ডাক্তার চট্টরাজও হাসলেন।
শেখরনাথ বিশ্বজিৎকে বললেন, ‘বিশু, আমরা সেই সকালবেলায় জেফ্রি পয়েন্টে থেকে বেরিয়ে এসেছি। বৃন্দাবনের বউ আর ছেলে বাসি রুটি আর গুড় খেয়ে মাঠের কাজে নেমেছিল। তারপর ওদের আর কিছু খাওয়া হয়নি। বিনয় আর আমার পেটে একফোঁটা জলও পড়ে নি। আমাদের সবার খাওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার।
বিশ্বজিৎ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। –’ইস, আগে জানতে পারলে খাবার দাবার নিয়ে আসতাম। ডাক্তার চট্টরাজ বললেন বৃন্দাবন কুণ্ডুর ক্রাইসিস আর নেই। চলুন, আমার বাংলোয় যাওয়া যাক।
‘বিশু, একটা কথা বলছিলাম। এর আগে মোহনবাঁশিদের তোর ওখানে বেশ কয়েকদিন রেখেছিলাম। বার বার তুই কত হুজ্জত পোহাবি? এবারডিন মার্কেটের পাশে রিফিউজিদের ট্রানজিট সেন্টারে কি বৃন্দাবনের বউ আর ছেলেকে রাখার ব্যবস্থা করবি?’
এবারডিন মার্কেটের লাগোয়া লম্বা ব্যারাক টাইপের তিনটি বাড়ি পুনর্বাসন দপ্তর ভাড়া নিয়েছে। কলকাতা থেকে উদ্বাস্তুরা আন্দামানে এলে একটা রাত এখানে রেখে দক্ষিণ আন্দামানের নতুন নতুন রিফিউজি সেটলমেন্টগুলোতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কিংবা যেসব শরণার্থী আগেই এসে দূর দূর সেটলমেন্টগুলোতে চলে গেছে, অসুখবিসুখের চিকিৎসা বা অন্য কারণে পোর্টব্লেয়ারে আসতে হলে দু-চারদিন এখানেই কাটাতে পারে। এসব বিনয়ের জানা।
বিশ্বজিৎ হাত নাড়তে নাড়তে বললেন, ‘না না, হুজ্জত আবার কিসের। আমার বাংলোয় তিন চারটে ঘর তো খালিই পড়ে থাকে। তাছাড়া বৃন্দাবনের বউ আর ছেলের ওপর দিয়ে সারা দিন ঝড় বয়ে গেছে। ট্রানজিট সেন্টারে পাঠালে ওরা দিশেহারা হয়ে পড়বে। আমাদের কাছেই দু’জনকে রাখা দরকার। ডাক্তার চট্টরাজ, বৃন্দাবনকে কতদিন হাসপাতালে থাকতে হবে?
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, আপনি আসার আগে কাকাকে জানিয়েছি ম্যাক্সিমাম চার-পাঁচ দিন। তারপরেই ডিসচার্জ করে দেওয়া হবে।
‘এখন তা হলে যাওয়া যাক—’ বিশ্বজিৎ উঠে পড়েন।
‘হ্যাঁ, আসুন—’
সন্ধের একটু পরে পরেই বিশ্বজিৎ রাহার গাড়িতে সবাই তার বাংলোয় পৌঁছে গেলেন।
উলুপী আর তার ছেলে সেই সকাল থেকে কতক্ষণ যে একটানা কেঁদেছে। তারপর পেটে প্রায় কিছুই পড়ে নি। বিনয় আর শেখরনাথেরও একই হাল। সবাই প্রায় ধুঁকছিল।
বিশ্বজিৎ তাঁর তিন কাজের লোককে তাড়া দিয়ে তাড়াতাড়ি গরম জল করে দিতে বললেন। রান্নার লোক ভুবনকে বললেন, ‘এক্ষুনি রান্না বসিয়ে দাও—’
স্নান-খাওয়াদাওয়া সারতে সারতে বেশ রাত হল। এই বাংলোয় এলে শেখরনাথ আর বিনয়ের জন্য যে দুটো ঘরে থাকার ব্যবস্থা করা হয় সেখানেই বিছানা পেতে দেওয়া হল। মোহনবাঁশির বউ ছেলেমেয়েদের জন্য যে ঘরটা ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল সেখানে বিছানা পেতে উলুপী আর তার ছেলেকে পাঠানো হল। যে ক’দিন ওরা পোর্টব্লেয়ারে আছে ওখানেই থাকবে। মা আর ছেলে সমস্ত দিন উৎকণ্ঠায়, কান্নাকাটিতে এতটাই কাহিল হয়ে পড়েছে যে বসে থাকতে পারছিল না। তারা শুয়ে পড়েছে।
কিন্তু ক্লান্তি নেই শেখরনাথের। ধকল তো তার ওপর দিয়েও কম যায় নি। কিন্তু এখন তাঁকে দেখে কে তা বলবে। ষাটের কাছাকাছি বয়স। এই বয়সেও শরীর এবং মনের জোর কী বিপুল। স্নান-খাওয়ার পর তিনি বেশ সজীব হয়ে উঠেছেন।
এখন হলঘরের মতো প্রশস্ত ড্রইংরুমে বসে তিনজনে কথা বলছিলেন। বিশ্বজিৎ, শেখরনাথ এবং বিনয়। বিনয়ের ক্লান্তি কিন্তু কাটে নি। পেটে ভাত পড়তেই তার দু’চোখ জুড়ে আসছিল। প্রায় বৃদ্ধ শেখরনাথ যখন তাঁর ধারেকাছে ঘুমকে ঘেঁষতে দিচ্ছেন না তখন তার পক্ষে ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়াটা দৃষ্টিকটু তো বটেই, অশোভনও। বিনয় অতি কষ্টে চোখ মেলে রাখতে চাইছিল।
বিশ্বজিৎ বলছিলেন, কাকা, তখন হাসপাতালে আমাকে জেফ্রি পয়েন্টে গিয়ে কিছুদিন থেকে আসার কথা বলেছেন। আমি রাজিও হয়েছিলাম। কিন্তু ভেবে দেখলাম এখন অন্তত পনেরো কুড়ি দিন আমার পক্ষে ওখানে যাওয়া সম্ভব হবে না।
‘কেন?’ শেখরনাথ বিশ্বজিতের দিকে তাকালেন।
‘আমার কোর্টে বেশ কয়েকটা জরুরি কেস রয়েছে। পর পর ডেট দিয়েছি। তা ছাড়া, শুধুমাত্র মিডল আন্দামানের জন্যে মাসদেড়েক বাদে কলকাতা থেকে আরও শ’খানেক ডিপি ফ্যামিলি আসবে। তাদের রিহ্যাবিলিটেশনের জন্যে জঙ্গল কেটে অনেকটা জমিও বের করা হয়েছে। সেই ব্যাপারে চিফ কমিশনারের সঙ্গে আমাদের মতো কয়েকজন অফিসারের আর্জেন্ট কনফারেন্সও আছে। বারো চোদ্দ দিন আমাকে পোর্টব্লেয়ারে ভীষণ ব্যস্ত থাকতে হবে।‘
একটু নীরবতা।
তারপর বিশ্বজিৎই ফের শুরু করলেন, ‘খবর পাচ্ছি কলকাতায় বামপন্থী দলগুলোর আন্দোলন আরও মারাত্মক হয়ে উঠেছে। যদি উদ্বাস্তুরা আসতে না পারে, এখানকার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন মোপলাদের ওখানে বসিয়ে দেবার কথা ভাবছে। সাউথ আন্দামানে মোপলাদের বসাতে হয়তো পারবে না। কিন্তু মিডল আন্দামানটা ভেতরে ভেতরে টার্গেট করা আছে। ওয়েস্ট বেঙ্গলের লেফট পার্টিগুলোর ভাবা উচিত বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্যে এতবড় সুযোগ হাতছাড়া করা ঠিক হবে কিনা।‘ তাকে বেশ চিন্তাগ্রস্ত দেখা গেল।
আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন শেখরনাথ। –’বাঙালি উদ্বাস্তুদের স্বার্থের কথা নেতাদের ভাবা উচিত। সে যাক, জেফ্রি পয়েন্টে নিত্যনতুন যে উৎপাতই আরম্ভ হয়েছে তা বন্ধ করা দরকার। তুই যেতে না পারলে—’ বাকিটা শেষ না করে তিনি থেমে গেলেন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।