বুকের ভেতর থেকে উথলে-আসা আবেগে ঠোঁট দুটো থরথর কাঁপছে শেখরনাথের। কণ্ঠমণিটা ওঠানামা করছে অবিরল। দৌড়ে গিয়ে সুভাষ মজুমদারকে বুকের ভেতর জড়িয়ে ধরলেন তিনি। কথা বলার চেষ্টা করছিলেন কিন্তু গলায় স্বর ফুটছিল না।
কিছু জিগ্যেস না করলে শেখরনাথের সামনে পারতপক্ষে মুখ খোলে না উদ্বাস্তুরা। কিন্তু এই মুহূর্তে তাদের কৌতূহল ঠিকরে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে লাগল।
‘কত্তা, চৌপর (চারপ্রহর) দিন আপনের লেইগা আমরা রিফুজরা বেবাকটি (সবাই) চিন্তায় চিন্তায় উয়াস (শ্বাস) বন্ধ কইরা কাটাইছি। কী অইল (হল) আপনের?’
‘আমাগো লেইগা মানুষডার পরানডা কি শ্যাষ অইয়া (হয়ে) গ্যালো? জারোরা (জারোয়ারা) কি তির মাইরা আপনেরে শ্যাষ কইরা ফালাইল—’
‘মা দুর্গা, মা কালী মুখ তুইলা চাইছে—’
‘ভগমান ভালা মাইনষেরে (মানুষকে) চেরডা (চির) কাল রক্ষা করে।‘
‘কী অইল (হল) জঙ্গলে? জারোগগা লগে কি দেখা অইচে (হয়েছে)? কী কয় হ্যারা (তারা)?’
আবেগটাকে প্রাণপণে ঠেলে সরিয়ে কণ্ঠস্বরকে এতক্ষণে বের করে আনতে পারলেন শেখরনাথ। উদ্বাস্তুদের বললেন, ‘সুভাষকে এখন কেউ কিছু জিগ্যেস করো না। দেখছ না, শরীরের কী হাল হয়েছে। পরে সব জানতে পারবে। ওর এখন বিশ্রামের দরকার।‘
এরপর সবাই চুপ। আর কোনও প্রশ্ন করতে কারও সাহস হল না।
সুভাষ মজুমদার ধুঁকছিলেন। শেখরনাথ তাঁর কাধটা পরম মমতায় বেড় দিয়ে ধরে বললেন, ‘আর দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। আস্তে আস্তে চল।‘ পরিতোষ বণিককে বললেন, ‘সুভাষের পক্ষে সমুদ্রে যাওয়া সম্ভব হবে না। গরম জল করে আমাদের ঘরের সামনে দিয়ে যেও। ওখানেই স্নান করে নেবে। তারপর বড় এক গেলাস গরম দুধ আর কয়েকটা ভাল বিস্কুট কারওকে দিয়ে পাঠাও।‘
পরিতোষ বলল, ‘আমি নিজেই লইয়া যামু—’
‘রাতের খাওয়ার ব্যবস্থাটা আজ একটু তাড়াতাড়িই করো। সারাদিন ছেলেটা জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরেছে কিছুই খাওয়া হয়নি।
.
ঘরে নিয়ে যাবার পর অনেকক্ষণ জিরিয়ে নিলেন সুভাষ মজুমদার। এর মধ্যে গরম জল এসে গিয়েছিল। ভাল করে স্নান করে নিলেন তিনি। জলে আশ্চর্য এক জাদু আছে যা শরীরকে সুস্থ করে তোলে।
পোশাক-টোশাক পালটে সুভাষ যখন বিছানায় গিয়ে বসলেন, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দুধ-বিস্কুট এসে গেল। তার খাওয়া দেখে বোঝা গেল, সমস্ত দিন তার পেটে কিছুই পড়ে নি।
গভীর আগ্রহে শেখরনাথ সুভাষের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। জিগ্যেস করলেন, এখন কি একটু ভাল লাগছে?
‘খুব ভাল কাকা—’ সুভাষের চোখমুখের চেহারা দেখেই বোঝা যায় ধকলটা কাটিয়ে উঠেছেন। বেশ চনমনে মনে হচ্ছে তাকে।
একটু চুপচাপ।
তারপর শেখরনাথ বললেন, ‘জারোয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেল?’
‘হ্যাঁ, অনেক কষ্টে। সুভাষ মজুমদার বলতে লাগলেন, ‘আমাকে তো ওরা চেনে না। নেহাত ওদের ভাষাটা জানতাম তাই প্রাণে বেঁচে গেছি। আপনি তো জানেন, সো-কলড সিভিলাইজ ওয়ার্ল্ডের কারওকে ওরা বিশ্বাস করে না। ভীষ্মের মতো শরশয্যাই আমাকে নিতে হত। যাই হোক, রিফিউজি সেটলমেন্টের জন্যে যে জঙ্গল কাটা হচ্ছে সেজন্যে ওরা ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত। ওরা চায় গাছ কাটা বন্ধ করে এখান থেকে বাইরের লোকজন সবাই চলে যাক। একজনও যেন এখানে না থাকে।‘
‘আমারও তাই মনে হয়েছিল। বিশুদেরও সেই কথা বলেছিলাম। নিজে চিফ কমিশনারের সঙ্গে দেখা করেছিলাম, আর যেন জঙ্গল ফেলিং না করা হয়। ওরা বলল, ফরেস্ট না কাটলে উদ্বাস্তু সেটলমেন্টের জন্যে জমি কোথায় মিলবে? ঠিকই বলছে। এটা একটা বড় সমস্যা।‘
‘হুঁ। আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন সুভাষ মজুমদার। এটা সত্যিই বড় সমস্যা। আমি জারোয়াদের বুঝিয়েছি তাদের কোনও ভয় নেই। যাদের জন্যে জঙ্গল কাটা হচ্ছে তারা তোমাদের ক্ষতি করবে না। তাদের ওপর তোমরা হামলা চালিও না। কতদূর কী বুঝেছে, জানি না। তবে মনে হল, আপাতত জেফ্রি পয়েন্টে চড়াও হবে না। কিন্তু কাকা—’
‘কী?’
‘ট্রাইবাল পিপলদের মতিগতি বোঝা ভার। কখন যে ওরা কী করে বসবে, আগে থেকে আঁচ করা মুশকিল। তাই সব সময় এখানকার মানুষজন যারা মেনল্যান্ড থেকে এসেছে তাদের সতর্ক থাকতে হবে।‘
চিন্তাগ্রস্তের মতো শেখরনাথ বললেন, ‘খুব মুশকিল হল। সমস্যাটার পুরোপুরি সুরাহা হল না।‘
‘আমি একটা কথা ভাবছি।‘
‘বল—’
‘কয়েকটা দিন আমি এখানে থেকে যাব। যদি তার মধ্যে ওরা সেটলমেন্টে ফের হানা না দেয় বুঝব আর গোলমাল বাধাবে না। যদি তেমনটা হয়, আবার আমাকে জঙ্গলে ঢুকতে হবে।‘
শেখরনাথের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। –’তুমি জেফ্রি পয়েন্টের একটা বড় বলভরসা। যতদিন ইচ্ছে এখানে থেকে যাও। উদ্বাস্তুদের সাহস তাতে বাড়বে।‘
.
৪.২১
দিন চারেক জেফ্রি পয়েন্টে কাটিয়ে পোর্টব্লেয়ারে ফিরে গেছেন সুভাষ মজুমদার। যে জিপটি এই সেটলমেন্টের জন্য বিশ্বজিৎ রাহা স্থায়ীভাবে পাঠিয়েছেন সেটার চালক হল হরগোবিন। মাঝবয়সি এই লোকটির আদি বাড়ি ছিল বিহারের ছাপরা জেলায়। একসময় কালাপানির সাজা নিয়ে আন্দামানে এসেছিল। দু’বছর শান্তশিষ্ট হয়ে থাকার পর ম্যারেজ সার্টিফিকেট পেয়ে একটি তামিল কয়েদি মেয়েকে বিয়ে করে শাদিপুরে গিয়ে সংসার পাতে। তারপর থেকে তার গৃহপালিত সুখের জীবন। ব্রিটিশ আমলে ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি পেয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট তাকে সেই একই নৌকরিতে বহাল রেখেছে। সে এখন পুনর্বাসন দপ্তরের অধীনে। লোকটি খুবই বিনয়ী, ভদ্র। কল্পনাই করা যায় না, একদিন ঠাণ্ডা মাথায় দু’দুটো খুনের মতো মারাত্মক অপরাধ করেছে। দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে আট ন’শো মাইল দূরের এই বিচ্ছিন্ন দ্বীপপুঞ্জে স্ত্রী এবং বাসস্থান আর ঘর-সংসার তার জীবনটাই আমূল পালটে দিয়েছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।