গ্রাম্য, নিরক্ষর এই নারীটির তার স্বামীর জন্য কী নিদারুণ উৎকণ্ঠা তা বুঝতে পারছিলেন শেখরনাথ। তার মাথায় একখানা হাত রেখে অফুরান সহানুভূতির সুরে বললেন, ‘ঠিক আছে, এখন তোমাদের খেতে হবে না।–-‘ একটু ভেবে জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার কী নাম মা?’
‘উলুপী—’
‘তুমি ভগবানে বিশ্বাস কর?’
অবাক চোখে কয়েক লহমা শেখরনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে উলুপী। তারপর বলে, ‘এই আন্ধারমান দ্বীপি আপনেই আমাগো ভগমান। আপনে ক’ন (বলুন), হ্যায় (সে অর্থাৎ বৃন্দাবন) পরানে বাঁচব কিনা—’
ক’দিন আর, তাকে দেখছে এই উদ্বাস্তু রমণী। তবু তার ওপর কী অসীম আস্থা মেয়েটার, কত বিশ্বাস। শুধু উলুপীই নয়, জেফ্রি পয়েন্টের সব উদ্বাস্তুরই শেখরনাথের ওপর সীমা-পরিসীমাহীন নির্ভরতা। তিনি কিছুক্ষণ অভিভূত হয়ে চুপ করে থাকেন। তারপর বললেন, ‘আমি কেউ না, সামান্য মানুষ। দু’জন নবদ্বীপকে বাঁচাতে পারেন। আমার বিশ্বাস বাঁচাবেনও।’ আকাশের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন।–’ওখানে যিনি আছেন তিনি আর যে ডাক্তারবাবু নবদ্বীপের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন।
‘তেনারা তো আছেই। উলুপী কেমন যেন জেদ ধরল, ‘আপনে একবার মুখ ফুইটা ক’ন (বলুন), তাইলেই আমার শান্তি। ক’ন কত্তা, কন—’ সে মাথা ঝাঁকাতে থাকে।
এতটা আস্থা মোহনবাঁশির বউ জ্যোৎস্নারও ছিল না। শেখরনাথ হকচকিয়ে গেলেন। নবদ্বীপের মাথায় আঘাত কতটা গুরুতর তা একমাত্র বলতে পারেন ডাক্তার চট্টরাজই। মিথ্যা আশ্বাস কখনও কারওকে দেন না শেখরনাথ। কিন্তু ব্যাকুল মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে গেল তার। নিজের অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল।–’বাঁচবে, নিশ্চয়ই বাঁচবে—’
শীর্ণ, শুষ্ক মুখমন্ডলে আলো ফুটল উলুপীর।
এদিকে আশ্বাসটি দেওয়ার পরই চমকে উঠেছেন শেখরনাথ। বলে তো ফেলেছেন। এখন তো আর তা ফেরানো যাবে না। কিন্তু নবদ্বীপ যদি না বাঁচে? উলুপীর দিকে মুখ তুলে ইহজন্মে আর কখনও কি তাকাতে পারবেন? মেয়েটি তাকে ভগবান বলেছে, নিজেকে তিনি তা-ই ভেবে নিলেন? ভগবান হওয়ার এতই স্পৃহা তাঁর? মনে মনে নিজেকে হাজারবার ধিক্কার দিলেন। অন্যায়, ঘোর অন্যায় হয়ে গেছে।
ঈশ্বর আদৌ আছেন কিনা, এই নিয়ে কখনও মাথা ঘামান নি শেখরনাথ। তাঁর ঈশ্বর হল দেশ, তার ঈশ্বর সত্য, আদর্শ, শুদ্ধ জীবনযাপন। নবদ্বীপ বাঁচবে কি বাঁচবে না, তার জানা নেই। জীবন মৃত্যুর মাঝামাঝি জায়গায় তার প্রাণটা ঝুলছে। তবু কিনা একটা অর্ধসত্য উচ্চারণ করে বসেছেন! ঈশ্বর নামে কোনও অলৌকিক এতকাল শেখরনাথের ত্রিসীমানায় ছিল না। আজ মনে মনে তার কাছে প্রার্থনা জানাতে লাগলেন।–-‘আমার মুখ রেখো। উলুপীকে যা বলেছি তা যেন সত্যি হয়।‘
অনেকক্ষণ নীরবতা।
তারপর শেখরনাথ বিনয়ের দিকে তাকালেন।-–’নতুন ভারত’-এর জন্যে খবর জোগাড় করতে এসেছ। দেখ, তোমার ওপর দিয়ে বার বার কী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেবার মোহনবাঁশি এবার নবদ্বীপ। সকাল থেকে তোমার পেটে এক দানা কিছুই পড়েনি। বড় খারাপ লাগছে।
বিনয় সামান্য হাসল।–’আপনিও তো কিছু খান নি কাকা।‘
শেখরনাথও হাসলেন।-–’এসবে আমার অভ্যাস আছে। তোমাকে তো বলেছি, সেলুলার জেলে কয়েদ খাটার সময় পান থেকে চুন খসলে কত দিন আমাদের ‘খানা বন্ধ’ হয়ে যেত। সারাদিন না খেয়ে থাকতাম। ঠিক আছে, বিশুকে খবর পাঠিয়েছি। সে নিশ্চয়ই এখানে চলে আসবে। ওর বাংলোয় গিয়ে একেবারে রাত্তিরেই খাওয়া যাবে।‘
এ দিনটা প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। সূর্য পশ্চিম দিকে মাউন্ট হ্যারিয়েটের আড়ালে নেমে গেছে। দিনের যে শেষ রোদটুকু এখনও রয়েছে কিছুক্ষণের মধ্যে তা আর থাকবে না। লাটাইতে সুতো গুটনোর মতো অদৃশ্য কোনও জাদুকর এক টানে সেটা টেনে নেবে।
নবদ্বীপকে ভর্তি করার পর দু’ঘণ্টার মতো কেটে গেছে। দোতলার টানা প্যাসেজে বিনয়রা বসেই আছে। অন্যমনস্কর মতো এলোমেলো দু-চারটে কথা যে বলছে না তা নয়। আপাতত বলার তো তেমন কিছু নেইও। বেশিরভাগ সময়টাই তারা চুপচাপ। প্রায় ঘণ্টা দুই এভাবে কাটানোর পর সন্ধে যখন নামবে নামবে সেই সময় ডাক্তার চট্টরাজ তেতলা থেকে বিনয়দের কাছে এগিয়ে এলেন। চুল উস্কোখুষ্কো, সাদা ধবধবে পোশাক এলোমেলো। তবে চোখেমুখে প্রশান্তি।
তাঁকে দেখে সবাই উঠে দাঁড়িয়েছিল। শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, ‘কী হল?’
উত্তর না দিয়ে ডাক্তার চট্টরাজ জানতে চাইলেন, ‘কাকা, যে আন-কনসাস ইনজিওরড লোকটিকে জেফ্রি পয়েন্ট থেকে নিয়ে এসেছেন তার কী নাম?’
‘নবদ্বীপ কুণ্ডু।’
উৎকণ্ঠিত উলুপী আর তার ছেলের দিকে তাকিয়ে এবার ডাক্তার চট্টরাজের প্রশ্ন।–-‘এরা কি নবদ্বীপের স্ত্রী ছেলে?’
‘হ্যাঁ। কেন বল তো?’
‘ওদের নিয়ে আমার চেম্বারে আসুন। দরকার আছে।‘
ডাক্তারের চেম্বারে গেলে তিনি সবাইকে বসতে বলে নিজের চেয়ারটিতে বসলেন। বিনয় আর শেখরনাথও বসে পড়লেন। তবে উলুপী আর ছেলেটি রুদ্ধশ্বাসে দাঁড়িয়ে রইল। দু’জনে ঘন ঘন ঢোক গিলছে কিন্তু নবদ্বীপ এখন কী অবস্থায় আছে, জিগ্যেস করতে সাহস হচ্ছে না তাদের। শেখরনাথ এবং বিনয়ের উদ্বেগ আর দুর্ভাবনা বাড়ছিল।
ডাক্তার চট্টরাজ সবার মনোভাব বুঝতে পারছিলেন। বললেন, ‘ভয় নেই। নবদ্বীপ বেঁচে যাবে। আমার ধারণা আর দেড়-দু’ঘণ্টার মধ্যে তার জ্ঞান ফিরে আসবে। আপনাদের বিশেষ করে নবদ্বীপের কনসেন্ট নেবার প্রশ্নই ছিল না। এমার্জেন্সি অপারেশন করতে হয়েছে। অ্যান্ড দ্যাট ওয়াজ সাকসেসফুল। অনেকটা রক্ত পড়েছে। তাই ব্লাড দিতে হচ্ছে। কাকা, রক্ত আর অন্য সব মেডিসিনের দামটা কিন্তু দিতে হবে।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।