হরগোবিন সুভাষ মজুমদারকে ব্যাম্বু ফ্ল্যাটের জটিতে পৌঁছে দিয়ে ফিরে এসেছে। সুভাষ ওখান থেকে পোর্টব্লেয়ারের লঞ্চে উঠবেন।
এই আশ্চর্য নৃতাত্ত্বিকটির কথা যখনই বিনয় ভাবে তার মন অসীম শ্রদ্ধায় ভরে যায়। দুর্জয় সাহস তো আছেই, তার চেয়ে অনেক বেশি তার মধ্যে যা রয়েছে তা হল মানুষের প্রতি অফুরান ভালবাসা। নইলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত জেনেও কেউ কি ভয়াবহ জারোয়াদের এলাকায় ঢুকে পড়তে পারে!
জীবনে চারজন মানুষকে দেখল যাঁদের স্মৃতি আমৃত্যু, শেষ নিঃশ্বাসটি ফেলা পর্যন্ত সে ভুলবে না। তাদের একজন হলেন রাজদিয়ার ফাদার লারমোর, চারিদিকের গ্রামের মানুষজন যাঁকে লালমোহনবাবা কি লালমোহন সাহেব বলে ডাকত। ছেচল্লিশের রাজদিয়া অঞ্চলের দাঙ্গা থামাতে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। হাজার হাজার মাইল দূরের ইউরোপ থেকে ঢাকা জেলার রাজদিয়ায় এসে এই দেশ এবং দেশের মানুষকে তিনি আপন করে নিয়েছিলেন। অখণ্ড বাংলা ছিল তাঁর দ্বিতীয় স্বদেশ।
দ্বিতীয় মানুষটি হলেন মামুদপুরের আফজল হোসেন। জীবনের অনন্ত ঝুঁকি নিয়ে তিনি তাকে এবং ঝিনুককে একটা নৌকোয় পদ্মা পার করে তারপাশা স্টিমারঘাটায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। জলেস্থলে তখন ঘাতকবাহিনী কাফেরদের নিকাশ করতে রামদা, বর্শা, ট্যাটা নিয়ে দিবারাত্রি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের নজর এড়িয়ে সুকৌশলে তিনি বিনয়দের রক্ষা করেছিলেন। আবহাওয়া যখন চরম বিদ্বেষ, ঘৃণা আর বিষবাষ্পে ভরে রয়েছে, সেই সময় দুটি হিন্দু যুবক যুবতাঁকে বাঁচানো প্রায় অকল্পনীয় ছিল, কিন্তু আফজল হোসেন সেই অসাধ্য সাধনটাই করেছেন। তৃতীয় জন হচ্ছেন এই সুভাষ মজুমদার। আর চতুর্থ জন হলেন শেখরনাথ। দেশের জন্য একসময় নিজের জীবনকে সঁপে দিয়েছিলেন। সেলুলার জেল থেকে বেরিয়ে নিজের স্বার্থের, সুখস্বাচ্ছন্দ্যের, আরাম বিলাসের চিন্তাকে কখনও ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দেন নি। স্বাধীনতার পর থেকে হাজার হাজার যেসব উদ্বাস্তু আন্দামানে আসতে শুরু করেছে তাদের পুনর্বাসন না হওয়া অবধি তার নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। শুধু কি উদ্বাস্তুরা, পেনাল কলোনির পুরনো কয়েদিরা, এমনকি আন্দামানের আদিম জনজাতিগুলোর জন্যও তার বুকের ভেতর যে কী অপার মায়া।
এই চারজনের চিন্তা চারিদিক থেকে বিনয়ের মাথায় ঢুকে যাচ্ছিল।
হঠাৎ আফজল হোসেনের কথা মনে পড়তে তীব্র অপরাধবোধে ভেতরে ভেতরে কুঁকড়ে গেল। বিনয়। তারপাশা স্টিমারঘাটায় গোয়ালন্দের স্টিমারে তাকে আর ঝিনুককে তুলে দিয়ে বার বার আফজল। বলেছিলেন, কলকাতায় পৌঁছেই যেন তাকে অবশ্যই চিঠি লেখে বিনয়। তাদের নিরাপদে পৌঁছবার খবরটা না পেলে তিনি ভীষণ দুশ্চিন্তায় থাকবেন। কেননা তারপাশায় গেলেই সব আতঙ্কের অবসান ঘটবে, এমনটা ভাবার কারণ নেই। স্টিমার তো গোয়ালন্দে নামিয়ে দেবে। সেখান থেকে ইন্ডিয়ার বর্ডার তো অনেকটা পথ। জল্লাদবাহিনী সেখানেও আছে।
সুভাষ মজুমদারের কথা ভাবতে গিয়ে একে একে আরও তিনজনের কথা মনে পড়েছে বিনয়ের। ফাঁদর লারমোর, তার স্মৃতির বৃত্তে সবসময়ই আছেন। সুভাষ মজুমদারকে আন্দামানে এসে দেখল সে। শেখরনাথ তো জেফ্রি পয়েন্টে সারাক্ষণ তার সঙ্গেই আছেন। কিন্তু কলকাতায় আসার পর তার আর ঝিনুকের রক্ষাকর্তা আফজল হোসেনকে সে ভুলে গেল কী করে? হয়তো বলা যায়, কলকাতায় আসার পর তার জীবনটা একেবারে উথালপাতাল হয়ে গেছে। ঝিনুককে নিয়ে তখন তার তুমুর অস্থিরতা। এতটাই দিশেহারা আর উভ্রান্ত যে কোনও দিকে তাকাবার মতো সময়টুকুও ছিল না। আফজল হোসেনকে বেমালুম ভুলে যাওয়ার, তাকে চিঠি না লেখার এটা কি একটা অজুহাত হল? নিজেকে হাজার বার ধিক্কার দিল বিনয়। সে অকৃতজ্ঞ, সে অমানুষ। কিন্তু যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, আফজল হোসেনের কাছে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে একটা চিঠি লিখবে। ঠিকানা তার জানাই আছে।
বেশ কয়েকদিন আগে মায়া আর বৃন্দাবনের সঙ্গে মাখন পালদের যে তুমুল ঝগড়াঝাঁটি হয়েছিল, শেখরনাথের শাসানিতে তা মিটমাট হয়ে গেছে। সেই থেকে জেফ্রি পয়েন্ট শান্তিতেই দিন কাটিয়ে চলেছে। সম্পূর্ণ নির্বিঘ্নে। আর কোনও উৎপাতের সৃষ্টি হয় নি।
কিন্তু আজ সকালে ফের তুমুল উত্তেজনা দক্ষিণ আন্দামানের এক প্রান্তে উদ্বাস্তুদের এই সৃষ্টিছাড়া উপনিবেশে ছড়িয়ে পড়ল। ঘটনাটা এইরকম।
পশ্চিম দিকের পাহাড় ঘেঁষে লক্ষ্মণ ভক্ত আর নবদ্বীপ কুণ্ডুদের জমি। জমি দু’টো পরস্পরের লাগোয়া। আজ সকালে চা রুটি-টুটি খেয়ে দু’জনেই দা কোদাল-টোদাল নিয়ে জমির আগাছা সাফ করতে এসেছিল। দু’জনের সঙ্গে তাদের বউছেলেমেয়েরা যথারীতি এসেছে। কারও একার পক্ষে পাঁচ একর অর্থাৎ পনেরো বিঘে জমির ঝোঁপঝাড় সাফ করে দু-এক মাসের ভেতর সেটাকে চাষযোগ্য করে তোলা অসম্ভব। তাই প্রতিটি ডিপি ফ্যামিলির সবাইকেই মাঠে উদয়াস্ত খাটতে হয়। জমি সাফাইয়ের পর তার একধারে নিজেদেরই ঘরবাড়ি বানাতে হবে। তারপর চাষবাস। পরিবারের সবাইকে তাই হাত না লাগালেই নয়।
উদ্বাস্তুদের যে জমি ভাগ করে দেওয়া হয়েছে, বাঁশের খুঁটি পুঁতে পুঁতে তার সীমানা ঠিক করে দিয়েছে পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা। এই সীমানা নিয়ে এতদিন কোনও অশান্তি হয়নি। আজ হল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।