‘সম্পাদক জগদীশবাবু, তোমার ওপর অত্যন্ত খুশি। পরের চিঠিতে তোমার সম্বন্ধে হয়তো একটা সুখবর জানাতে পারব। তিনি চাইছেন এবং আমিও চাইছি, একসঙ্গে দশ বারোটা প্রতিবেদন পাঠিয়ে দাও। তা হলে প্রকাশে গ্যাপ পড়বে না।
‘কলকাতার অবস্থা যথাপূর্বং। সেই মিটিং, মিছিল, স্লোগান। রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান। সরকার আইন পাশ করাতে চাইছে যাতে কলকাতা এবং চারপাশে যেসব ফাঁকা জলাজমিগুলোতে জবরদখল কলোনি বসানো হয়েছে সেগুলো থেকে উদ্বাস্তুদের উৎখাত করে দেওয়া হবে। জমিমালিকদের ক্রমাগত চাপে সরকারকে এই পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। আইনটি পাশ হয়ে গেলে হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ ফের উদ্বাস্তু হয়ে যাবে। মানবিক দিক থেকে এদের কথা প্রশাসনের বিবেচনা করে দেখা উচিত। নইলে সারা কলকাতায় রক্তস্রোত বয়ে যাবে।
‘যাই হোক, সেদিন সম্পাদকের কামরায় আমাদের একটা মিটিং ডাকা হয়েছিল। জগদীশবাবু বলছিলেন, আন্দামান সম্পর্কে এখন পাঠকের যে আগ্রহ আছে চিরকাল থাকবে না। ল অফ ডিমিনিশিং রিটার্নের নিয়মে তা কমে যেতে বাধ্য। উনি ঠিকই বলেছেন।
‘জগদীশবাবু আরও বলেছেন, আসাম এবং ত্রিপুরাতেও হাজার হাজার মানুষ পূর্বপাকিস্তান থেকে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। তারাও কিন্তু পরম সুখে নেই। বিশেষ করে আসামের স্থানীয় মানুষ এবং রাজনৈতিক নেতারা একেবারেই চান না, বাঙালি উদ্বাস্তুরা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকুক। তুমি কলকাতায় থাকতে থাকতেই তো দেখেছ, আসাম থেকে দ্বিতীয়বার উদ্বাস্তু হয়ে পূর্বপাকিস্তানের বাঙালিরা পশ্চিমবাংলায় চলে আসছে। সেই আসার কিন্তু বিরাম নেই। জগদীশ বাবু চাইছেন, আর পনেরো কুড়িদিন আন্দামানে থেকে তুমি কলকাতায় ফিরে আসো। আসামের পরিস্থিতি নিয়ে এখানকার অন্য পত্রপত্রিকায় তেমন কিছু রিপোর্ট টিপোর্ট বেরুচ্ছে না। সম্পাদকের ইচ্ছা, তুমি কলকাতায় এলেই আসামে পাঠিয়ে দেবেন। সেখানে মাসখানেক কাটিয়ে উদ্বাস্তুরা কী ধরনের শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে। সে সম্বন্ধে যাবতীয় তথ্যভিত্তিক রিপোর্ট পাঠিয়ে চলে যাবে ত্রিপুরায়। ওই দুই রাজ্যেও প্রচুর বাঙালি পাঠক রয়েছে। বিশেষ করে উদ্বাস্তুদের দুঃখকষ্ট যন্ত্রণার কথা লেখা হলে তাদের মধ্যে আমাদের কাগজের প্রচার অনেক বেড়ে যাবে।
‘সাবধানে থেকো। তোমার চিঠি এবং কমপক্ষে বেশ ক’টা প্রতিবেদনের আশায় রইলাম। স্নেহ নিয়ো। চিরশুভার্থী প্রসাদদা’
চিঠিটা পড়া হলে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল বিনয়। তার প্রতিবেদনগুলো যে পাঠককে খুশি করেছে, সেটা আগেও জানিয়েছিলেন প্রসাদ লাহিড়ি। কিন্তু সেগুলোর প্রতিক্রিয়া এমন ব্যাপকভাবে হয়েছে যাতে ত্রাণশিবির এবং শিয়ালদা স্টেশনের উদ্বাস্তুরা পর্যন্ত এখন আন্দামানে আসতে চাইছে। তার লেখা যে কলকাতায় এতটা আলোড়ন সৃষ্টি করতে পারবে, কে ভাবতে পেরেছিল। ‘নতুন ভারত’-এর মালিক এবং সম্পাদক স্বয়ং জগদীশ গুহঠাকুরতা পর্যন্ত তাঁর সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত। পরের চিঠিতে একটা সুসংবাদের ইঙ্গিতও দিয়েছেন প্রসাদ। শুধু তাই নয়, তার ওপর সম্পাদকের এতটাই আস্থা যে তিনি তাকে আসাম এবং ত্রিপুরাতেও পাঠাতে চাইছেন। চিঠির এই অংশটা পড়ে বিনয় অভিভূত। কিন্তু অন্য একটা দিক তাকে ভীষণ বিচলিত করে তুলেছে। কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে।
জগদীশবাবু চান সে পনেরো কুড়ি দিনের মধ্যে যেন কলকাতায় ফিরে আসে। কিন্তু মধ্য আন্দামানে গিয়ে ঝিনুকের সঙ্গে এখনও দেখাই করতে পারে নি। কবে দেখা করা সম্ভব তাই বা কে জানে। লা-পোয়ে অবশ্য ভরসা দিয়েছে সে তাদের মোটর-বোটে মধ্য আন্দামানে নিয়ে গিয়ে ঝিনুকদের সেটলমেন্টে পৌঁছে দেবে। কিন্তু রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত বৃন্দাবনকে নিয়ে শেখরনাথের সঙ্গে তাকে পোর্টব্লেয়ারে আসতে হয়েছে। প্রতিবেদন এবং কয়েকটা চিঠি লেখার জন্য এখানে তাকে কয়েকদিন থাকতে হবে। তার ভেতর লা-পোয়েরা জেফ্রি পয়েন্টে এসে তাকে না পেয়ে হয়তো চলে যাবে। সমস্ত ব্যাপারটা কেমন যেন অনিশ্চিত হয়ে পড়ল।
জোড়া জানলার বাইরে ফিনিক-ফোঁটা জ্যোৎস্নায় স্বপ্নবৎ সমুদ্র এবং চারিদিকের দ্বীপ, পাহাড় এবং অরণ্যের দিকে অন্যমনস্কর মতো তাকিয়ে থাকে বিনয়। তারপর হঠাৎ মনস্থির করে ফেলে। না, ঝিনুকের সঙ্গে দেখা না করে সে আন্দামান থেকে কিছুতেই কলকাতায় ফিরবে না। এক মাস লাগুক দুমাস লাগুক, কিংবা তারও বেশি, নানা কৌশলে আন্দামানে থেকে যাবে। এতে চাকরির ক্ষতি হয়তো হবে। হলে হবে। কিন্তু মেয়েটা সেই কৈশোর থেকে তার সমস্ত অস্তিত্বকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড খুঁজে বেড়াবার পর তাকে যখন বঙ্গোপসাগরের সৃষ্টিছাড়া দ্বীপে একবার দেখা গেছে, কী করে তাকে ফেলে চলে যাবে বিনয়?
এবার দ্বিতীয় চিঠিটি বের করল সে। এটা সুধার।–’স্নেহের ভাই বিনু, তোর আগের চিঠি পেয়েছি। গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাই আমাদের পরিবারে মহাশোকের ঘটনা ঘটে গেছে। তোর হিরণদার দাদু, আমার দাদাশ্বশুর দ্বারিক দত্ত কিছুদিন ধরেই ভুগছিলেন। মাঝে মাঝে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। সুস্থ হওয়ার পর তোর হিরণদা আর আমি তাকে বাড়ি ফিরিয়েও এনেছি। কিন্তু এবার আর সে সুযোগ পাওয়া গেল না। বাড়িতেই ঘুমের মধ্যে হৃদরোগে তিনি চিরকালের মতো আমাদের ছেড়ে চলে যান। আমাদের হাউস ফিজিসিয়ান ডাক্তার মজুমদারকে ডাকা হয়েছিল। তিনি এসে পরীক্ষা, করে বলেন হৃদ্যন্ত্রে আঘাতটা এতই গুরুতর যে কিছুই করার ছিল না; পাঁচ মিনিটের মধ্যে তাঁর মৃত্যু হয়। ডাক্তার মজুমদার ডেথ সার্টিফিকেট লিখে দিয়ে চলে যান। আমরা এতটাই দিশাহারা হয়ে পড়েছিলাম যে তোকে টেলিগ্রাম করে যে জানাব তা আমাদের মনেই আসে নি। প্রচণ্ড অন্যায় হয়ে গেছে। দুদিন আগে তার শ্রাদ্ধশান্তি হয়েছে। তোকে ভীষণ ভালবাসতেন। তুই আমাদের বাড়ি থেকে ‘শান্তিনিবাস’ মেসে চলে যাওয়ায় খুব দুঃখ পেয়েছিলেন। ঝিনুকের কথাও প্রায়ই বলতেন। মেয়েটা কোথায় যে নিরুদ্দেশ হল!

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।