লক্ষ্মণ ভক্ত লোকটা মহা ধুরন্ধর, কুচুটে এবং রগচটা। লম্বা-চওড়া। আখাম্বা চেহারা। গায়ের রং পোড়ো-তামাটে। গাঁট-পাকানো আঙুল। চৌকো ধরনের মুখ, থ্যাবড়া থুতনি। ছড়ানো চোয়াল। চুলে পাক ধরতে শুরু করেছে। চোখে ধূর্ত চাউনি।
লক্ষ্মণের বউয়ের আঁটোসাটো, মজবুত গড়ন। ছিরিছাঁদহীন মুখচোখ। তার দিকে তাকালে লহমায় টের পাওয়া যায় ছুতোনাতায় ছোবল মারার জন্য সে ফণা তুলে দাঁড়াতে পারে। স্বামী-স্ত্রী একেবারে রাজযোটক। ওদের দুই ছেলে। একজনের বয়স উনিশ, আরেক জনের সতেরো। দু’টোই মা-বাপের ধাত পেয়েছে। ওদের আদি বাড়ি ছিল খুলনায়।
নবদ্বীপ কুণ্ডুর বয়স পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন। মাঝারি উচ্চতার নিরেট চেহারা। রং কালো। মাথার চুল আধাআধি পাকা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়িগোঁফ। মানুষটা এমনিতে শান্তশিষ্ট, তবে স্বার্থে ঘা পড়লে ছেড়ে দেবার পাত্র নয়; রুখে দাঁড়ায়। রাগ চড়লে তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তার স্ত্রী বেশ লম্বা; মাথায় নবদ্বীপের সমান সমান। বেশ ফর্সা। পঞ্চাশের মতো বয়স হলেও পাতলা, ছিপছিপে গড়ন। চুলে তেমন পাক ধরেনি। এমনিতে চুপচাপ, সোজাসাপটা মনে হয়। কিন্তু খেপে গেলে সে রণরঙ্গিণী হয়ে উঠতে পারে। ওদের একমাত্র ছেলে। তার বয়স আঠারো-উনিশ। মা-বাপের বেশি বয়সের সন্তান। সে খুব নিরীহ, ভিতু ধরনের। নবদ্বীপদের দেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তানে। গ্রাম গাবতলি, জিলা : ফরিদপুর।
আজ দা-কোদাল টোদাল নিয়ে জমিতে আসতে একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল নবদ্বীপদের। মাঠে নেমে ঝোঁপঝাড় সাফাই করবে কী, চক্ষু চড়কগাছ। নজরে পড়ল তাদের জমির পুব দিকের সীমানা বরাবর যে বাঁশের খুঁটিগুলো পনেরো হাত পর পর পুঁতে দিয়েছিল পুনর্বাসনের কর্মীরা, সেগুলো আর সেই জায়গায় নেই। প্রায় দশ হাতের মতো তাদের জমির ভেতর ঢুকে এসেছে অর্থাৎ পুব দিকে যতদূর অবধি নবদ্বীপদের জমি মেপে দেওয়া হয়েছিল তার দশ হাতের মতো এলাকা বেদখল হয়ে গেছে। আল না থাকায় এই হল বিপদ। এত বিরাট একটা অংশ হাত ছাড়া হয়ে যাবে, প্রাণ থাকতে কেউ কি তা মেনে নিতে পারে? আজ খুঁটি দশ হাত ঢুকেছে, কাল কি পরশু যে আরও পনেরো বিশ হাত ভেতরে ঢোকানো হবে না, জোর দিয়ে তা কি বলা যায়? শুরুতেই খোয়ানো জমি উদ্ধার করা দরকার।
কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে নবদ্বীপ লক্ষ করল। জমির সীমানায় পুনর্বাসনের লোকেরা বাঁশের যে খুঁটিগুলো পুঁতে দিয়ে গিয়েছিল সেই গর্তগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। নতুন গর্ত খুঁড়ে দশ হাত এলাকা দখল করে যে জমি দখল করা হয়েছে, সেটা দুধের শিশুও এক পলক দেখেই টের পাবে।
পাশের জমির লক্ষ্মণরাই যে তার জমি থেকে চাতুরি করে এতটা অংশ দখল করেছে সেটা নবদ্বীপদের কাছে জলের মতো পরিষ্কার।
লক্ষ্মণরা আজ অনেক আগেই এসে তাদের জমির বনতুলসীর ঝোঁপঝাড় কাটতে শুরু করেছিল। নবদ্বীপরা যে এসে গেছে সেদিকে তাদের ভ্রূক্ষেপ নেই। আপন মনে খুব মগ্ন হয়ে তারা দা চালিয়ে যাচ্ছে।
নবদ্বীপ ডাকল, ‘লক্ষ্মণ, এই লক্ষ্মণ হুইনা (শুনে) যাও দেহি (দেখি)।’
যেন শুনতে পায় নি, এমন একটা ভান করে বনতুলসীর ঝোপে দা চালিয়েই যাচ্ছে লক্ষ্মণ। বেশ কয়েকবার ডাকাডাকির পর লক্ষ্মণ মুখ তুলে নবদ্বীপদের দিকে তাকাল।–’কী কতিছ (বলছ)?
‘এইহানে (এখানে) আহো (এসো)—’
‘ওখানি যেতি হবে ক্যানো? যা কওয়ার ক’তি (বলার বলতে) পার।‘
‘এই কুকম্ম (দুষ্কর্মটা) করল কেডা?’
‘কুন কুকন্মের কতা কতিছ (কথা বলছ)?’
‘আমার জমিনে কেডা খুডা হান্দাইছে (খুঁটি ঢুকিয়ে দিয়েছে)?’
চোখ পিট পিট করে লক্ষ্মণ নিপাট ভালমানুষের মতো মুখ করে বলল, ‘এই কতা (কথা) আমারে জিগুতিছ (জিগ্যেস করছ) ক্যানো?
নবদ্বীপ চিড়বিড় করে উঠল।-–’তুমি য্যান (যেন) ভাজা মাছহান (মাছখানা) উল্ডাইয়া খাইতে জান না!’
ইতিমধ্যে লক্ষ্মণের বউ এবং দুই ছেলে এগিয়ে এসেছে। লক্ষ্মণ কিন্তু চটাচটি করল না। বলল, ‘কী বড়র বড়র (বক বক) করতিছ! তুমার জমিনে কেডা খুডা হান্দাই দেবে (ঢুকিয়ে দেবে), তার হিসাব আমার রাকতি (রাখতে) হব?
নবদ্বীপের বউ আর ছেলে পাশেই দাঁড়িয়ে আছে। জনবল লক্ষ্মণের চেয়ে কিছু কম হলেও খুব কম নয়। একটা ছেলে লক্ষ্মণের বেশি। তা হোক, হক সম্পত্তির একটা বড় অংশ কৌশলে লক্ষ্মণরা হাতিয়ে নেবে, অত সহজ নয়।
নবদ্বীপের মাথায় রক্ত চড়ে গিয়েছিল। কপালের দু’পাশের রগগুলো সমানে দপ দপ করছে। রাগে চোখদুটো লাল টকটকে। সে চিৎকার করে উঠল, ‘হ। রাকতে অইব (রাখতে হবে)।
‘ক্যানে রাকতি হব?’ মেজাজ এখন পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণে রেখেছে লক্ষ্মণ।–’তুমার জমিন নিয়ি (নিয়ে) আমার মাথা ব্যথাডা কিসির? (মাথা ব্যাথা কিসের?)’
ঠাণ্ডা গলায় এমনভাবে কথা বলল নোকটা যে মাথার ভেতরটা গনগনে ক্রোধে টগবগ করে ফুটতে লাগল নবদ্বীপের। গলার স্বর আরেক পর্দা চড়াল সে৷–’আমি হুজুত করতি চাই না, ভালা চাস তো যেখানকার খুডা (খুঁটি) হেইহানে লইয়া কুইপা (পুঁতে) রাখ—’
এবারও চটল না লক্ষ্মণ।–’কী কতিছ (বলছ)! সরকারি আমিন জমিন মাপি (মেপে) খুডা যেয়ানে যেয়ানে (যেখানে যেখানে) পুঁতি দেছে, ওয়ানেই (সেখানেই) তো আছে।‘
‘হেইহানে (সেখানে) আছে! কুত্তার ছাও, আইজ বিহানে আমাগো জমিনে আইতে দেরি অইচে, আর তরা (তোরা) গুষ্টিসুদ্ধা আগে আগে আইয়া খুডাগুলান আমার জমিনে হান্দাইয়া (ঢুকিয়ে) দিছস। হালা, হুমুন্দির পুত, আমার জমিন শয়তানি কইরা লবি (নিবি), আর আমি চৌখ বুইজা থাকুম? অহনই (এখনই) খুডি উঠা।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।