‘খানকির ছাওয়াল, আমাগেরে (আমাকে) গালি দিতিছ। অনেক সহ্যি করিচি (সহ্য করেছি)। এবারি (এবার) তোর বুক ছিড়ি (ছিড়ে) রক্ত খাব নে—’ লক্ষ্মণ ভক্ত গলার শির ছিঁড়ে হুঙ্কার ছাড়ল।
‘আমি খানকির পুত! তুই, তর (তোর) হগ্গল (সকল) গুষ্টিরে খানকিতে জন্ম দিছে।’
দু’পক্ষে কুৎসিত গালাগালি, খিস্তিখেউড়ের আদান প্রদান চলতে লাগল। ওদিকে লক্ষ্মণের বউ ছেলেরা এবং নবদ্বীপের বউ, এমনকি তার ভীতু ছেলেটা নীরব দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকল না। তারাও রণাঙ্গনে নেমে পড়ল। দুই শত্রুপক্ষের তুমুল চিৎকার চেঁচামেচিতে জেফ্রি পয়েন্টের শান্ত সকালটা যেন খান খান হয়ে যেতে লাগল। কাছাকাছি গাছপালার ডালে যে অচেনা বুনো পাখিরা নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছিল, আচমকা ভয় পেয়ে ডানা ঝাঁপটাতে ঝাঁপটাতে দূরে, অনেক দূরে উধাও হয়ে যেতে লাগল।
নবদ্বীপের গলা ক্রমশ আরও, আরও চড়ছিল।–’খুডা (খুঁটি) উডাইয়া (উঠিয়ে) লইয়া যাবি কিনা সিধা কথাহান (কথাটা) জানতে চাই।‘
‘না। উটোবি (উঠাবো) না।‘ লক্ষ্মণ রুখে উঠল।
‘নাইলে কী করুম, দেখবি? আমরা ফরিদপুইরা (ফরিদপুরের) মানুষ। চেইতা (রেগে) গ্যালে পিরথিমি তুলফাড় (তোলপাড়) কইরা ফালাইতে (ফেলতে) পারি।’ যেন সে এতক্ষণ যথেষ্ট রেগে যায় নি, এমন একটা ভাব।
মুখটা তাচ্ছিল্যে বাঁকিয়ে চুরিয়ে শরীরের বিশেষ একটা প্রত্যঙ্গের দিকে আঙুল বাড়িয়ে কদর্য একটা ইঙ্গিত করল লক্ষ্মণ। বলল, ‘তুই আমার এগুলোন ছিড়বি। আর কিছু করতি পারবি না—’
‘পুঙ্গির ভাই–’ বলেই নিজের বউ এবং ছেলের দিকে তাকিয়ে নবদ্বীপ বলল, ‘খাড়াইয়া খাড়াইয়া (দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে) দেখস কীডা (কীটা)? খুডাগুলান তুইলা (খুঁটোগুলো তুলে) উই হালাগো (শালাদের) ওহানি (ওখানে) হান্দাইয়া দে—’
হুকুম পাওয়া মাত্র কাজে লেগে গেল নবদ্বীপের বউ এবং ছেলে। না, লক্ষ্মণদের বিশেষ অঙ্গটিতে খুঁটি প্রবেশ করিয়ে দেবার হঠকারিতা করল না তারা। হয়তো সাহসে কুলালো না। তবে বাঁশের টুকরোগুলো উপড়ে আগের জায়গায় পুঁততে গেল।
কিন্তু শুভকর্মে বাধা পড়ল। লক্ষ্মণও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার বান্দা নয়। সেও গলার স্বর সাত পর্দার ওপরে তুলল।–’খপরদার, হুইশার (হুঁশিয়ার) কইরে দিতিচি; কেউ খুডায় (খুঁটিতে) হাত দিবি না। দিলি জানে বাচতি (বাঁচতে) হবে না। আমরাও খুইলনে (খুলনা) জিলার লোক। রক্তগঙ্গা বইয়ি (বইয়ে) দেবা-হাঁ—’
‘আরে শয়তানের ছাও। আমাগো ফরিদপুইরাগো (আমাদের ফরিদপুরিয়াদের) রক্ত দেহাইস (দেখাস) না। তর (তোর) পুরা গুষ্টি আইজ নিপাত করুম—’
আশপাশের জমিতে অন্য উদ্বাস্তুরা দা-কুড়াল চালাচ্ছিল। তারা এতক্ষণ নিস্পৃহ মুখে নিজের কাজ করে যাচ্ছিল, এরকম ঝগড়া-ফ্যাসাদ জেফ্রি পয়েন্টে ডি পি ফ্যামিলির লোকজনদের মধ্যে প্রায়ই বাধে। কিছুক্ষণ চেঁচামেচি, উত্তেজনা, বাছা বাছা গালাগালির কিছু লেনদেন, তারপর সব মিটমাট হয়ে যায়। কিন্তু লক্ষ্মণ আর নবদ্বীপদের মধ্যে যা শুরু হয়েছে তাতে যে কোনও মুহূর্তে রক্তারক্তি কাণ্ড ঘটে যেতে পারে। তাই আর নিরাসক্ত থাকা গেল না। উত্তর, দক্ষিণ, পুব দিকের জমিগুলোতে যারা কাজ করছিল তারা হইচই করে উঠল।
‘এই, করতে আছ কীড়া (কীটা)?’
‘নিজেগো মইদ্যে (নিজেদের মধ্যে) মাইরদাঙ্গা ঠিক কাম (কাজ) না।’
‘চুপ যাও লক্ষ্মণ ভাই, চুপ যাও নবদ্বীপভাই। যা অইচে (হয়েছে), মিডাইয়া (মিটিয়ে) লও (নাও)। দ্যাশ ছাইড়্যা এত দূরে এই আন্ধারমান দ্বীপি আইয়া কাইজ্যা কুইজ্যা (ঝগড়াঝাটি) বাধাইয়া লাভহান (লাভটা) কী?’
চৈদ্দ পুরুষের দ্যাশ গ্যাছে, ভিটা গ্যাছে, মাটি গ্যাছে, আমরা রিফুজরা যদিন মিলমিশ কইরা (মিলেমিশে) না থাকি, এক্কেরে (একেবারে) শ্যাষ অইয়া যামু।‘
কিন্তু কে কার কথা শোনে! সৎ পরামর্শ কানে ভোলার মতো অবস্থায় লক্ষ্মণরা আর নবদ্বীপরা কেউ নেই।
অসহ্য ক্রোধে এবং উত্তেজনায় দাঁতে দাঁত ঘষতে ঘষতে চিকুর ছাড়ল লক্ষ্মণ।–-’আমাগেরে নিপাত করবি? দেকি, মায়ের দুদ (দুধ) কয় স্যার (সের) খাইচ! খানকির ছাওয়াল না হলি আগুয়ে (এগিয়ে) আয়; তোর পোঙায় কত রস হছে, দেকুয়ে (দেখিয়ে) দি। আয়–আয়—’
নবদ্বীপের শরীরে ফরিদপুরি রক্ত আরও তপ্ত হয়ে ওঠে। সে একেবারে উন্মাদ হয়ে যাঁড়ের মতো গর্জন ছেড়ে লক্ষ্মণের দিকে ধেয়ে যায়। এর পরিণাম কী হতে পারে তার খেয়াল থাকে না।
খুলনা জেলার রক্তের তেজ এতটুকু কম নয়। লক্ষ্মণ চকিতে একটা বাঁশের খুঁটি তুলে নিয়ে আক্রমণ হানার জন্য তৈরি হয়ে নিয়েছে। নবদ্বীপ নাগালের মধ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গে সে খুঁটিটা তার মাথায় শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে বসিয়ে দেয়। কপালের দিকটা চড়াৎ করে দু-ফালা হয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসে। ‘আঁক’ করে একটি মাত্র শব্দ বেরোয় নবদ্বীপের গলা থেকে। পরক্ষণে কাটা কলাগাছের মতো মাটিতে আছড়ে পড়ে সে। রক্তে ভেসে যেতে থাকে চারিদিক।
নবদ্বীপের বউ আর ছেলে চিৎকার করে ওঠে।–-’মাইরা ফালাইল রে, মাইরা ফালাইল (ফেলল) মানুষডারে।’
কাছে দূরে, চারপাশের জমি থেকে তুমুল শোরগোল উঠতে লাগল। দা-কুড়াল ফেলে উদ্বাস্তুরা লক্ষ্মণ আর নবদ্বীপের জমির দিকে দৌড়ে আসতে থাকে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।