শেখরনাথ বললেন, ‘গুলি করে যে ইংরেজরা মেরেছিল তা জানি। কিন্তু সেই কারণে এত বছর বাদেও বংশধরেরা রাগ পুষে রেখেছে সেটা জানা ছিল না।‘
‘তা ছাড়া রাগের আরও একটা বড় কারণ তো আপনি জানেন।‘
‘হ্যাঁ, জানি। জঙ্গল রিক্লেম করে ওদের এরিয়া ছোট করে দেওয়া হচ্ছে। এটা ওরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। চিফ কমিশনারের কাছে অ্যাপিল করেছি, অ্যাট লিস্ট জেফ্রি পয়েন্টের উত্তর দিকটায় জঙ্গল ফেলিং বন্ধ করা হোক। তিনি পালটা প্রশ্ন করলেন, দলে দলে ডি পি ফ্যামিলিগুলো কলকাতা থেকে আসছে। জঙ্গল নিমূল না করলে জমি কোথায় পাওয়া যাবে? আর জমি না পেলে এত মানুষের রিহ্যবিলিটেশন হবে কী করে? ব্যাপারটা অস্বীকার করা যায় না। তবু আমি জেদ ধরেছিলাম, উত্তর দিকটা বাদ দিয়ে পুব আর পশ্চিম দিকের জঙ্গল কাটা হোক। তাকে কোনও মতেই রাজি করাতে পারি নি। একটু চুপ করে থেকে ফের শুরু করলেন, ‘আন্দামান অ্যান্ড নিকোবর আইল্যান্ডস-এর অথরিটির কথায় যুক্তি আছে। সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু জারোয়াদের শান্ত করতে না পারলে তো মহাবিপদ।‘
সুভাষ মজুমদার হাসলেন।–-‘সেইজন্যেই তো আপনি আমাকে এখানে ডেকে এনেছেন। আমার দিক থেকে চেষ্টার ত্রুটি হবে না।‘
আন্দামানের আদিম জনগোষ্ঠীগুলো সম্পর্কে সুভাষের কতটা গভীর জ্ঞান, অবাক হয়ে ভাবছিল বিনয়। সে আর মুখ বুজে থাকতে পারল না। অনন্ত এক কৌতূহল তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল।–’শান্ত করতে হলে ওদের কাছে তো যেতে হবে।‘
হাসিটা সারা মুখে ছড়িয়ে পড়ল সুভাষের। বললেন, ‘তা তো যেতেই হবে। নইলে বোঝাব কী করে?’
বলে কী লোকটা? বিস্ময়ের অবধি নেই বিনয়ের।–‘কিন্তু—’
‘আপনি কী বলতে চাইছেন, বুঝতে পারছি। জারোয়ারা সো-কলড সিভিলাইজড পিপলকে তাদের ত্রি-সীমানায় ঘেঁষতে দেয় না, তাই তো?’
‘হ্যাঁ—‘
যেন জলভাতের মতো ব্যাপার, এমন একটা ভঙ্গিতে সুভাষ মজুমদার বললেন, ‘আমাকে ওদের সঙ্গে দেখা করে কথা বলতেই হবে।‘
‘আপনি কি ওদের ভাষা জানেন?’
‘অনেকটাই জানি।‘
বিমূঢ়ের মতো তাকিয়ে থাকে বিনয়। তার মনোভাবটা আন্দাজ করে নিয়ে সুভাষ মজুমদার বললেন, ‘স্বাধীনতার কয়েক বছর আগে সেই ইংরেজ আমলে দুটো জারোয়া ছেলেকে ব্রিটিশ পুলিশ ধরে ফেলেছিল। না, সেই নাইনটিনথ সেঞ্চুরিতে জারোয়াদের যেভাবে মার্ডার করা হয়েছিল এদের তা করা হয় নি। অ্যানথ্রোপলজিকাল স্টাডির জন্যে ছেলে দু’টোকে, তখন দশ বারো বছর বয়স ছিল, কার নিকোবর আইল্যান্ডে নিয়ে রাখা হয়। আমি পোর্টব্লেয়ারে আসার পর নিকোবরে গিয়ে ওদের সঙ্গে দেখা করি। কাজ চালানোর মতো ইংরেজি সেই আমলের অ্যানথ্রোপলজিস্টরা ওদের শিখিয়েছিলেন। জঙ্গলে প্রায় অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে ওরা থাকত। নিকোবরে পরত প্যান্ট-শার্ট। এদের সঙ্গে প্রথম দিকে একটানা চার মাস কাটাই। তারপর কিছুদিন পর পর যেতাম, এখনও অন্য সব কাজের ফকে সময় পেলেই চলে যাই। জঙ্গলে যেসব আদিবাসীরা থাকে, তাদের আমরা তথাকথিত সভ্য জগতের মানুষ জংলি, অসভ্য–এইসব তা দিয়ে থাকি। কিন্তু ছেলে দুটো যথেষ্ট মেধাবী, খুবই ইনটেলিজেন্ট। নিকোবরের একটা স্কুলে তারা পড়ছে। যে কোনও বিষয় চট করে ধরে ফেলতে পারে। মেমোরিও যথেষ্ট শার্প। ওদের কাছ থেকে জারোয়াদের ভাষাটা মোটামুটি শিখে ফেলি। ওদের সমাজ সম্পর্কে, জীবনযাপন সম্পর্কে একটা ভাল ধারণাও তৈরি হয়ে যায়।’ একনাগাড়ে বলে যাবার কারণে কিছুটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার আরম্ভ করলেন, ‘আপনাদের বলেছি, সাউথ আন্দামানের পশ্চিম দিকের ঘন জঙ্গলে যেমন জারোয়ারা থাকে, মধ্য আন্দামানের পশ্চিম দিকের জঙ্গলেও ওদের অনেকেই থাকে। নিকোবরের ওই ছেলে দু’টির কাছ থেকে ওদের যে ভাষা, হাব-ভাব, আচার-আচরণ শিখেছিলাম সেটুকু পুঁজি করে মিডল আন্দামানের জঙ্গলে জারোয়াদের মধ্যে চলে যাই। ভয় যে করে নি তা নয়। কিন্তু নৃতাত্ত্বিক স্টাডি তো ঘরে বসে করা যায় না। সব উপজাতিই ওঙ্গেদের মতো নিরীহ, শান্ত নয়। অনেকেই অত্যন্ত হিংস্র। ঝুঁকি না নিলে তাদের সম্বন্ধে গভীরভাবে জানব কী করে? মিডল আন্দামানে গিয়ে জারোয়াদের সম্বন্ধে আরও অনেক কিছুই জানতে পারি যা আমার গবেষণার পক্ষে খুবই কাজে লেগেছে।’
বিনয় জিগ্যেস করল, ‘জারোয়ারা যেরকম ভয়ঙ্কর টাইপের, মিডল আন্দামানে আপনাকে বিপদের মধ্যে পড়তে হয় নি?’
সুভাষ মজুমদার বেশ মজাই পেলেন যেন।–’তা একটু আধটু পড়তেই হয়েছে। উটকো একটা প্যান্ট-শার্ট পরা লোক তাদের মধ্যে এসে পড়েছে, চট করে কি তাকে মেনে নিতে চায়? সন্দেহ হওয়াটা স্বাভাবিক। তারপর আমার মুখে ওদের ভাষাটা শুনে ধীরে ধীরে বুঝতে পারে আমি কোনও রকম ক্ষতি করতে যাই নি। একবার নয়, বেশ কয়েক বার যাতায়াতের ফলে ওদের সঙ্গে বেশ বন্ধুত্বই হয়ে যায়। জারোয়াদের সম্বন্ধে আরও অনেক কিছুই জানতে পারি। আমার সেই জ্ঞানটুকু নিয়ে জেফ্রি পয়েন্টে এসেছি। আমি চূড়ান্ত আশাবাদী। আমার ধারণা, সাউথ আন্দামানের জারোয়াদের সঙ্গে একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিংয়ে আসতে পারব। জঙ্গলেই থাকুক আর পাহাড়েই থাকুক–মানুষ তো। মানুষের সঙ্গে মানুষের মতো ব্যবহার করলে যথেষ্ট কাজ হয় বলেই আমার বিশ্বাস। তারপর দেখা যাক।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।