‘আপহিকা মেহেরবানিসে সব কুছ ঠিক হ্যায়।’
এবার বিশ্বজিৎ কালীপদকে বললেন, ‘সুটকেস টুটকেস জিপে তুলে দিয়ে তুমি ফিরে যাও। স্টিমার ব্যাম্বুফ্ল্যাটে বেশিক্ষণ দাঁড়াবে না। আমি কাল, না হলে পরশু ফিরব।‘
জিপের পেছন দিকে লটবহর রেখে ব্যস্তভাবে জেটির দিকে চলে গেল।
ওদিকে নিরঞ্জনরা যে প্রক্রিয়ায় উদ্বাস্তুদের খিদিরপুর ডকে ‘মহারাজা’ জাহাজে কিংবা ‘রস’ আইল্যান্ডে, আর চ্যাথাম জেটিতে স্টিমারে তুলেছিল, ঠিক সেইভাবেই লরিতেও তুলে ফেলল। তারপর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলল, ‘রাহাদা, আমরা রেডি—’
নাসিম জানে, এখন কী করতে হবে। সে ব্যস্তভাবে ঘুরে গিয়ে জিপে উঠে পড়ল। ফ্রন্ট সিটে বিশ্বজিৎ বিনয়কে নিয়ে উঠে তার পাশে বসে পড়লেন।
বারোটি লরি এবং একটি জিপ, মোট তেরোটি গাড়ি দৌড় শুরু করল।
সুর্য এখন প্রায় মাথার ওপর উঠে এসেছে। রোদের তেজ অনেক বেড়ে গেছে। মাত্র কয়েক মিনিট উপসাগর আর মাউন্ট হ্যারিয়েটের চুড়োটা দেখা যাচ্ছিল। তারপর চোখের সামনে থেকে একেবারে উধাও।
উঁচু উঁচু পাহাড় আর ছোট বড় অগুনতি টিলার কোমরে পাক খেতে খেতে পথ কখনও ওপরে উঠে যাচ্ছে, কখনও নেমে আসছে নিচে। একবার খাড়াই, তারপরেই উৎরাই। এক পাশে পাথরের নিরেট দেওয়াল, অন্যদিকে খাদ। খাদ কোথাও গভীর, কোথাও ততটা নয়। দু’ধারেই নিবিড় জঙ্গল। ছোটখাট গাছ যে কত তার লেখাজোখা নেই। রয়েছে বিশাল বিশাল সব মহাবৃক্ষ, মোটা মোটা বেত আর বুনো লতা সেগুলো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে। রেখেছে। আর মাঝে মাঝেই অনেকটা করে জায়গা জুড়ে পঁচিশ-তিরিশ ফিট উঁচু বুনো ঘাসের বন। জঙ্গল কোথাও কোথাও এমন দুর্ভেদ্য যে এই দুপুরবেলাতেও সূর্যালোক ঢোকে না।
গাড়িগুলো চলছে খুব জোরেও নয়, আবার ধীর গতিতেও নয়। মাঝামাঝি স্পিডে। কেননা পাহাড়ি রাস্তা তেমন চওড়া নয়। বেশি স্পিড় তুললে বাঁকের মুখে স্কিড় করে খাদে গিয়ে পড়ার ভয়।
মাথার ওপর অনেকটা উঁচু দিয়ে অজস্র পাখি উড়ে যাচ্ছে। বক আর সি-গাল ছাড়া অন্যদের চিনতে পারল না বিনয়।
পনেরো কুড়ি মিনিট পর পর বসতি চোখে পড়ছে। খুব বড় নয়। তিরিশ-চল্লিশটা কাঠের বাড়ি, মাথায় আসবেস্টস টিনের ছাউনি। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে নয়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। বাড়িগুলো অনেককালের পুরনো। কিছু কিছু লোকজনও চোখে পড়ছিল। তাদের কারওকে দেখে উদ্বাস্তু মনে হয় না। সর্ব খোয়ানো শরণার্থীদের চেহারায় একটা মার্কামারা ছাপ থাকে।
হাজার বছরের প্রাচীন অরণ্যের খাঁজে খাঁজে লোকালয় দেখা যাবে, ভাবতে পারেনি বিনয়। অবাক হয়ে গিয়েছিল সে। জিগ্যেস করল, এগুলো তো রিফিউজি সেটলমেন্ট নয়। তিরিশ-চল্লিশ বছর আগের সব বাড়িঘরা এখানে কারা থাকে?
বিশ্বজিৎ বললেন, যেসব কয়েদি ব্রিটিশ আমলে আন্দামানে লাইফ-টাইম জেল খাটতে এসেছিল, এগুলো তাদের ভিলেজ।
বিনয় আর কোনও প্রশ্ন করল না।
.
দেখতে দেখতে সূর্যটা পশ্চিম আকাশের ঢালু গা বেয়ে নামতে নামতে উঁচু উঁচু পাহাড়ের আড়ালে উধাও হল। বেলা হেলে পড়েছে। তবু এখনও চারদিকে অঢেল রোদ।
একটা উতরাই বেয়ে গাড়িগুলো যেখানে নেমে এল সেখানে পাথুরে রাস্তা নেই। এবড়ো-খেবড়ো হলেও, মাইল দেড় দুই জুড়ে মোটামুটি সমতল জমি। সেটার তিন দিকে জঙ্গল, পাহাড়, অন্যদিকটায় সমুদ্র।
যতদূর চোখ যায় বিশাল বিশাল গাছের গুঁড়ি আর সেসবের মোটা মোটা ডালপালা তূপাকার হয়ে পড়ে আছে। এক লহমায় বোঝা যায়, বন কেটে অনেকটা জমি বার করা হয়েছে। তবে বড় বড় প্রাচীন সব গাছ কাটা হলেও অজস্র ছোট এবং মাঝারি গাছ, আর মাঝে মাঝে বুনো ঘাসের ঝোঁপঝাড়। এসব নির্মূল করতে না পারলে পুরো জমি পাওয়া যাবে না।
বেশ খানিকটা দূরে সমুদ্রের কাছাকাছি তক্তার বেড়া আর টিনের চালের অনেকগুলো লম্বা লম্বা ব্যারাকজাতীয় বাড়ি। বোঝাই যায় এগুলো নতুন তৈরি হয়েছে। সেখানে পনেরো বিশজন লোক দাঁড়িয়ে আছে।
তেরোটা গাড়ি সোজা ব্যারাকগুলোর সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘এই হল আমাদের নিউ সেটলমেন্টের জায়গা। এখানে উদ্বাস্তুদের জমি দেওয়া হবে। আসুন–’ বলে জিপ থেকে নেমে পড়লেন বিশ্বজিৎ।
ছিন্নমূল মানুষগুলোকে সমুদ্র আর জঙ্গলে ঘেরা বহু দূরের এই এলাকাটিতেই যে বসতি গড়ে তুলতে হবে, সেটা আন্দাজ করতে পেরেছিল বিনয়। সেও নেমে এল।
যে লোকগুলো সারি সারি ব্যারাকের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল তারা বিশ্বজিতের দিকে প্রায় দৌড়ে চলে এল। এদের মধ্যে নানা জাতের মানুষ রয়েছে। রয়েছে দু’তিনজন কর্মীও। তবে সবচেয়ে বেশি করে যে নজরে পড়ে তার বয়স পঞ্চাশের আশপাশে। নিরেট চেহারা, পাথরের পাটার মতো চওড়া বুক, কাঁধ অবধি এলো মেলো কাঁচা-পাকা রুক্ষ চুল, মুখে আট-দশ দিনের জমানো দাড়ি। ছড়ানো চোয়াল, পুরু ঠোঁট। পরনে দোমড়ানো মোচড়ানো খাকি প্যান্ট আর কালচে রঙের জামা, যেটার একটাও বোতাম নেই। দেখামাত্র টের পাওয়া যায়, লোকটার গায়ে দানবের শক্তি। তার ঠিক পাশেই রয়েছে তেইশ-চবিশ বছরের একটি বাঙালি যুবক। পাতলা, একহারা চেহারা, তরতরে মুখ। পরনে ঢোলা প্যান্ট আর শার্ট। বাকি সবাই তাদের পেছনে।
বাঙালি যুবকটি হাতজোড় করে বিশ্বজিৎকে বলল, নমস্কার স্যার। আমরা দুফার থিকা আপনেগো সেইগা পথের দিকে তাকাইয়া রইছি।’ কথা শুনেই টের পাওয়া যায় তার আদি বাড়ি পূর্ববাংলায়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।