.
শেখরনাথদের ঘরেই বাড়তি একটা তক্তপোষ এনে বিছানা-টিছানা পেতে সুভাষ মজুমদারের থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল পরিতোষ বণিকরা। রাত্তিরে খাওয়া দাওয়ার পর বেশি রাত পর্যন্ত কেউ জেগে রইলেন না। সবাই ঘুমিয়ে পড়লেন।
পরদিন সকালে সবার আগে ঘুম ভাঙল সুভাষ মজুমদারের। তিনি শেখরনাথ এবং বিনয়কেও জাগিয়ে দিলেন। বললেন, ‘কাকা, আমি কিন্তু একটু পরেই জঙ্গলে গিয়ে ঢুকব।‘
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার চা আর সকালের খাবারের ব্যবস্থা করছি।‘ শেখরনাথ বেরিয়ে গিয়ে হাঁকডাক করে পরিতোষ এবং পুনর্বাসনের অন্য কর্মীদের ঘুম থেকে তুলে রুটি, আলুভাজা আর হালুয়া,বানাতে বললেন। জেফ্রি পয়েন্টে সবার সকালের খাবার হল আগের দিনের তৈরি বাসি রুটি, গুড় আর বিদেশের চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশনগুলো থেকে পাঠানো পাউডার মিল্ক গুলে জ্বাল দিয়ে এক গেলাস করে গরম দুধ। এমনকি রিহ্যাবিলিটেশনের যত বড় অফিসারই আসুন না কেন, বাসি রুটি টুটি দিয়ে তাঁদেরও ব্রেকফাস্ট করতে হয়। কিন্তু যে মানুষটা জীবনের প্রচন্ড ঝুঁকি নিয়ে জারোয়াদের এলাকায় যাবে, তাকে ওই ধরনের খাবার দিতে চান নি শেখরনাথ।
কয়েক মিনিটের ভেতর সুভাষের জন্য টাটকা খাবার তৈরির তোড়জোড় শুরু হল। ইতিমধ্যে উদ্বাস্তুরা জেগে উঠেছে। তাদের আগাছা সাফ করার জন্য নিজের নিজের জমিতে যেতে হবে। তাই তুমুল ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে।
উপসাগর থেকে মুখটুখ ধুয়ে এসে সুভাষ মজুমদার তার ব্যাগগুলো বেশ ভাল করে গুছিয়ে নিলেন। সেগুলোতে রয়েছে নানা রকমের বিস্কুট, লাড়ু আর গজা জাতীয় শুকনো মিষ্টি। আর আছে। লাল, নীল, হলুদ, সবুজ–এমন নানা রঙের কাপড়ের টুকরো। তিন চার ফুটের মতো লম্বা, ফুট দুয়েক চওড়া।
গোছগাছ হয়ে গেলে চা-খাবার টাবার খেয়ে সারা গায়ে হালকা নীল রঙের লোশন মেখে নিলেন সুভাষ মজুমদার। বিনয় একদৃষ্টে তাকে লক্ষ করছিল। এই বিশেষ লোশন মাখার কারণ জানে সে। জঙ্গলে ঢুকলে গাছের মাথা থেকে থোকায় থোকায় জোঁক গায়ের ওপর এসে পড়ে। এই তরল পদার্থটির মধ্যে রাসায়নিক এমন কিছু তীব্র জিনিস মেশানো থাকে যাতে গায়ে পড়েই জোঁকেরা শুকনো পাতার মতো ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ে। নইলে তারা রক্ত চুষে মানুষের শরীর ছিবড়ে করে ফেলে দেবে। বিনয় আন্দাজ করে নিল ফল-মিষ্টি, কাপড়-টাপড় জারোয়াদের জন্যই আনা হয়েছে। এসব নিয়েই সুভাষ মজুমদার হিংস্র অরণ্যবাসীদের এলাকায় পা রাখবেন। তার অনুমানটা যে সঠিক সেটা জানা গেল। সুভাষ মজুমদার বললেন, ‘কাকা, আর দেরি করা যাবে না। এবার আমাকে বেরুতে হবে।
তিনি ব্যাগগুলো তুলতে যাবেন, শেখরনাথ বাধা দিলেন–’না না, লা-ডিন ধনপতদের ডাকছি। পেরিমিটার রোড পর্যন্ত তারা ওগুলো নিয়ে যাবে। তোমাকে বইতে হবে না।‘
পেরিমিটার রোড অবধি, কেননা তারপর জেফ্রি পয়েন্টের কারও এমন বুকের পাটা নেই যে জারোয়াদের চৌহদ্দিতে গিয়ে ঢুকতে পারে।
ডাকাডাকি করে লা-ডিনদের আনানো হল। শেখরনাথের নির্দেশে তারা তিনটে ব্যাগ কাঁধে তুলে নিল। এবার সোজা উত্তর দিকে যেতে হবে। সবার আগে আগে শেখরনাথ, বিনয় এবং সুভাষ মজুমদার। তাদের পেছনে পরিতোষ এবং পুনর্বাসনের কর্মীরা।
উদ্বাস্তুরা লম্বা লম্বা ব্যারাকগুলোর এধারে দাঁড়িয়ে চা রুটি-টুটি খাচ্ছিল। শেখরনাথদের, বিশেষ করে সুভাষ মজুমদারকে দেখে তাদের খাওয়া বন্ধ হল। কালই সারা জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তুরা জেনে। গেছে এই চরম দুঃসাহসী, অকুতোভয় মানুষটি তাদেরই জন্য প্রচন্ড বিপদের ভয়কে উড়িয়ে দিয়ে জারোয়াদের বোঝাতে জঙ্গলে যাবেন। খাবার-দাবার ফেলে তারাও দল বেঁধে পিছু পিছু চলল। কারও মুখে টু শব্দটি নেই। আড়াই তিনশো মানুষ নিঃশব্দে পা ফেলছে শুধু। পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা বিশাল এই জেফ্রি পয়েন্ট জুড়ে অনন্ত স্তব্ধতা নেমে এসেছে। অথচ আন্দামানের এক কোণে এই দুর্গম ভূখণ্ড অন্য দিন সকাল হতে না-হতেই সরগরম হয়ে ওঠে।
পেরিমিটার রোড অবধি এসে সবাই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। উঁচু উঁচু টঙগুলোতে যে বুশ পুলিশরা দিবারাত্রি নজরদারি চালায় তারা পর্যন্ত অবাক বিস্ময়ে সুভাষ মজুমদারকে দেখছে।
লা-ডিনদের কাছ থেকে ব্যাগগুলো নিলেন সুভাষ মজুমদার। কাপড়ের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিলেন তিনি, আর দুই হাতে অন্য দু’টো ব্যাগ। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন। –’চলি। আপনারা ভয় পাবেন না। আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে।‘
বিনয় মানুষটিকে যত দেখছিল ততই তার বিস্ময় বাড়ছিল। কোথায় তিনি ভয় পাবেন তা নয়, উলটে অগুনতি মানুষকে সাহস দিচ্ছেন।
সুভাষ মজুমদার সামনের দিকে পা বাড়ালেন। বিনয়ের সমস্ত শরীর আমূল কেঁপে গেল। সুভাষ বলেছেন, কার নিকোবর-এ দু’টি জারোয়া ছেলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মেলামেশার সুযোগ পেয়েছেন, মিডল আন্দামানের জারোয়াদের মধ্যে গিয়েও কাজ করেছেন। কিন্তু এর আগে কখনও দক্ষিণ আন্দামানের, বিশেষ করে জেফ্রি পয়েন্ট অঞ্চলের জারোয়াদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নি বা করার সময় পাননি। এখানকার জারোয়ারা হয়তো তাঁকে দেখামাত্র দূর থেকে ঝাঁকে ঝাকে তির ছুঁড়তে থাকবে কিংবা অন্য কোনওভাবে হামলা চালাবে। গভীর অরণ্য থেকে হয়তো কোনও দিনই তাঁর ফেরা হবে না। পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের নিদারুণ সংকট থেকে বাঁচাতে এসে তার প্রাণটাই চলে যাবে কিনা, কে জানে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।