.
৪.২২
সুভাষ মজুমদার ভরসা দিয়ে গিয়েছিলেন আপাতত কিছুদিন জারোয়াদের দিক থেকে জেফ্রি পয়েন্টে অশান্তির ভয় নেই। তবু তিনি পোর্টব্লেয়ারে চলে যাওয়ার পর থেকে রোজই ভোরে বিনয়কে সঙ্গে করে পেরিমিটার রোডের কাছে চলে আসেন শেখরনাথ। কারণ, আশ্বাস দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এটুকুও স্পষ্ট করে সুভাষ জানিয়ে দিয়েছিলেন, জনজাতির মানুষজনের মতিগতি সবসময় একরকম থাকে না। মেজাজ বিগড়ে গেলে কখন কী করে বসবে তার ঠিক নেই। জেফ্রি পয়েন্টের সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তাই শেখরনাথের প্রথম কাজটি হল পেরিমিটার রোডে এসে বুশ পুলিশের কাছে খোঁজখবর নেওয়া। তারপর ফিরে গিয়ে সমুদ্রে মুখটুখ ধুয়ে চা-রুটি টুটি খেয়ে ফের উদ্বাস্তুদের জমিতে জমিতে চক্কর দেওয়া। কারও কোনও অসুবিধা হচ্ছে কিনা জেনে নিয়ে তা দূর করা। শেখরনাথের একমাত্র ধ্যানজ্ঞান নির্বিঘ্নে সুষ্ঠুভাবে বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপের এক প্রান্তে পূর্ব পাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষগুলোর উপনিবেশ গড়ে উঠুক।
আজও পেরিমিটার রোডে এসে বুশ পুলিশের একটা টঙের তলায় দাঁড়িয়ে বন্দুকধারী সিপাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন শেখরনাথ।–-‘কী লায়েক আলি, কাল রাত্তিরে তুমি ডিউটিতে ছিলে?’
লায়েক আলি টঙের মাথা থেকে সসম্ভ্রমে বলল, ‘আমি নেমে এসে বলছি—’ ঘাড় তুলে কষ্ট করে শেখরনাথ কথা বলবেন, সেটা তার ভাল লাগছে না; অস্বস্তি হচ্ছে।
‘না না–’ শেখরনাথ ব্যস্তভাবে বললেন, ‘তোমাকে নামতে হবে না।‘
‘আপনার তখলিফ হবে চাচাজি—’
‘কিছু হবে না। তুমি ওখান থেকে বল–’
শেখরনাথের কথাগুলো খুব একটা মনঃপূত হল না লায়েক আলির। আন্দামানের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয়, বয়স্ক মানুষটি দেশের আজাদির জন্য এত নির্যাতন সয়েছেন, এই দ্বীপপুঞ্জের তাবত বাসিন্দাদের হিতার্থে যিনি জীবন সঁপে দিয়েছেন, তিনি পায়ের নিচে মাটিতে দাঁড়িয়ে কথা বলবেন সেটা প্রবল অস্বস্তির কারণ বই কি। কিন্তু চাচাজির নির্দেশ তো অমান্য করা যায় না। সে বলল, ‘হাঁ, তামাম রাত আমি ডিপটি (ডিউটি) দিয়েছি। আজ আট বাজে থিরুমল আয়েগা। তব তক আমি এখানেই থাকব। দিনভর থিরুমলের ডিপটি।
‘সারারাত তো পাহারা দিয়েছ। কোনও গণ্ডগোল নজরে পড়েছে?’
গণ্ডগোল বলতে শেখরনাথ কী বোঝাতে চাইছেন এক লহমায় ধরে ফেলল লায়েক আলি। আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলল, ‘নেহি চাচাজি, জারোয়ারা এদিকে আসে নি। ক’দিন ধরে তাদের দেখাও যাচ্ছে না। অব বহু দূরের জঙ্গলের ভেতর তারা কোথাও আছে।
শেখরনাথ স্বস্তি বোধ করলেন। –’ঠিক আছে, তবু খেয়াল রেখো।‘
লায়েক আলি কী জবাব দিতে যাচ্ছিল, হঠাৎ উদ্বাস্তুদের জমিগুলো থেকে প্রচণ্ড শোরগোল ভেসে এল। চমকে পেছন ফিরতেই শেখরনাথ আর বিনয়ের চোখে পড়ল, অনেকটা দূরে প্রায় শ’খানেক উদ্বাস্তু জড়ো হয়ে চিৎকার করে কী যেন বলছে! একসঙ্গে সবাই চেঁচাচ্ছে তাই তার একটা বর্ণও বোঝা যাচ্ছে না। তবে ওখানে মারাত্মক কিছু একটা যে ঘটেছে তা আন্দাজ করা যাচ্ছে।
উৎকণ্ঠিত শেখরনাথ নিজের মনেই যেন বললেন, ‘ওখানে আবার কী হল! –লায়েক, তুমি তোমার ডিউটি দাও, আমরা যাচ্ছি। চল বিনয়—’
লম্বা লম্বা পা ফেলে, প্রায় দৌড়েই লক্ষ্মণ আর নবদ্বীপের জমিতে চলে এলেন শেখরনাথরা। উদ্বাস্তুদের জটলাটা বৃত্তাকারে ঘিরে ধরে সমানে হইচই করে চলেছে। তাদের চোখেমুখে প্রবল উত্তেজনা, সেই সঙ্গে আতঙ্কও।
‘কী হয়েছে? সর সর—’
শেখরনাথের গলা শুনে উদ্বাস্তুরা সরে সরে পথ করে দিল। তাদের শোরগোলটা আরও তীব্র হয়ে উঠল।–’দ্যাহেন বড় কত্তা, নিজের চৌখেই দ্যাহেন—’
এবার চোখে পড়ল নবদ্বীপের রক্তাক্ত বেহুঁশ দেহটা মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে। তার মুখ রক্তে মাখামাখি শুধু তাই নয়, চারপাশে চাপ চাপ থকথকে রক্ত। বোঝা যায় তার কপালটা দুর্ফাক হয়ে গেছে।
নবদ্বীপের বউ স্বামীর দেহের পাশে আছাড়িপিছাড়ি খেতে খেতে পাগলের মতো আকুল হয়ে কেঁদে যাচ্ছিল। আমার কী সব্বনাশ অইল (হল) রে। আমার কপালে এইডা লিখা আছিল রে–তার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ছেলেটাও কেঁদে চলেছে। সম্পূর্ণ দিশাহারা।
বীভৎস দৃশ্য। রুদ্ধশ্বাসে শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, ‘নবদ্বীপের এই অবস্থা কী করে হল?’
মাটি থেকে সটান তিরের মতো উঠে দাঁড়াল নবদ্বীপের বউ। লক্ষ্মণের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, ‘উই ড্যাকরা শুওরের ছাও, রাইক্ষসটা (রাক্ষসটা) বাঁশের খুডা (খুঁটি) দিয়া পিডাইয়া (পিটিয়ে) হ্যাঁরে (তাকে, এখানে নবদ্বীপকে) মাইরা ফালাইছে বড়কত্তা—’
শেখরনাথ স্তম্ভিত। উদ্বাস্তুরা বহুদূরের এই আন্দামানে সেটলমেন্ট গড়তে এসে এমন রক্তারক্তি কাণ্ড বাধাতে পারে, স্বচক্ষে দেখেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। বিহ্বলের মতো জিগ্যেস করলেন, ‘মারল কেন?’
কান্নাজড়ানো, ভাঙা ভাঙা গলায় নবদ্বীপের বউ বাঁশের খুঁটি তাদের জমিতে ঢুকিয়ে দিয়ে লক্ষ্মণরা কিভাবে অনেকটা দখল করেছে, তাই নিয়ে বচসা হওয়ায় কিভাবে খুঁটির বাড়ি মেরে নবদ্বীপের মাথা দুফাঁক করে ফেলেছে তার বিবরণ দিতে দিতে ডুকরে ডুকরে কাঁদতে লাগল।
অসহ্য ক্রোধে মুখচোখ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল শেখরনাথের। চোয়াল শক্ত। লক্ষ্মণের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেন নবদ্বীপকে মারলে তুমি? এত বড় সাহস তোমার হয় কী করে?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।