শেখরনাথের মাথায় পাষাণভারের মতো যে দুর্ভাবনাটা চেপে বসেছিল সেটা লহমায় উধাও। সেই সকাল থেকে সারাদিন যে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল তাতে মনে হয়েছে সমস্ত স্নায়ুমণ্ডলী ছিঁড়ে খুঁড়ে ছত্রখান হয়ে যাবে। কী কষ্টে যে সেগুলোকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, তিনিই জানেন। চাপ কেটে যাওয়ায় এখন রীতিমতো হালকা লাগছে। উলুপীর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শুনলে তো, ডাক্তারবাবু কী বললেন। আর ভয় নেই—’
ধরা ধরা, ঝাপসা গলায় উলুপী বলল, ‘বড়কত্তা, কইছিলাম না আপনে আমাগো ভগমান। আপনের আর ডাক্তারকত্তার দয়ায় মানুষডারে ফিরা পামু—‘
শেখরনাথের চোখ এবার ডাক্তার চট্টরাজের দিকে ঘুরে গেল।–-‘এই সুখবরটা তো প্যাসেজেই দিতে পারতে। সেজন্যে চেম্বারে ডেকে আনতে হল!’ তার কণ্ঠস্বর লঘু শোনাল।
‘না কাকা, এটা তো আছেই। আরও একটা জরুরি বিষয়ও রয়েছে।‘
উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন শেখরনাথ।
ডাক্তার চট্টরাজ বললেন, ‘নবদ্বীপের এত বড় হেড ইনজুরি হল কী করে? জারোয়াদের কথা জিগ্যেস করেছিলাম, আপনি বললেন পরে জানাবেন। এটাও কি মোহনবাঁশির মতোই জারোয়ারা ঘটিয়েছে?’
‘না।‘
‘তবে?’
বিশদভাবে জানিয়ে দিলেন শেখরনাথ। কপালে ভাঁজ পড়ল ডক্তার চট্টরাজের।–’খুবই চিন্তার বিষয়। এটা ক্রিমিনাল কেস। পুলিশকে এক্ষুনি জানাতে হবে। মস্ত টেবিলের এক কোণে টেলিফোন রয়েছে। আঙুল ঘুরিয়ে ডায়াল করে নবদ্বীপের ব্যাপারটা জানিয়ে বললেন, ‘মিস্টার পান্ডে, একটা ডায়েরি করতে হবে। … ও, আপনি নিজেই আসছেন? খুব ভাল। …হ্যাঁ হ্যাঁ, ওরা আছে… মিনিট পনেরোর ভেতর পৌঁছে যাবেন? থ্যাঙ্ক ইউ’– কথা শেষ করে ফোনটা জায়গামতো নামিয়ে রাখলেন। ফের তার চোখ শেখরনাথের দিকে।–’নবদ্বীপের স্ত্রী এবং ছেলে সমস্ত ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তা ছাড়া ওদের স্বামী আর বাবাকে অমন নিষ্ঠুরভাবে মারা হয়েছে। ডায়েরিটা ওদেরই করতে হবে।‘
উলুপীরা দাঁড়িয়েই ছিল। ডাক্তার চট্টরাজ তাদের বললেন, ‘তোমাদের দুশ্চিন্তা তো কেটেছে। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে! পায়ে ঝিঁঝি ধরে যাবে যে। বোসো, বোসো—’
অনেকবার বলা সত্ত্বেও উলুপীদের চেয়ারে বসানো গেল না; তারা মেঝেতে বসল।
হঠাৎ কিছু খেয়াল হওয়ায় শেখরনাথ বললেন, ‘ডাক্তার, নবদ্বীপকে আজ কি একবার দেখা যায়?’
‘আজকের দিনটা থাক কাকা। কাল ওদের এনে দেখে যাবেন।‘
‘ঠিক আছে। কতদিন নবদ্বীপকে হাসপাতালে থাকতে হবে?’
‘আশা করি পাঁচ ছ’দিন পরে ওকে রিলিজ করে দিতে পারব। খুব সম্ভব নতুন কোন কমপ্লিকেশন হবে না।‘
পোর্টব্লেয়ার থানার দারোগা মধুকর পান্ডে এবং একজন রাইটার জমাদার, যার নাম সুরেশ নিয়োগী, ডাক্তার চট্টরাজের চেম্বারে এসে ঢুকলেন।
মধুকর পান্ডের বয়স পঞ্চান্নের আশপাশে। ছফিটের কাছাকাছি উচ্চতা। মজবুত, পেটানো স্বাস্থ্য। চুল চামড়া ঘেঁষে ছোট ছোট করে ছাঁটা। শক্ত চোয়াল, পুরু ঠোঁট, তামাটে রং। নাকের তলায় চাড়া দেওয়া গোঁফ। গায়ে পুলিশের উর্দি। পায়ে ভারী বুট।
মধুকর খাস বেনারসের লোক, সুরেশ পশ্চিম বাংলার হুগলি জেলার। দু’জনেই পুলিশে চাকরি নিয়ে পোর্টব্লেয়ারে এসেছেন।
মধুকর বললেন, ‘নমস্তে ডাক্তার চট্টরাজ। আপনার তলব পেয়ে দেখুন ঠিক পন্দ্র মিনিটের ভেতর চলে এসেছি। পরক্ষণেই তার চোখ এসে পড়ল শেখরনাথের ওপর। সসম্ভ্রমে মাথাটা অনেকখানি ঝুঁকিয়ে দিলেন।–’নমস্তে, নমস্তে চাচাজি। আপনি হাসপাতালে আছেন ডাক্তার চট্টরাজ ফোন করার অনেক আগেই জেনেছি। রিফিউজি রিহ্যাবিলিটেশনের দু’জন এমপ্লয়ী জেফ্রি পয়েন্ট থেকে লক্ষ্মণ ভক্ত নামে একটা রিফিউজিকে নিয়ে এসেছে। বলেছে আপনিই তাদের আমার কাছে পাঠিয়েছেন। লক্ষ্মণ নবদ্বীপ কুণ্ডু নামে অন্য একটা রিফিউজিকে এমন মার মেরেছে যে হয়তো বাঁচবে না। তাকে নিয়ে আপনি হাসপাতালে এসেছেন। লক্ষ্মণকে আমি লক-আপে আপাতত ভরে রেখেছি। ডিটেলে সমস্ত ঘটনাটা আমাদের জানা দরকার।‘
মধুকর আন্দামানের হিন্দি-উর্দু মেশানো ভেজাল হিন্দিতে কথা বলেন না। তাঁর হিন্দি উত্তরপ্রদেশের খাস বিশুদ্ধ হিন্দি। আন্দামানের অন্য বাসিন্দাদের মতো তিনিও প্রাক্তন স্বাধীনতা-সংগ্রামীকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করেন।
নমস্কার প্রতি-নমস্কারের পর্ব শেষ হলে ডাক্তার চট্টরাজ মধুকরদের বসতে বললেন। টেবিলের এধারে ছ’টা ফাঁকা চেয়ার রয়েছে। সুরেশকে নিয়ে মধুকর বসে পড়লেন। বিনয়ের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল।
মধুকর বললেন, ‘সমস্ত কেসটা এবার শোনা যাক। সুরেশ, তোমার কাগজপত্র কলম-টলম বের কর—’
সুরেশ নিয়োগী একটা চামড়ার ব্যাগ নিয়ে এসেছিল। সেটার ভেতর থেকে কাগজ এবং পেন বের করে টেবিলের ওপর রেখে প্রস্তুত হয়ে রইল।
মেঝেতে বসে থাকা উলুপী আর তার ছেলের দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিলেন শেখরনাথ।–’ওরা হল নবদ্বীপের বউ আর ছেলে। ওরা তোমাকে ডিটেলে সবটা বলতে পারবে। ঘটনাটা যখন ঘটে তখন আমি আর বিনয় প্লেস অফ অকারেন্সে ছিলাম না। ছিলাম বেশ খানিকটা দূরে। হইচই শুনে ছুটে এসে সবটা শুনি। যা শুনেছি সেটা বলতে গেলে কিছু কিছু বাদ যেতে পারে, কিছু ভুল হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। নবদ্বীপের স্ত্রী আর ছেলে তার সঙ্গেই ছিল। ওরাই ঠিক ব্যাপারটা বলতে পারবে। উলুপী, তুমি দারোগাবাবুকে সব বল। খুঁটিনাটি কিছু বাদ দেবে না—’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।