উন্মুখ হয়ে ছিল বিনয়। প্রশ্ন না করে সে তাকিয়ে থাকে।
‘চল, পেরিমিটার রোড পর্যন্ত যাই।’ বলে পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে পড়লেন শেখরনাথ। বিনয়ও তার সঙ্গে সঙ্গে চলল। বিপ্লবীদের সম্পর্কে সে শুনেছে তাদের মন লৌহকঠিন। মৃত্যু তাঁদের কাছে অতি তুচ্ছ একটি ঘটনা। কোন একটা বইয়ে সে পড়েছিল একজন বিপ্লবী হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে উঠেছিলেন। বিচারক ফাঁসির রায় ঘোষণা করার পর তার শরীরের ওজন বেড়ে গিয়েছিল। দেশের মুক্তির জন্য মৃত্যুবরণ যেন বড়ই আনন্দের ব্যাপার, নইলে ওজন বাড়তে পারে? মারাত্মক অপরাধের আসামীরা ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হবে, আদালতে তা জানার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ে, আতঙ্কে খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দেয়, রাতে ঘুমোয় না। নির্জন সেলে বসে বসে করুণ কাতর গলায় অবিরাম কেঁদে যায়। কিন্তু বিপ্লবীরা অন্য ধাতুতে গড়া। তাঁদের মধ্যে এত অনন্ত শক্তি কোথায় যে সঙ্গোপন থাকে, কে জানে।– শেখরনাথ রাহা, যিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন, যাবজ্জীবন কালাপানি’র সাজা নিয়ে আন্দামানে এসে আটাশ-উনত্রিশটা বছর সেলুলার জেলে কাটিয়ে দিয়েছেন, সেই অদম্য মানুষটি ব্রিটিশ পুলিশের কত নির্যাতনই না সয়েছেন, তিনিও তো অন্য বিপ্লবীদের চেয়ে আলাদা নন। বজ্রের মতো কঠোর কঠিন মানুষটির মনের ভেতর এমন একটা কোমল দিক যে ছিল, কে ভাবতে পেরেছিল! সুভাষ মজুমদারের জন্য সেই সকাল থেকে তিনি যে কতটা ব্যাকুল, কতটা উতলা হয়ে আছেন, বিনয় তো নিজের চোখেই দেখছে। একই মানুষের ভেতর কতরকম মানুষ যে লুকনো থাকে!
একসময় উদ্বাস্তুদের ভাগ-বাঁটোয়ারা করে দেওয়া জমিগুলোর ওপর দিয়ে পেরিমিটার রোডের কাছে চলে এলেন শেখরনাথ আর বিনয়। উদ্বাস্তুরাও ব্যারাকগুলোর কাছাকাছি থোকায় থোকায় দাঁড়িয়ে বা বসে কথা বলছিল। তারাও পেছন পেছন চলে এসেছে। উৎকণ্ঠা তো তাদেরও কিছু কম নয়।
টঙের মাথায় বুশ পুলিশের দলটা গভীর জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে নজরদারি চালাচ্ছিল। শেখরনাথ গলার স্বর উঁচুতে তুলে ডাকলেন, ‘এই মাসুদ, এই জগপত—’
দুই বুশ পুলিশ মুখ ফিরিয়ে এদিকে তাকাল। মাসুদ সাড়া দিল।–’হাঁ, চাচাজি—’
‘সুভাষকে কি দেখা যাচ্ছে?’
নৃতাত্ত্বিক সুভাষ মজুমদারকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রায় প্রতিটি মানুষ চেনে। মাসুদ বলল, ‘নেহি চাচাজি। সুবেহ সুবেহ মজুমদারসাব জঙ্গল ঘুষা থা। বহোৎ দূর চলা গিয়া। কঁহা গিয়া, কুছ পতা নেহি—’
‘জারোয়াদের দেখতে পাচ্ছ?’
মাসুদ বলল, ‘নেহি। আজ আর ওরা রিফুজ সেটলমেন্টের দিকে আসে নি। ভারী চিন্তা হচ্ছে। মজুমদারসাব ইতনা আচ্ছা আদমি! রিফুজদের জন্যে জান বাজি রেখে খতরনাক জারোয়াদের কাছে চলে গেছে। উপরবালার মেহেরবানিতে তিনি ফিরে আসুন।‘
শেখরনাথ বা অন্য কেউ কিছু বলল না। সুভাষ মজুমদার অক্ষত শরীরে, নিরাপদে দ্রুত ফিরে আসুন, মনে মনে এটাই সবার প্রার্থনা।
ওধারের কাছাকাছি একটা টঙের মাথা থেকে জগপত সিং বলল, ‘ইক (এক) ঘণ্টার ভেতর আন্ধেরা নেমে যাবে। আন্ধেরামে জঙ্গল বহোৎ খতরনাক চাচাজি। রামজি, কিযুণজি মজুমদারসাবকে জলদি জলদি ফিরিয়ে আনুন—’
ঠিকই বলেছে জগপত। অন্ধকারে জঙ্গলের ভেতরটা খুবই বিপজ্জনক। দক্ষিণ আন্দামানের পশ্চিম দিকে মাইলের পর মাইল জুড়ে গভীর অরণ্য। উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের জন্য ‘জাঙ্গল ফেলিং’ করে প্রচুর জমি বের করা হলেও এখনও বিপুল পরিসর নিয়ে বাকি অরণ্য দাঁড়িয়ে আছে। আন্দামানের এই অরণ্য এতটাই দুর্ভেদ্য যে দিনের বেলাতেই সেখানে সূর্যালোক পৌঁছয় না। না, বাঘ ভালুক সিংহের মতো হিংস্র জন্তু নেই। মারাত্মক বিষধর সাপের সংখ্যাও কম। তবে অজস্র কানখাজুরা (এক ফুট দেড় ফুটের মতো লম্বা এবং তিন ইঞ্চি চওড়া চেলা বিছে) চারিদিকে থিকথিক করছে। এই সরীসৃপগুলোও সাপের চেয়ে কম ভয়াবহ নয়। শরীরে একবার বিষ ঢাললে পাঁচ মিনিটের ভেতর একজন সবল সুস্থ মানুষের অনিবার্য মৃত্যু। তার ওপর জারায়ারা তো আছেই। জটিল, নিবিড় জঙ্গলে গাঢ় অন্ধকারে পথ চিনে জেফ্রি পয়েন্টে পৌঁছনো প্রায় দুঃসাধ্য ব্যাপার। এ সূর্য পশ্চিম দিকের আড়ালে এখন অনেকটাই নেমে গেছে, রোদের রং মরা মরা, ফ্যাকাশে। সন্ধে নামতে আর দেরি নেই। পেরিমিটার রোডের এধারে শতিনেকের মতো মানুষের উৎকণ্ঠা যখন চরম সীমায় পৌঁছেছে, সবাই যখন সুভাষ মজুমদারের ফেরার আশা ছেড়ে দিতে চলেছে, সেই সময় তিনি বাঁ দিকের বুশ পুলিশের টঙের পাশ দিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে জেফ্রি পয়েন্ট সেটলমেন্টে চলে এলেন। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। তার ওপর দিয়ে জঙ্গলের ভেতর সারাটা দিন যে প্রচণ্ড ঝড় বয়ে গেছে তার ছাপ সুভাষের সমস্ত শরীর জুড়ে। তবে এটা ঠিক তিনি সম্পূর্ণ অক্ষত। যে ব্যাগগুলো নিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছিলেন। সেগুলো দেখা যাচ্ছে না। আশ্চর্য, মুখে কিন্তু হাসি লেগেই আছে। আন্দাজ করা যাচ্ছে, যে উদ্দেশ্য বা মিশন নিয়ে তিনি সকালবেলা জঙ্গলে ঢুকেছিলেন তা সফল হয়েছে। শরীর বিপর্যস্ত হলেও তাই মুখমণ্ডলে পরিতৃপ্তির হাসি।
বাঁ দিকের টঙের চুড়ো থেকে মাসুদ জান চেঁচিয়ে উঠল, ‘আল্লা, মেহেরবান। ডান পাশের টঙ থেকে জগপত গলার স্বর শেষ পর্দায় তুলল, ‘রামজি, কিযুণজিকা কিরপা (কৃষ্ণ)।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।