কাল বিকেলে এখানে এসেছেন সুভাষ মজুমদার। একটা রাত কাটিয়ে চলে গেলেন উত্তর দিকের জঙ্গলে। কতটুকু সময়ই বা তাঁকে দেখেছে বিনয়। পরার্থে নিজের জীবনকে সঁপে দেবার অজস্র কাহিনি নানা বইয়ে পড়েছে সে; শুনেছে। কিন্তু এই প্রথম একজনকে স্বচক্ষে দেখল, প্রায় নিশ্চিত মৃত্যুকে তুচ্ছ করে মহাবিপজ্জনক এক অভিযানে চলেছেন। উৎকণ্ঠাটা শতগুণ হয়ে বিনয়ের হৃদপিন্ডে যেন চাই চাই পাথরের স্তূপের মতো চেপে বসতে থাকে।
জঙ্গলে ঢুকে গলার স্বর অনেক উঁচুতে তুলে চিৎকার করে কিছু বলতে বলতে সুভাষ মজুমদার এগিয়ে যেতে লাগলেন। এসব ভাষা আগে আর কখনও শোনে নি বিনয়। প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত দুর্বোধ্য। ক্রমশ প্রাচীন সব মহাবৃক্ষ এবং ঘন নিবিড় জটিল ঝোঁপঝাড়ের ভেতর দিয়ে সুভাষ মজুমদারের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হতে হতে মিলিয়ে গেল। তাঁকেও আর দেখা গেল না।
৪.২০ পেরিমিটার রোডের এধারে
৪.২০
অনেকক্ষণ পেরিমিটার রোডের এধারে দাঁড়িয়ে রইলেন শেখরনাথ। তার ঠিক পাশে বিনয় এবং আশপাশে অসংখ্য উদ্বাস্তু আর পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা। সুভাষ মজুমদারের জঙ্গলে যাওয়ার খবর পেয়ে বন বিভাগের কর্মীরাও চলে এসেছে।
প্রবল উদ্বেগে, দুশ্চিন্তায় সবাই চুপ। নিরেট নৈঃশব্দ্যের ভেতর দু-চারজন বয়স্ক উদ্বাস্তু শুধু বিড় বিড় করে অবিরল বলে চলেছে–’মা দুৰ্গা, মা কালী, জগজ্জননী মাগো, তুমরা দয়া কর। মানুষডারে। (মানুষটাকে) ভালায় ভালায় (ভালোয় ভালোয়) ফিরাইয়া আনো। তেনার য্যান এতটুক ক্ষেতি না অয় (হয়)।‘
পেরিমিটার রোডের এধারে ঘন জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ সবাই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর একে একে ব্যারাকগুলোর কাছে ফিরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে রইল।
আজ আর কারও কাজকর্মে মন নেই। দা-কুড়াল কি শাবল টাবল নিয়ে একজন উদ্বাস্তুও জমিতে নামল না। তারা তো বটেই, জেফ্রি পয়েন্টের প্রতিটি মানুষের ওপর পাষাণভারের মতো একটাই চিন্তা চেপে বসে আছে। সুভাষ মজুমদার যদি জারোয়াদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে শান্ত করতে নাও পারেন, জীবন্ত যেন ফিরে আসেন।
শেখরনাথ এবং বিনয় জঙ্গলের ধার থেকে সোজা নিজেদের ঘরে চলে এসেছিলেন। দু’জনেই চুপচাপ। কিছুক্ষণ দু’হাতে মুখ ঢেকে বসে ছিলেন শেখরনাথ। তারপর জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলেন। ভীষণ চিন্তাগ্রস্ত। বিনয়েরও অস্থির অস্থির লাগছিল। একসময় বাইরে থেকে চোখ ফিরিয়ে এনে শেখরনাথ ভারী গলায় বললেন, ‘আমারই বোধহয় ভুল হয়ে গেছে বিনয়—’
প্রাক্তন বিপ্লবীটি কোন ভুলের ইঙ্গিত দিয়েছেন, মোটামুটি তা আন্দাজ করতে পারছিল বিনয়। তবু জিগ্যেস করল, ‘কিসের ভুল কাকা?’
‘পোর্টব্লেয়ার থেকে সুভাষকে টেনে এনে জঙ্গলে পাঠানো ঠিক হয়নি। রং ডিসিশন। ভুল সিদ্ধান্ত—’ তাঁর কণ্ঠস্বরে অনুশোচনার সুরটাই যেন ফুটে উঠল।
বিনয় উত্তর দিল না।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, ‘সুভাষ মিডল আন্দামানের জারোয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে। হয়তো এজন্যে অনেকটা সময় লেগেছিল। যথেষ্ট প্রস্তুতি ছাড়া এমন একটা হিংস্র ট্রাইব্রের ত্রিসীমানায় যাওয়া অসম্ভব। সুভাষ সাউথ আন্দামানের জারোয়াদের নিয়ে কাজ করে নি; তাদের সঙ্গে মেশেও নি। এই মুহূর্তে এখানকার জারোয়ারা মারাত্মক উত্তেজিত আর ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। উইদাউট প্রিপারেশন একটা ছেলেকে তাদের তির-ধনুকের মুখে ঠেলে দিলাম! উচিত হয়নি, উচিত হয় নি। সুভাষ যে ওদের বোঝাবে, তার আগেই ওরা যে ঝাঁকে ঝাকে তির মেরে তাকে ঝাঁঝরা করে ফেলবে না, তার তো কোনও নিশ্চয়তা নেই। একবার ছেলেটার দিকটা ভাবলাম না। কাল এল, আজই তাকে জঙ্গলে পাঠালাম। মতিভ্রম। ভয়ঙ্কর হঠকারি সিদ্ধান্ত
কী উত্তর দেবে ভেবে পেল না বিনয়। শেখরনাথের তীব্র অনুতাপ তার মধ্যেও যেন চারিয়ে যাচ্ছিল। সুভাষ মজুমদারের ব্যাপারে এরকম ভয়ঙ্কর সম্ভাবনার চিন্তা তার মাথায়ও তো আসা উচিত ছিল। সে নিজেও তো শেখরনাথকে মর্মান্তিক পরিণাম সম্পর্কে সতর্ক করে দিতে পারত। কেন যে এটা ভাবে নি! এখন তো খুবই দেরি হয়ে গেছে। আর কিছু করার নেই।
শেখরনাথ ম্লানমুখে বললেন, ‘জারোয়ারা দল বেঁধে হামলা করার পর তখন আমার মাথার ঠিক ছিল না। উদ্বাস্তুদের স্বার্থ, জেফ্রি পয়েন্টের ভবিষ্যৎ ছাড়া অন্য কিছুই ভাবতে পারছিলাম না। সুভাষের • কিছু হয়ে গেলে আমার এই শেষ জীবনে দুঃখের আর শেষ থাকবে না। তার কথাগুলো তীব্র কাতরোক্তির মতো শোনাল।
বেলা অনেকটাই চড়ে গেছে। দেখতে দেখতে সূর্য মাথার ওপর উঠে এল। জেফ্রি পয়েন্টের বাসিন্দাদের কোনও বিষয়েই চাড় নেই। কিছুটা দিশাহারা, অনেকটাই উদ্ভ্রান্ত। কেউ, বিশেষ করে উদ্বাস্তুরা বিশেষ কথাটথা বলছিল না। যেটুকুও বা বলছে সবই সুভাষ মজুমদারকে নিয়ে। এরই মধ্যে সমুদ্রে গিয়ে স্নান টান করেছে। কোনওরকমে একটু আধটু খেয়েছে। শেখরনাথ এবং বিনয়ও তাই।
বেলা যখন অনেকটাই হেলে পড়েছে, সূর্য পশ্চিম আকাশের ঢাল বেয়ে নেমে যাচ্ছে দ্রুত, পাহাড়ের মাথায় বিশাল বিশাল প্যাডক আর দিদু গাছগুলোর ছায়া দীর্ঘ হচ্ছে সেই সময় শেখরনাথ বললেন, ‘সেই কখন ছেলেটা জঙ্গলে ঢুকেছে, এখনও তো ফিরল না? মনটা ভীষণ উতলা লাগছে। ঘরে আর বসে থাকতে ইচ্ছা করছে না। এক কাজ করা যাক–

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।