বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আমি তো যাবই। আপনি এক কাজ করুন, কাল সকালেই বিনয়বাবুকে নিয়ে চলে যান। এর মধ্যে জেফ্রি পয়েন্টে অন্য কোনও ফ্যাসাদ ঘটেছে কিনা, কে জানে। আপনি ওখানে থাকলে সামলাতে পারবেন।‘
কিছুক্ষণ ভেবে শেখরনাথ বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি যাব, তবে কাল নয় পরশু। কালকের দিনটা বৃন্দাবনকে দু’বেলা হাসপাতালে গিয়ে দেখব। আমি থাকলে ওর বউ আর ছেলে অনেকটা ভরসা পাবে।‘
‘ঠিক আছে, তাই হবে—’
‘কিন্তু—’
জিজ্ঞাসু চোখে তাকালেন বিশ্বজিৎ। শেখরনাথ বললেন, ‘আমি চলে গেলে বৃন্দাবনকে দেখাশোনার কী হবে?’
‘সে ব্যবস্থা আমি করব। কোনওরকম ত্রুটি হবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। পুরোপুরি সুস্থ হলে ওদের জেফ্রি পয়েন্টে পাঠাব।‘
‘তোরা যে জিপটা দিয়েছিলি সেটা নিয়ে হরগোবিনকে কাল সকালে তো চলে যেতে বলেছি। বিনয়কে নিয়ে আমি ফিরব কী করে?’
‘এটা কি একটা সমস্যা হল? রিহ্যাবিলিটেশনের কি আর কোনও গাড়ি নেই? সব অ্যারেঞ্জমেন্ট হয়ে যাবে।‘
বিনয় চুপচাপ দু’জনের কথাবার্তা শুনতে শুনতে অস্বস্তি বোধ করছিল। একটু ইতস্তত করে বলল, ‘আমার কিছু বলার আছে—’
বিশ্বজিৎ এবং শেখরনাথের নজর তার দিকে ঘুরে গেল। বিশ্বজিৎ বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন—’
‘আমি কাকার সঙ্গে যাচ্ছি না। বেশ কদিন হল কাগজের জন্যে রিপোর্ট পাঠাতে পারি নি। জেফ্রি পয়েন্টে গিয়ে লিখে পাঠাতে অনেকটা সময় লাগবে। এখানে বসেই ওগুলো লিখে ফেলতে চাই। আপনি সঙ্গে সঙ্গেই কলকাতায় পাঠিয়ে দিতে পারবেন।
‘ঠিক আছে, তাই হবে। আপনি থেকে যান। লেখাটেখা হয়ে গেলে জেফ্রি পয়েন্টে যাবেন। সে ব্যবস্থাও করে দেব।’ বলতে বলতে হঠাৎ কিছু মনে পড়ে যাওয়ায় বেশ বিব্রত হয়ে পড়লেন বিশ্বজিৎ।–’ওই দেখুন, কলকাতা থেকে আপনার কটা চিঠি এসেছে, একটা প্যাকেটে ভরে রেখেছি ক’দিন আগে। জেফ্রি পয়েন্টে যে পাঠাব, নানা কাজের চাপে একদম খেয়াল ছিল না। আই অ্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি। প্যাকেটটা নিয়ে আসছি।’ ব্যস্তভাবে নিজের বেডরুম থেকে একটা বড় সাইজের মোটা প্যাকেট এনে বিনয়কে দিলেন।
কথায় কথায় অনেকটা রাত হয়ে গিয়েছিল। শেখরনাথ বললেন, ‘আর নয়, এবার শুয়ে পড়া যাক—’
.
নিজের ঘরে চলে এল বিনয়। এই ঘরে আগেও থেকে গেছে সে। বাংলোর কাজের ছেলে গোপালের সব দিকে নজর। সে পরিপাটি করে মশারি খাঁটিয়ে, খাটের শিয়রে আলো জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিল।
ডান পাশের জোড়া জানলাটা খোলা রয়েছে। সেখান দিয়ে অনেক দূর অবধি চোখে পড়ে। এটা বোধহয় পূর্ণিমাপক্ষ। আকাশে পূর্ণ চাঁদের মায়া। লক্ষ কোটি মাইল দূর থেকে চাঁদটা যেন গলানো রুপোর কলস উপুড় করে ঢেলে দিয়েছে। চাঁদ ছাড়া কত যে নক্ষত্র!
জানলার বাইরে খানিকটা দূর থেকে সমুদ্র–সেসোস্ট্রেস বে। চাঁদের আলোয় সেটাকে স্বপ্নের এক জলধারা মনে হয়। বাঁ দিকে যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় মাউন্ট হ্যারিয়েট। সেটার মাথায় সাদা ক্রসটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সমুদ্র বিপুল গর্জনে পাড়ে এসে অবিরল আছড়ে পড়ছে।
কোনও দিকে নজর ছিল না বিনয়ের। সাদা রংয়ের বড় প্যাকেটটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল সে। তারপর ব্যগ্রভাবে সেটার মুখ খুলতেই চারটে মাঝারি এবং ছোট মুখ-আঁটা খাম বেরিয়ে পড়ল। প্রতিটির ওপর তার নাম লেখা আছে। শ্রী বিনয়কুমার বসু। C/O শ্রী বিশ্বজিৎ রাহা, ম্যাজিস্ট্রেট এবং রিহ্যাবিলিটেশন অফিসার, পোর্টব্লেয়ার, আন্দামান, মেরিন জেটির নিকটে।
একটা খাম হাতে তুলে নিল বিনয়। হাতের লেখাটি অত্যন্ত পরিচিত। ‘নতুন ভারত’ পত্রিকার চিফ রিপোর্টার প্রসাদ লাহিড়ি। খামের মুখ ছিঁড়ে ভেতর থেকে চিঠি বের করে পড়তে লাগল বিনয়।
‘প্রিয় বিনয়, তোমার প্রতিবেদনগুলো নিয়মিত পাওয়া যায় না। মাঝে মাঝে বেশ দেরি করে পাঠাও। তুমি অবশ্য জানিয়েছ, পোর্টব্লেয়ার থেকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূরে জেফ্রি পয়েন্টে উদ্বাস্তুদের নতুন সেটলমেন্টে বর্তমানে আছ। জঙ্গল-ঘেরা দুর্গম এলাকায়। পোস্ট অফিস নেই। বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবেদন পাঠানোর খুবই অসুবিধা। তুমি জানিয়েছ, পুনর্বাসন বা বনদপ্তরের কোনও কর্মী জরুরি কাজে পোর্টব্লেয়ারে এলে তুমি তাদের হাত দিয়ে লেখাগুলি বিশ্বজিৎ রাহার কাছে পাঠিয়ে দাও। তিনি আমাদের কাছে পাঠান। এই প্রক্রিয়াটি খুবই সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। মাঝে মাঝে লেখা না পাওয়ায় ধারাবাহিক প্রকাশে ছেদ পড়ে।
‘তোমাকে আগেও লিখেছি, আন্দামান সম্পর্কে পাঠকের বিপুল আগ্রহ। তোমার লেখা যত পড়ছে। ততই তাদের প্রত্যাশা বাড়ছে। বিপ্লবী শেখরনাথের সেলুলার জেলে বছরের পর বছর কাটানোর বিবরণ পাঠক একরকম গোগ্রাসে গিলেছে। আন্দামানের গভীর জঙ্গলে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে উদ্বাস্তুরা সেভাবে সেটলমেন্ট গড়ে তুলছে তার প্রভাব কলকাতার ত্রাণশিবির এবং শিয়ালদা স্টেশনে যে পূর্ব পাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষেরা নরকযন্ত্রণা ভোগ করে চলেছে তাদের ওপর প্রবলভাবে পড়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো যদি এদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে বাধা না দেয় তবে অনেকেই আন্দামানে চলে যেতে প্রস্তুত। সঠিক প্রতিবেদন যে মানুষকে কতটা আশা জোগাতে পারে সেটা কলকাতায় বসে আমরা বুঝতে পারছি। তোমার প্রতিবেদনগুলো আমাদের নতুন পত্রিকা ‘নতুন ভারত’কে অনেক উচ্চতায় তুলে নিয়ে গেছে। সার্কুলেশনও বাড়ছে হু হু করে। এটা তোমার মতো নতুন একজন সাংবাদিকের পক্ষে বিরাট কৃতিত্ব।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।