উলুপী গুছিয়ে বলতে পারে। সকালবেলার মর্মান্তিক ঘটনাটার অনুপুঙ্খ বিবরণ দিয়ে গেল সে। মধুকর পান্ডের চোখের ইঙ্গিতে সুরেশ লিখে যেতে লাগল।
মিনিট দশেকের ভেতর উলুপীর বলা শেষ হল, সুরেশের লেখাও। মধুকর পান্ডে সুরেশকে বললেন, ‘এবার আস্তে আস্তে বাংলায় তর্জমা করে নবদ্বীপ কুণ্ডুর বিবিকে শুনিয়ে দাও।‘
সুরেশ ইংরেজিতে উলুপীর বয়ান লিখে নিয়েছিল। সেটা বাংলা করে শুনিয়ে দিল।
মধুকর উলুপীকে জিগ্যেস করলেন, ‘কী, ঠিক আছে?’
‘হ, বড়বাবুরা—’ উলুপী আস্তে মাথা নাড়ল।
মধুকর বললেন, ‘লক্ষ্মণকে ছাড়া হবে না। দু-এক দিনের ভেতর তাকে আদালতে তোলা হবে। তুমি নিশ্চয়ই চাও, লক্ষ্মণের সাজা হোক—’
‘নিয্যস চাই। উই ড্যাকরা রাইক্ষসটারে আপনেরা ফাসিতে ঝুলাইয়া দ্যান দারোগা কত্তা।’ বলে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
‘কেঁদো না, কেঁদো না। তুমি যা বললে তা তোমাকে শোনানো হয়েছে। আবার জিগ্যেস করছি, ঠিক লেখা হয়েছে তো?’
উলুপী মাথা কাত করল।–’হ, ঠিকই আছে।‘
‘নিজের নাম সই করতে পার?
‘না বাবা, লিখাপড়া তো শিখি নাই।‘
‘তা হলে আঙুলের টিপছাপ দিতে হবে। সুরেশ, তুমি ওটা নিয়ে নাও—’
সুরেশ নিয়োগী ইংক-প্যাড নিয়ে এসেছিল। উলুপীর মুখ থেকে শুনে যে বয়ানটা লেখা হয়েছিল তার তলায় ডান হাতের বুড়ো আঙুলে কালি লাগিয়ে উলুপীর টিপছাপ নেওয়া হল। তারপর শেখরনাথ এবং বিনয়কে অনুরোধ করতে তারা সাক্ষী হিসেবে সই করলেন। একজন নিরক্ষর মেয়েমানুষকে যে জোর করে বা ভুলিয়ে ভালিয়ে বয়ানের তলায় টিপছাপ নেওয়া হয় নি তার সাক্ষী থাকা দরকার। পরে যাতে অভিযোগকারী তা অস্বীকার করতে না পারে তাই পুলিশকে আটঘাট বেঁধে পাকা কাজ করতে হয়।
মধুকর পাণ্ডে বললেন, ‘আজ আমরা উঠি। নমস্তে চাচাজি, নমস্তে ডাক্তার চট্টরাজ, নমস্তে বিনয়বাবু—’ এখানকার কাজ হয়ে গেছে। আর বসে থাকার প্রয়োজন নেই। সুরেশকে নিয়ে তিনি চলে গেলেন।
.
উলুপী আর তার ছেলেকে বাইরের প্যাসেজে নিয়ে বসতে যাচ্ছিলেন শেখরনাথ, সেই সময় বিশ্বজিৎ রাহা ব্যস্ত পায়ে ডাক্তার চট্টরাজের চেম্বারে এসে ঢুকলেন। একটা ফাঁকা চেয়ারে বসতে বসতে শেখরনাথকে বললেন, ‘জেফ্রি পয়েন্টে এসব কী হচ্ছে! সেদিন জারোয়ারা মোহনবাঁশিকে তির মেরে জখম করেছিল, সেটা না হয় বোঝা গেল। এই আদিবাসীরা চায় না বাইরের লোকজন এসে তাদের এলাকার জঙ্গলটঙ্গল কেটে সেটলমেন্ট বানিয়ে পার্মামেন্টলি থাকুক। কিন্তু তাই বলে রিফিউজিরা এখানে আসতে না-আসতেই জমি নিয়ে মারদাঙ্গা শুরু করে দিল! ড্রাইভার হরগোবিনের মুখে সব শুনেছি। জমির বাউণ্ডারিতে খুঁটি পুঁতে পুঁতে সীমানা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্মণ ভক্ত কিনা খুঁটি তুলে নবদ্বীপের জমির অনেকখানি এলাকা দখল করতে চেয়েছে! কোথায় মিলেমিশে থাকবে, তা নয়, জমি পেয়েই বজ্জাতি। আমার কিন্তু খুব দুশ্চিন্তা হচ্ছে কাকা–’
ঠিক কোন কারণে বিশ্বজিতের দুর্ভাবনা অনুমান করতে না পেরে তার দিকে তাকালেন শেখরনাথ।
বিশ্বজিৎ তাঁর মনোভাব আঁচ করে নিয়ে বললেন, ‘এটা কিন্তু সূত্রপাত কাকা। এইরকম জমি দখলের ঘটনা কিন্তু আরও বাড়বে বলেই মনে হয়। দেশ থেকে উৎখাত হয়ে এসে কত কষ্ট পেয়েছে লোকগুলো কিন্তু জমি পেয়েই তাদের কুচুটেপনা, শয়তানি শুরু হয়ে গেছে। ইমিডিয়েটলি এসব বন্ধ করা দরকার।’
শেখরনাথ বললেন, ‘দরকার তো বটেই। নইলে জমি নিয়ে খুনোখুনি করে ওরা মরবে।‘
‘পরিতোষ বণিক লোক ভাল। কিন্তু বড় মিনমিনে, নরম ধরনের। ওর পক্ষে কড়া স্টেপ নেওয়া অসম্ভব। কাকা, আপনি তো এখন জেফ্রি পয়েন্টে থাকছেন। আপনাকে মেনলি ব্যাপারটা ট্যাকল। করতে হবে।‘
একটু চুপ করে রইলেন শেখরনাথ। কিছু ভেবে নিয়ে বললেন, ‘দ্যাখ, আমি বাইরের লোক, গভর্নমেন্টের কোনও পোস্ট হোল্ড করি না। লোকে আমাকে ভালবাসে, সম্মান দেয় তাই যা বলি সবাই মেনে নিচ্ছে। কিন্তু হঠাৎ কেউ ফস করে বলে বসতে পারে, আপনি কেন মাতব্বরি করছেন। মশাই, আপনি তো গভর্নমেন্টের কেউ নন। আপনার কথা শুনব কেন? আপনার ফোপরদালালি মানব না। তখন কী জবাব দেব?’
গলার স্বর একটু উঁচুতে তুললেন বিশ্বজিৎ।–’স্বাধীনতার পর থেকে এই আইল্যাণ্ডে কেউ কখনও আপনার মুখের ওপর কথা বলতে সাহস করেছে! রিফিউজিদের এত বড় বুকের পাটা কোনওদিন হবে না।‘
‘আমার কথাটা শোন। আমি জেফ্রি পয়েন্টে তো বেশ কিছুদিন থাকছিই। সেটলমেন্টটা যাতে ভালভাবে তৈরি হয় সেটা দেখব। লক্ষ্মণের মতো পাজি বজ্জাতদের ঢিট করতে চেষ্টা করব। কিন্তু তুই হলি রিহ্যাবিলিশনের একজন বড় কর্তা। তোর ওই সেটলমেন্টে গিয়ে শাসানি দেওয়া উচিত। কোনওরকম শয়তানি যে বরদাস্ত করা হবে না সেটা আমি বুঝিয়েছি। তুই নিজে বললে তার গুরুত্ব আরও বাড়বে।’
‘ঠিক আছে, শিগগির ওখানে গিয়ে কয়েকদিন থাকব।’ বলেই ডাক্তার চট্টরাজের দিকে তাকালেন। বিশ্বজিৎ।–’বৃন্দাবন কুণ্ডুর শরীরের হাল এখন কতটা ক্রিটিকাল?’
ডাক্তার জানালেন, ক্রাইসিস কেটে গেছে। বৃন্দাবন চোটটা সামলে নিয়েছে। আর কোনও সমস্যা নেই। ইত্যাদি ইত্যাদি।
বিশ্বজিৎ সামান্য হাসলেন।–’রিফিউজিরা আন্দামানে আসতে শুরু করেছে। নিজেদের মধ্যে এরকম ঝগড়াঝাটি, মারপিট করলে আরও অনেক ক্রিটিকাল কেস নিয়ে আপনার হাসপাতালে আসতে হবে।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।