লা-ডিন বলল, ‘তোমাদের একটা ট্রাক দিতে হবে। আমরা ব্যাম্বু ফ্ল্যাট যাব–বহুৎ জরুরি—’
ভুরু কুঁচকে আজীব সিং বলল, ‘তুই বললেই ট্রাক মিলবে? যা, ভাগ—’
‘চাচাজি দিতে বলেছেন। জলদি—’
আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে চাচাজি কে, সবাই জানে। আজীব সিংয়ের মুখচোখের চেহারা লহমায় পালটে গেল।–’ঠিক হায়, ঠিক হায়—’
‘একঠো ডেরাইভার (ড্রাইভার) চাই—’
বনবিভাগের ছোট ব্যারাকটার দিকে মুখ ফিরিয়ে হাঁক দিল আজীব সিং।-–’এ ভারুয়া, জলদি নিকাল আ। আভি। ব্যাম্বু ফ্ল্যাট যানে পড়েগা, টেরাক (ট্রাক) লেকে—’
ভারুয়া নামের চালকটি আধময়লা বেঢপ পাজামা আর ঢলঢলে ডোরাকাটা জামা গায়ে চড়িয়ে বেরিয়ে এল; পায়ে রং-চটা চপ্পল। সিঁড়িঙ্গে, কাঠ কাঠ চেহারা, বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ। তিন চারটে ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল একধারে। তার একটার দিকে আঙুল বাড়িয়ে আজীব বলল, ‘ওটা নিয়ে যা—’
ভারুয়ার মুখ থেকে একটি শব্দও নির্গত হল না। নিঃশব্দে ট্রাকে উঠে স্টিয়ারিং ধরে বসে পড়ল। ওদিকে খোলা পাটাতনে লক্ষ্মণকে টেনে তোলা হল, তার দু’পাশে বসল লা-ডিন আর ধনপত।
লক্ষ্মণের বউ ছেলেরা উদ্ধশ্বাসে চিৎকার করতে করতে চলে এসেছে। অন্য দিক দিয়ে শেখরনাথদের জিপটাও এসে গেল। লক্ষ্মণের বউ আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েছিল আগেই। বলতে লাগল, ‘উনারি (ওকে) পুলিশি দিবা না, দিবা না—’
জিপের ভেতর নবদ্বীপের বউও সমানে কেঁদে চলেছে।–’আমার কী অইল রে? মানুষডারে যদিন বাঁচান না যায়, কী করুম আমি? কেডা আমারে দেখব (দেখবে)? ভগমান, আমরা যে এক্কেরে (একেবারে) ভাইসা যামু—’
দুই নারীর বিলাপ চলছে অবিরল। শেখরনাথ গলার স্বর উঁচুতে তুলে দুই গাড়ির ড্রাইভারকে বললেন, ‘গাড়ি চালিয়ে দাও—’
আগে আগে চলেছে জিপ, পেছনে লেজুড়ের মতো বনবিভাগের বিশাল ট্রাক।
কয়েক মিনিটের ভেতর পাহাড়ি রাস্তার একটা বাঁক ঘুরে দুটো গাড়ি অদৃশ্য হয়ে গেল। পেছনে লক্ষ্মণের বউয়ের বিলাপ ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে যায়।
দু’টো গাড়ি পর পর ছুটছে তো ছুটছেই। একধারে খাড়া পাহাড়, অন্য দিকে খাদ। খাদ এবং পাহাড়ে আদ্যিকালের প্রাচীন সব জঙ্গল। যেদিকে যতদূর নজর যায়, মানুষজন নেই। সমস্ত কিছু নিঝুম। সেই নৈঃশব্দ্যকে চিরে চিরে নবদ্বীপের বউয়ের একটানা কান্না চলছেই।
.
৪.২৩
ব্যাম্বু ফ্ল্যাটে পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে স্টিমলঞ্চ পাওয়া গেল। লক্ষ্মণকে নিয়ে নেমে পড়ল লা-ডিন আর ধনপত। কেননা অত বড় ট্রাক মাঝারি মাপের লঞ্চে তোলা যাবে না। তবে জিপের মতো ছোট গাড়ির পক্ষে অসুবিধা নেই। লঞ্চে এগুলো ওঠানোর ব্যবস্থা আছে।
জিপসুদ্ধ শেখরনাথরা লঞ্চে উঠে পড়লেন। লক্ষ্মণকে নিয়ে লা-ডিনরাও উঠল।
খানিক পরেই লঞ্চ ছেড়ে দিল। উপসাগরের এদিকটা ততটা চওড়া নয়। মিনিট পনেরোর ভেতর চ্যাথাম জেটিতে এসে স্টিমলঞ্চ ভিড়ল।
অন্য সব প্যাসেঞ্জারদের সঙ্গে শেখরনাথ বিনয়রাও নেমে পড়লেন। জিপ আছে, তাই অনেক দূরে সেলুলার জেলের কমপাউন্ড হাসপাতালে পৌঁছতে অসুবিধা হবে না। কিন্তু চ্যাথাম থেকে থানা কম দূরে নয়। লক্ষ্মণকে সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে কিভাবে?
লা-ডিন জিগ্যেস করল, ‘চাচাজি, আমরা তো মুসকিলে পড়ে গেলাম।‘
তার ইঙ্গিতটা ধরতে পেরেছিলেন শেখরনাথ। বললেন, ‘আমি বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি। হরগোবিনকে বলে দিচ্ছি সে আমাদের হাসপাতালে নামিয়ে দিয়ে চ্যাথামে ফিরে আসবে। তারপর তোমাদের থানায় নিয়ে যাবে। ততক্ষণ ওই বদমাশ খুনেটাকে নিয়ে তোমরা এখানে অপেক্ষা কর। হরগোবিন জিপ নিয়ে ফিরে এসে থানায় গিয়ে লক্ষ্মণের নামে কেস লিখিয়ে রাহাসাহেবের সঙ্গে দেখা করে লক্ষ্মণ আর নবদ্বীপের ব্যাপারটা জানাবে। বলবে আমরা নবদ্বীপকে নিয়ে হাসপাতালে গেছি।‘
‘ঠিক হ্যায় চাচাজি—’
.
জিপ চ্যাথাম জেটি থেকে বেরিয়ে মিনিট কুড়ির ভেতর সেলুলার জেলে পৌঁছে গেল। কয়েকদিন আগে এখানে মোহনবাঁশি কর্মকারকে নিয়ে আসা হয়েছিল। এবার নবদ্বীপকে।
শেখরনাথ জিপ থেকে নেমে বললেন, ‘বিনয়, তুমি ওদের নিয়ে ওয়েট কর। আমি ডাক্তার চট্টরাজকে গিয়ে বলি, নতুন একটা ক্রিটিকাল কেস নিয়ে এসেছি—’ তিনি চলে গেলেন।
দোতলায় ডাক্তার চট্টরাজকে তার চেম্বারে পাওয়া গেল। শেরখানকে দেখে ডাক্তার রীতিমতো অবাক।–’কাকা এখন আপনি হাসপাতালে জেফ্রি পয়েন্ট থেকে পোর্টব্লেয়ার কবে এসেছেন?’
শেখরনাথ বললেন, ‘আজই, এইমাত্র। সোজা তোমার কাছে চলে এলাম।‘
তাঁর উষ্কখুষ্ক চুল, চিন্তাগ্রস্ত মুখচোখের চেহারা দেখে ডাক্তার চট্টরাজ কিছু একটা আন্দাজ করে নিলেন।–’কী হয়েছে কাকা?’
‘একজন রিফিউজিকে নিয়ে এসেছি। হি ইজ ভেরি সিরিয়াসলি ইনজিওরড। প্রচুর রক্তপাত হয়েছে। সেন্সলেস। এক্ষুনি তাকে ভর্তি করে নেওয়া দরকার।‘
‘মোহনবাঁশি কর্মকারের মতো এটাও জারোয়াদের ব্যাপার?’
‘না না, অন্য কেস। অত কথা ডিটেলে বলার মতো সময় নেই। পরে শুনো। ইমিডিয়েটলি লোকটার ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হবে। নইলে বাঁচানো যাবে না।‘
শেখরনাথের কণ্ঠস্বরে এমন এক ব্যগ্রতা ছিল যাতে এ নিয়ে আর কোনও প্রশ্ন করলেন না ডাক্তার চট্টরাজ। শুধু জানতে চাইলেন, ‘লোকটা কোথায়?’
‘নিচে জিপের ভেতর শোওয়ানো আছে। স্ট্রেচার ছাড়া তাকে ওপরে আনা যাবে না।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।