‘এক্ষুনি ব্যবস্থা করছি। আপনি আমার সঙ্গে আসুন—’
ক্ষিপ্র পায়ে বাইরে বেরিয়ে সোজা এমার্জেন্সি ডিপার্টমেন্টে চলে গেলেন ডাক্তার চট্টরাজ। সেখান থেকে স্ট্রেচার এবং দু’জন স্ট্রেচারবাহক নিয়ে হাসপাতালের সামনের খোলা জায়গায় নেমে এলেন। সঙ্গে শেখরনাথ।
জিপের ভেতর সবাই রুদ্ধশ্বাসে চুপচাপ বসে ছিল! নবদ্বীপের বউ এখন আর কান্নাকাটি করছে না। সকাল থেকে অবিরল আর্ত চিৎকারের পর কান্নার শক্তিটাই বুঝিবা সে হারিয়ে ফেলেছে। পরিস্থিতি এতটাই বিষাদময় যে কিছুই ভাল লাগছিল না বিনয়ের। ভেতরে ভেতরে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল। একটা প্রশ্নই ঘুরে ফিরে নানা দিক থেকে তার মাথায় ঢুকে যাচ্ছিল–নবদ্বীপ বাঁচবে তো?
ডাক্তার চট্টরাজ দুই বাহককে বললেন, ‘যে লোকটাকে শোওয়ানো হয়েছে, খুব সাবধানে নামিয়ে এনে স্ট্রেচারে তুলে এমার্জেন্সিতে নিয়ে যাও। দেখো, ওর যেন চোট টোট না লাগে।‘
লহমায় নির্দেশ পালিত হল।
শেখরনাথ নবদ্বীপের বউছেলেকে নেমে আসতে বললেন।
ইতিমধ্যে বাহকেরা নবদ্বীপকে স্ট্রেচারে তুলে ফেলেছে। তার মাথায় পুরু করে যে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেওয়া হয়েছিল তা রক্তে ভিজে গেছে। তবে চুঁইয়ে চুঁইয়ে আর রক্ত বেরুচ্ছে না। রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে গেছে।
বিনয়রা সবাই নেমে পড়েছিল। আতঙ্কগ্রস্ত, বিহ্বল নবদ্বীপের বউ বলল, ‘হ্যারে (তাকে) কুনহানে (কোথায়) লইয়া যাইব?’
ডাক্তার চট্টরাজকে দেখিয়ে সদয় গলায় শেখরনাথ বললেন, ‘উনি এই হাসপাতালের বড় ডাক্তার; তোমার স্বামীর চিকিৎসা করবেন।
‘বড়কত্তা, আপনে ক’ন হ্যায় (সে) বাচব তো?’
মোহনবাঁশির বউ জ্যোৎস্নাও এই প্রশ্নটা তার স্বামী সম্পর্কে করেছিল। একই উত্তর দিলেন শেখরনাথ।–’বাঁচাবার জন্যেই তো এতদূরে নিয়ে এলাম।–বিনয়, তুমি ওদের নিয়ে দোতলায় টানা বারান্দায় যে বেঞ্চিগুলো পাতা আছে, সেখানে নিয়ে ব’সো। নইলে ওরা ভরসা পাবে না। আমি হরগোবিনকে চ্যাথামে পাঠিয়ে আসছি।‘
‘আসুন—’ নবদ্বীপের বউছেলেকে সঙ্গে করে বিনয় হাসপাতালের মেন বিল্ডিংয়ে ঢুকে দোতলার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
আর শেখরনাথ জিপের ড্রাইভার হরগোবিনের কাছে গিয়ে একশো টাকার একটা নোট নিয়ে বললেন, তুমি চ্যাথাম জেটিতে গিয়ে লা-ডিন, ধনপত আর লক্ষ্মণকে তুলে থানায় যাবে। সেখানে কী করতে হবে লা-ডিনরা জানে। ওখানকার কাজ শেষ হলে তুমি তোমাদের রাহা সাহেবের কাছে। গিয়ে বলবে আমরা হাসপাতালে আছি। তিনি যেন সেখানে একবার আসেন। আর হ্যাঁ, যে টাকাটা দিলাম তোমরা কিছু খেয়ে নিও। রিফিউজিদের জন্যে এবারডিন মার্কেটে যে বাড়িগুলো আছে রাত্তিরে সেখানে থাকবে। সুরেশ দত্ত ওখানকার অফিসার। তাকে বলবে রাহাসাহেব তোমাদের ওখানে থাকতে বলেছেন। ঠিক আছে?
‘হাঁ, চাচাজি। লেকিন—’
‘কী?’
‘কাল সুবেহ আমরা কী করব?’
এ দিকটা ভেবে দেখেন নি শেখরনাথ। তিনজন, বিশেষ করে লা-ডিন আর ধনপত পোর্টব্লেয়ারে থেকে গেলে জেফ্রি পয়েন্ট সেটলমেন্টের কাজকর্মে খুবই অসুবিধা হবে। সুভাষ মজুমদার ওখানকার জঙ্গলে ঘুরে আসার পর জারোয়ারা আপাতত চুপচাপ আছে ঠিকই, কিন্তু আবার যে খেপে গিয়ে উদ্বাস্তুদের ওপর হামলা চালাবে না, জোর দিয়ে তা বলা যায় না। জারোয়ারা ছাড়া উদ্বাস্তুদের মধ্যেও ঝগড়া ফ্যাসাদ লেগেই আছে। কালোনাইজেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট পরিতোষ বণিক ঠান্ডা, নিরীহ ধরনের মানুষ। একটু এদিকওদিক হলেই সে ভীষণ ঘাবড়ে যায়; একেবারে দিশাহারা হয়ে পড়ে। ছোটখাটো কোনও হুজ্জত হলে ঠিক আছে কিন্তু বড় রকমের কিছু ঘটলে তার পক্ষে সামাল দেওয়া মুশকিল। লা-ডিন আর ধনপতের কড়া ধাত, কড়া জবান, প্রচন্ড সাহস। পুরনো এই দুই ‘কালাপানি’র সাজা খাটতে আসা কয়েদি এই বয়সেও যথেষ্ট বেপরোয়া। যে কোনও কঠিন সমস্যা দেখা দিলে তারা রুখে দাঁড়াতে পারে। ওদের পোর্টব্লেয়ারে বসে থাকলে চলবে না। সারাক্ষণ জেফ্রি পয়েন্টে থাকাটা খুবই জরুরি।
শেখরনাথ বললেন, ‘কাল সকালে উঠেই তোমরা জিপ নিয়ে সেটলমেন্টে ফিরে যাবে। মনে হচ্ছে, আমার ফিরতে কয়েকদিন দেরি হবে। এখন যাও—’
‘জি। নমস্তে চাচাজি–’
হরগোবিন জিপে উঠে স্টার্ট দিল আর শেখরনাথ হাসপাতালের মেন বিল্ডিংয়ে ঢুকে দোতলায় যেখানে নবদ্বীপের বউছেলেকে নিয়ে বিনয় বসে আছে সোজা সেখানে চলে এলেন। কাছাকাছি একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে বসতে বসতে হঠাৎ তার কী’ খেয়াল হতে ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন।–’আরে, সেই সকাল থেকে যা কান্ড চলছে তাতে তোমাদের কারও পেটেই তো একফোঁটা জলও পড়ে নি। ওই যা, হরগোবিনকে ছেড়ে দিলাম। ডাক্তার চট্টরাজও নবদ্বীপকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে। তাকে বলে যে হাসপাতালের একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে এবারডিন মার্কেট থেকে খাবার টাবার নিয়ে আসব, তারও তো এখন উপায় নেই। কী যে করি–’
নবদ্বীপের বউছেলের কান্নাকাটি থেমে গিয়েছিল অনেক আগেই। তারা শুকনো, শীর্ণ মুখে অনন্ত দুশ্চিন্তা নিয়ে বসে আছে। নবদ্বীপের বউ ধরা ধরা গলায় বলল, ‘বড়কত্তা ক্ষুদা তিষ্টার (খিদে এবং তেষ্টার) কথা ভবি না। মানুষডার (বৃন্দাবনের) কী অয় (হয়) না জাইনা, মুখে কিছু তুলুম না। হ্যায় (সে) যদিন পিরথিমীতে আর না থাকে, জম্মের শোধ আমাগো (আমাদের) ক্ষুদা টুদা (খিদেটিদে) ঘুচল।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।