করে প্রতি-নমস্কার জানালেন বিশ্বজিৎ। তারপর বাঙালি যুবকটিকে বললেন, ‘সেই সকালবেলা রিফিউজিরা খেয়ে বেরিয়েছিল। এখন সূর্য ডুবতে চলেছে। খিদেয় তাদের পেটে আগুন জ্বলছে। খাবার-টাবার সব রেডি তো?’
যুবকটি বলল, হ স্যার। দুফারের আগেই পাক (রান্না) হইয়া গ্যাছে।’
‘ভেরি গুড।’
বিশ্বজিৎ এবার বিনয়ের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দিলেন। যুবকটির নাম পরিতোষ বণিক। দেশভাগের পরে পরেই ফরিদপুরের পালং থেকে চলে এসেছিল। আইএ পাশ। আন্দামানের এই নতুন সেটলমেন্টের কলোনাইজেশন অ্যাসিস্টান্ট, সংক্ষেপে সি.এ। শরণার্থীদের এই উপনিবেশ গড়ে তোলার অনেকখানি দায়িত্ব। তার এখানে থেকেই পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার তদারক করবে সে।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘বিনয়বাবুর কথা তোমাকে বলেছি। উনি আপাতত এখানে থাকবেন। আন্দামানের রিহ্যাবিলিটেশন সম্পর্কে ওঁদের কাগজে লিখবেন। ওঁকে সবরকম সাহায্য করবে।‘
‘নিশ্চয়ই স্যার। আপনে কি এইবার কয়েকদিন থাইকা যাইবেন?’
‘বড়জোর কালকের দিনটা আছি। পরশু আমাকে ফিরতেই হবে। কোর্টে অনেকগুলো কেস রয়েছে। কোনওটার হিয়ারিং আছে, কোনওটার জাজমেন্ট দিতে হবে।‘
বিশ্বজিৎ শুধু রিহ্যাবিলিটেশন অফিসারই নন, আন্দামানের ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিষ্ট্রেটও। তাকে নানারকম ঝক্কি সামলাতে হয়। তিনি বলতে লাগলেন, ‘তিন দিন আগে কাহালিবাবু মাল নিয়ে এসেছিলেন। তাতে কতদিন চলবে?’
ঘাড় চুলকতে চুলকতে চোখ নামিয়ে পরিতোষ বলল, ‘স্যার, রিফিউজিগো যা লিস্ট পাইছি হেয়াতে (তাতে) মনে লয় (হয়) তিনশো জন আইছে। হেরা তারা ছাড়া রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের বিশ বাইশজন এমপ্লয়ি আছে। যা মাল আইছে, কতদিন চলব হিসাবটা বুঝতে পারছি না। এই ধরনের কাম তো আগে করি নাই। তাই—’
ধমকের সুরে বিশ্বজিৎ বললেন, ‘এটা একটা এক্সকিউজ হল? কলোনি চালাবে তুমি। হিসেবটা বুঝবে অন্য লোক? এভাবে চাকরি রাখতে পারবে না।‘
সচকিত বিনয় বিশ্বজিতের দিকে তাকায়। কাল সকাল থেকে আজ বিকেল অবধি, মোটামুটি দেড় দিনের মতো তাকে দেখছে সে। অমায়িক, সহানুভূতিশীল নরম স্বভাবের মানুষ বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু কাজকর্মের ব্যাপারে তিনি যে অত্যন্ত কঠোর, কারও কোনওরকম গাফিলতি বা অজুহাত যে বরদাস্ত করেন না সেটা টের পাওয়া গেল।
মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল পরিতোষের। কী জবাব দেবে, ভেবে পাচ্ছে না।
নীরস গলায় বিশ্বজিৎ বললেন, ‘যেসব মাল এসেছে, সেগুলোর কত ওজন, তার ফর্দ আছে তো? না হারিয়ে ফেলেছ?’
পরিতোষের মনে হল, ফঁড়াটা খুব সম্ভব এ যাত্রায় কেটেই গেল। জোরে শ্বাস টেনে সে বলল, ‘আছে স্যার, আছে। অহনই লইয়া আসুম?’
‘এখন আনতে হবে না। পরে দেখব।’ বলেই সেই বলবান লোকটার দিকে তাকালেন বিশ্বজিৎ।–‘তোমার খবর কী ধনপত সিং?’
ধনপত বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ‘আপকো কিরপাসে (কৃপায়) ঠিক হি হ্যায় সাহাব।’
‘কাল থেকে জমি জরিপের কাজ শুরু হবে। তোমরা রেডি তো?’
‘রিডি (রেডি) সাহাব।’ ধনপত তার সঙ্গী দু’জন বর্মি এবং অন্যদের দেখিয়ে বলল, হিন্দুস্থানিতে যা বলল তার বাংলা মোটামুটি এরকম। কাল রাতকো এই চেইনম্যানরা এসে গেছে।
জরিপের ব্যাপারটা ভাসা ভাসা ভাবে আন্দাজ করে নিল বিনয়, তবে চেনম্যানদের কী কাজ সেটা ধোঁয়াটে হয়ে রইল। এ নিয়ে কোনও প্রশ্ন করল না সে। পোর্টক্লেয়ার থেকে বহু দূরে নিবিড় বনভূমির এই খাঁজের ভেতর যখন এসেই পড়েছে কাল হোক, পরশু হোক, চেনম্যানদের সম্পর্কে অবশ্যই জানা যাবে।
ওধারে লরি থেকে রিফিউজিদের নামিয়ে ফেলেছে বিভাস আর নিরঞ্জন। সেদিক থেকে শোরগোল ভেসে আসছে। অতগুলো মানুষ একসঙ্গে কথা বলছে, তারই আওয়াজ।
বিশ্বজিৎ বিনয়কে বললেন, ‘চলুন, ওখানে যাওয়া যাক। দুজনে পেছন ফিরে হাঁটতে শুরু করল। পরিতোষও ভিজে বেড়ালের মতো তাদের সঙ্গে সঙ্গে চলেছে। ধনপতরা এল না, তারা দাঁড়িয়েই রইল।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘ধনপত আর বর্মিটর্মিদের দেখলেন তো। এরা কারা জানেন?’
বিনয় বলল, কী করে জানব? এই তো সবে এলাম। তবে আপনাদের কথা শুনে মনে হল জরিপ-টরিপ কিছু করবে।‘
‘হ্যাঁ। এরা সব ব্রিটিশ আমলে সাজা খাটতে ‘কালাপানি’ এসেছিল। তারপর এখানেই থেকে গেছে।’ বিশ্বজিৎ বলতে লাগলেন, ‘তখনকার জেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ওদের ‘পি.ডব্লু.ডি’তে কাজ দিয়েছিল। স্বাধীনতার পর আন্দামানে যখন রিফিউজিদের পাঠানো হল তখন ওদের রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টে ট্রান্সফার করা হয়।’
বেলা চড়লে চ্যাথাম জেটি থেকে যখন ব্যাম্বু ফ্ল্যাটে আসছিল সেই সময় স্টিম লঞ্চে ইংরেজ রাজত্বের কয়েদিদের দেখেছিল বিনয়। তাদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়নি। নতুন সেটলমেন্টে ধনপতদের সারাক্ষণই পাওয়া যাবে। ভাবতেই শিহরন অনুভব করে সে।
নতুন জায়গায় এসে উদ্বাস্তুরা খুবই উত্তেজিত। তারা এত হইচই বাধিয়েছে যে কারও কথাই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছেনা।
ভিড়ের ভেতর থেকে হলধররা কয়েকজন বিনয়ের কাছে চলে এল। সবারই চোখেমুখে দুশ্চিন্তা এবং শঙ্কার ছাপ। হলধর ভয়ে ভয়ে বলল, ‘তিন দিকে জঙ্গল, পাহাড়, আরেক দিকে সমুদ্র। এই আমাগো কুনহানে লইয়া আইল! আর তো ফিরনের উপায় নাই।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।