বিনয় হাসল। কিন্তু অবাক বিস্ময়ে ভাবতে লাগল ‘এই মানুষটি কী করে যে জারোয়াদের সমস্যাটার সুরাহা করবেন, কে জানে।‘
শেখরনাথ তাড়া দিলেন।–-‘আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকে না। চল–চল—’
সুভাষ মজুমদার বললেন, ‘জিপে অনেক কিছু নিয়ে এসেছি, নামাতে হবে।‘
পরিতোষ এবং জেফ্রি পয়েন্ট রিহ্যাবিলিটেশনের বেশ কয়েকজন কর্মী সুভাষ মজুমদারদের দেখে চলে এসেছিল। তারা চুপচাপ একধারে দাঁড়িয়ে আছে। শেখরনাথ পরিতোষকে বললেন, ‘সুভাষের মালপত্র নামিয়ে আমাদের ঘরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর। আর যে ড্রাইভারটি গাড়ি চালিয়ে নিয়ে এসেছে সে পার্মানেন্টলি এখানে থাকবে। তার থাকার অ্যারেঞ্জমেন্টও করে দেবে। আর হ্যাঁ, বিশু ওই জিপটা পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন থেকে জেফ্রি পয়েন্ট সেটলমেন্টের কাজে লাগানো হবে।
পরিতোষ ব্যস্ত হয়ে পড়ল।–’আমি অহনই (এখনই) হগল (সকল) বন্দোবস্ত করতে আছি।‘
শেখরনাথ বললেন, ‘সুভাষ সেই কখন পোর্টব্লেয়ার থেকে বেরিয়েছে। ওর জন্যে চা আর কিছু খাবারও পাঠাবে। লা-ডিন আর ড্রাইভারটিকেও দেবে।‘
‘হ। নিয্যস (নিশ্চয়ই)।‘
শেখরনাথ সুভাষকে নিয়ে তাদের ঘরে চলে গেলেন। বিনয়ও তাঁদের সঙ্গে সঙ্গে এল। সুভাষ মজুমদার সম্বন্ধে তার বিপুল আগ্রহ।
ঘরে এসে তিনজন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে তক্তপোষের বিছানা আর চেয়ারে বসে পড়ল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পুনর্বাসন দপ্তরের দু’জন কর্মী তিন চারটে চটের ব্যাগ বোঝাই জিনিস আর একটা চামড়ার স্যুটকেস নিয়ে এল। তার পরে-পরেই পরিতোষ এবং ধনপত সিং একটা বড় কাঠের পরাতে তিনজনের মতো চা আর প্রচুর দামি দামি বিস্কুট এনে টেবিলের ওপর রাখল।
হঠাৎ কিছু মনে পড়ে গেল শেখরনাথের। বললেন, একটা কথা একেবারে ভুলে গিয়েছিলাম। সুভাষ যে ক’দিন জেফ্রি পয়েন্টে আছে আমাদের ঘরেই থাকবে। ওর জন্যে এখানে একটা তক্তপোষ আর বিছানা-টিছানা তোমার লোকদের দিয়ে যেতে বলবে। মশারিও চাই। নইলে রাত্তিরে মশা আর বাঢ়িয়া পোকায় ছিঁড়ে খাবে।
ঘাড় হেলিয়ে পরিতোষ চলে গেল।
চা খেতে খেতে এলোমেলো কিছু কথা হল। বিনয় নীরব শ্রোতা। সে জানতে পারল সুভাষ অবিবাহিত। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এখানকার অ্যানথ্রোপলজিকাল ডিপার্টমেন্টটাকে ঢেলে সাজানো হয়েছে। প্রথম থেকেই সুভাষ আন্দামানের জনজাতিগুলোর ওপর একাগ্রভাবে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একসময়, সেই নাইনটিনথ সেঞ্চুরির শেষাশেষি অবধি আন্দামানে তেরোটি উপজাতি ছিল। খর্বকায়, নিগ্রো গোষ্ঠীর মানুষজন। ন’টা গোষ্ঠী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। টিমটিম করে চারটে কোনও রকমে টিকে আছে। ওঙ্গে, জারোয়া, গ্রেট আন্দামানিজ আর সেন্টিনালিজ। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে দক্ষিণে যে দ্বীপটা আছে তার নাম লিটল আন্দামান। ছোট্ট দ্বীপ, আয়তন মাত্র উনপঞ্চাশ বর্গমাইল। এখানেই থাকে ওঙ্গেরা। সংখ্যায় তারা মাত্র চারশো সাতাশি। এরা খুবই নিরীহ, শান্ত। এদের আদি ইতিহাস থেকে সামাজিক আচার আচরণ, ভাষা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি প্রচুর খুঁটিনাটি তথ্য জেনে নিয়েছে সুভাষ। এই নিয়ে অনেকটাই লিখে ফেলেছে। দু-এক মাসের ভেতর বাকিটা শেষ করে ফেলবে। গ্রেট আন্দামানিজদের সম্পর্কে নৃতাত্ত্বিকদের আপাতত বিশেষ আগ্রহ নেই। কেন না, তারা উপজাতি হিসেবে বিশুদ্ধ নয়। অন্য রক্তের সংমিশ্রণের ফলে তাদের চেহারা এবং আকৃতিও পালটে গেছে। কমতে কমতে ওদের সংখ্যা এখন মাত্র পঁচাত্তর জন। গ্রেট আন্দামানিজরা কয়েক বছরের মধ্যেই লুপ্ত হয়ে যাবে। বাকি রইল জারোয়া আর সেন্টিনালিজরা। দক্ষিণ আর মধ্য আন্দামানের উত্তর আর পশ্চিম দিকের গভীর অরণ্যে থাকে জারোয়ারা। আর মিডল এবং সাউথ আন্দামানের পশ্চিম দিকে আরও দুটো দ্বীপ আছে। সাউথ সেন্টিনেল আর নর্থ সেন্টিনেল। এই দুই দ্বীপের বাসিন্দারা হল সেন্টিনালিজ। জারোয়া আর সেন্টিনালিজরা ভীষণ হিংস্র। বাইরে থেকে কেউ তাদের এলাকায় এলে একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
জারোয়াদের সঙ্গে মোটামুটি অনেকটাই যোগাযোগ করতে পেরেছেন সুভাষ। কিন্তু সেন্টিনালিজদের ধারে কাছে ঘেঁষা সম্ভব হয়নি তাঁর পক্ষে। অ্যানথ্রোপলজিকাল ডিপার্টমেন্টের স্টিমলঞ্চ ওই দুটো দ্বীপের কাছে গেলেই সেন্টিনালিজরা ঝাঁকে ঝাঁকে তির চালাতে শুরু করে। ওদের বিশ্বাসভাজন হয়ে বন্ধুত্ব করে তথ্য জোগাড় করা খুবই কঠিন, সেজন্য অনেক সময় লাগবে।
এই ধরনের কথাবার্তার ফাঁকে একসময় আসল প্রসঙ্গে চলে এলেন শেখরনাথ। এখানকার কথা তো বিশুর কাছে শুনেছ। আমরা ভীষণ সংকটে আছি।
আন্দামানের উপজাতিরা যে সুভাষ মজুমদারকে কতটা আবিষ্ট করে রেখেছে, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছিল। একেবারে মগ্ন হয়ে তিনি ওদের সম্বন্ধে বলে যাচ্ছিলেন। এবার একটু অপ্রস্তুত হলেন। ব্যস্তভাবে বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, মিস্টার রাহার কাছে সব শুনেছি। আর সেই জন্যেই তো আমার এখানে আসা।’
‘দেখ সুভাষ, যেভাবে জারোয়ারা হামলা চালাচ্ছে তাতে জেফ্রি পয়েন্ট সেটলমেন্টের পক্ষে সেটা ভীষণ ক্ষতিকর। আমরা তোমার দিকে তাকিয়ে আছি।’
সুভাষ মজুমদার হাসলেন।–’আমি সাধ্যমতো চেষ্টা করব। আসলে কি জানেন কাকা—’
শেখরনাথ উৎসুক হলেন, তবে কোনও প্রশ্ন করলেন না।
সুভাষ থামেন নি।–’অনেকদিন আগে ইংরেজরা জারোয়াদের জংলি বর্বর তা লাগিয়ে সাঁইত্রিশজনকে ধরে এনে পোর্টব্লেয়ারের এবারডিন মার্কেটের সামনে লাইন দিয়ে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মেরেছিল। সেই থেকে বংশপরম্পরায় সভ্য জগতের মানুষজন দেখলে তারা খেপে ওঠে।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।