লক্ষ্মণ, তার বউ এবং দুই ছেলে পাংশুমুখে দাঁড়িয়ে ছিল। ঢোক গিলে লক্ষ্মণ মিনমিনে গলায় বলল, ‘কাকা, আমারি (আমাকে) হে (সে) আগে মারিচে (মেরেছে)।’
তার কোনও কথাই শুনলেন না শেখরনাথ। সমস্ত ব্যাপারটা তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছে। মুহূর্তে রাগটা সামলে নিলেন। সবার আগে যেটা এখন প্রয়োজন তা হল নবদ্বীপকে বাঁচানোর চেষ্টা করা।
শোরগোল শুনে পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা দৌড়ে এসেছিল। অনেক দরবার করা সত্ত্বেও জেফ্রি পয়েন্টে ছোটখাটো হাসপাতাল বসানো তো দূরের কথা, এখন পর্যন্ত সামান্য একটা হেলথ সেন্টারের ব্যবস্থাও করা সম্ভব হয় নি।
শেখরনাথ বললেন, ‘যে জিপটা বিশ্য পাঠিয়েছে সেটায় নবদ্বীপকে তুলে এক্ষুনি আমি পোর্টব্লেয়ারের হাসপাতালে যাব। বিনয়, তুমিও চল—’
নবদ্বীপের বউ আর ছেলেও বলল, তারা নবদ্বীপকে কিছুতেই ছাড়বে না। তাদের নিয়ে যেতে হবে। এমন একটা জীবনমরণ সংকটের সময় প্রিয়জনরা কাছাকাছি থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক। ফুসফুসে জারোয়াদের তির বেঁধার পর মোহনবাঁশিকে একা পোর্টব্লেয়ারে নিয়ে যাওয়া যায়নি, তার বউ-ছেলেমেয়েরাও সঙ্গে গেছে। নবদ্বীপের বউছেলেই বা ছাড়বে কেন? শেখরনাথ বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমরাও যাবে।’ বলেই তার নজর এসে পড়ল লক্ষ্মণের ওপর। জেফ্রি পয়েন্টের আমিন লা ডিন আর চেনম্যান ধনপত, সিংকে বললেন, এই খুনিটাকে ছাড়া হবে না। দড়ি দিয়ে এটাকে বেঁধে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লরিতে তোল। ওকে পোর্টব্লেয়ারে নিয়ে আমি লক-আপে ঢোকাব।
লক্ষ্মণ হাতজোড় করে ত্রস্ত গলায় বলল, ‘বড় কত্তা, আমার ভুল হয়ি গ্যাছে। আমারে পুলিশি দিবেন না। দয়া করেন তার বউছেলেরা ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল। বউটা কাঁদতে কাঁদতে শেখরনাথের দুই পায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁকড়ে ধরে মাথা কুটতে লাগল।–’ছাড়ি দ্যান কত্তা, ছাড়ি দ্যান। আমাগের সব্বনাশ হয়ি যাবে।’
শেখরনাথ তার সিদ্ধান্তে অটল রইলেন। লক্ষ্মণের বউকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে প্রচন্ড জোরে ধমক দিলেন।–’নবদ্বীপকে যখন খুঁটির বাড়ি মেরেছিল তখন কী করছিলে তোমরা? তাকে ঠেকাতে পার নি? যদি নবদ্বীপের খারাপ কিছু হয়ে যায়, লক্ষ্মণকে আমি ফাঁসির দড়িতে চড়াবার ব্যবস্থা করব।‘
লক্ষ্মণের বউ জমিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগল। শেখরনাথের মুখ পাথরের মতো কঠিন। তার কোনও প্রতিক্রিয়াই নেই। এই প্রাচীন বিপ্লবীটিকে কিছুদিন ধরে দেখছে বিনয়। নিবিড়ভাবে তার সঙ্গে মেশারও সুযোগ হয়েছে। কারও ভুলচুক হলে কিংবা কারও ডিউটিতে গাফিলতি দেখলে একটু আধটু রাগারাগি যে শেখরনাথ করেন না তা নয়। কিন্তু এমন ভয়ঙ্কর চেহারায় তাকে আগে কখনও দেখে নি সে। লক্ষ্মণে অপরাধটা সত্যিই মারাত্মক।
লা-ডিন আর ধনপত দৌড়ে গিয়ে সেটলমেন্টের গুদাম থেকে শুধু মোটা দড়িই নয়, বুদ্ধি করে আয়োডিন, তুলো আর ব্যান্ডেজ নিয়ে এসেছিল। ক্ষিপ্র হাতে আয়োডিন লাগিয়ে শেখরনাথই ব্যান্ডেজ বেঁধে দিলেন। কিন্তু রক্ত কি থামতে চায়! চুঁইয়ে চুঁইয়ে ব্যান্ডেজ ভিজিয়ে বেরিয়ে আসছে।
বিশ্বজিৎ রাহা জেফ্রি পয়েন্টের জরুরি কাজের জন্য যে জিপ পাঠিয়েছেন সেটা এখানকার ব্যারাকগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। পুনর্বাসন দপ্তরের যে কর্মীরা লক্ষ্মণ আর নবদ্বীপের জমিতে জড়ো হয়েছিল, শেখরনাথ তাদের বলামাত্র কয়েকজন ধরাধরি করে নবদ্বীপকে জিপে নিয়ে তুলল। শেখরনাথ, বিনয় আর নবদ্বীপের বউ আর ছেলেও জিপে উঠে পড়ল। পেছন দিকে দু’পাশে টানা দুটো সিট। মাঝখানে মেঝেতে শোওয়ানো হল নবদ্বীপকে। তার বউ এবং ছেলেকে বসানো হল একধারের সিটে, অন্যটায় বসলেন শেখরনাথ। বিনয়কে বললেন, ‘তুমি ফ্রন্ট সিটে ড্রাইভারের পাশে ব’সো।‘
ইতস্তত করতে থাকে বিনয়।-–’না কাকা, আপনি সামনে বসুন। আমি—’
একটু কড়া গলায় শেখরনাথ বললেন, ‘যা বলছি তাই কর। আমার পেছনে বসা দরকার—’
কারণটা বুঝতে অসুবিধে হল না বিনয়ের। নবদ্বীপের বউর কান্নার বিরাম নেই; ডুকরে ডুকরে কেঁদেই চলেছে। ছেলেটাও কাঁদছে, তবে তত জোরে নয়। ওদের সামলানোর জন্যই শেখরনাথের পেছনে বসা।
ড্রাইভার হরগোবিন কাছাকাছি কোথাও ছিল। সে দৌড়ে এসে ড্রাইভারের সিটে স্টিয়ারিং ধরে বসল। শেখরনাথ তাকে বলল, ‘যত তাড়াতাড়ি পার পোর্টব্লেয়ার চল—’
ওদিকে লা-ডিন আর ধনপত লক্ষ্মণের দুটো হাত দু’দিক থেকে ধরেছে। লা-ডিন বলল, ‘চল–বলছি—’
‘আমারে নিয়ি যেতি পারবা না। আমি যাবা না’–লক্ষ্মণ শক্ত করে মাটিতে পা চেপে দাঁড়িয়ে থাকতে চেষ্টা করে।
তার বউও গলা ছেড়ে কাঁদতে কাঁদতে একটানা বলে যাচ্ছিল, ‘ওরে নিয়ি যাবা না দাদারা, থানায় নিয়ি যাবা না—’
কিন্তু কে কার কথা শোনে! পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বছরেও অসীম শক্তি ধনপতের। লক্ষ্মণ তার সঙ্গে পারবে কেন? হ্যাঁচকা টান মারতে মারতে তাকে পাহাড়ের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। ওখানেই ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের বড় বড় ট্রাকগুলো দাঁড়িয়ে থাকে।
জেফ্রি পয়েন্টে বনবিভাগের চার্জে আছে আজীব সিং। এখানকার জঙ্গলে ফেলিংয়ের তদারক করার দায়িত্ব তার। সেখানে পৌঁছে হাঁকডাক শুরু করে দেয়।–-‘এ আজীব সিং।‘ ওখানে ক’টা তাঁবু আর একটা ছোট ব্যারাক ধরনের বাড়ি আছে। ডাকাডাকিতে একটা তাঁবু থেকে লম্বা-চওড়া শিখ বেরিয়ে এল। পাগড়ি বাঁধা নেই, তাই ঘন,ঝাঁকড়া, কাঁচা-পাকা চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে আছে, দাড়িও বুক পর্যন্ত ঝুলছে। পরনে হাঁটুঝুল বেখাপ্পা ঢোলা দড়ি-বাঁধা ইজের। লোহার পাটার মতো চওড়া, রোমশ বুক তার। জিগ্যেস করল, ‘কী চাই রে?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।