বিনয়ের ধন্দটা কিছুতেই কাটছে না।-–’কাকা, বুঝতে পারছি না, সুভাষ মজুমদার এসে কিভাবে হিংস্র জারোয়াদের বুঝিয়ে সুঝিয়ে শান্ত করবেন।’
শেখরনাথ হাসলেন, ‘কৌশলটা আমারও ঠিক জানা নেই। সে আসুক, তখন দেখতে পাবে।‘
‘একটা কথা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।‘
‘কী কথা?’
‘ওঙ্গেরা শুনেছি খুব নিরীহ ধরনের। তাদের নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। গ্রেট আন্দামানিজরা রেসিয়ালি পিওর নয়। নানা রক্তের মিশ্রণে তাদের চেহারা টেহারাও পালটে গেছে। সংখ্যায় তারা নাকি মাত্র পঁচাত্তর জনে এসে ঠেকেছে। তাদের সম্বন্ধে অ্যানথ্রোপলজিস্টদের বিশেষ ইন্টারেস্ট নেই। কিন্তু জারোয়ারা তো ভীষণ হিংস্র। সো-কলড সভ্য জগতের মানুষজনকে তারা সহ্য করতে পারে, ধারেকাছেও ঘেঁষতে দেয় না। সুভাষ মজুমদার তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন কী করে?’
‘আমি যখন চিঠি পাঠিয়েছি আর জেফ্রি পয়েন্টে এত বড় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে তখন সে চুপচাপ পোর্ট ব্লেয়ারে বসে থাকতে পারবে না। ঠিক চলে আসবে। সে এলে তাকেই জিগ্যেস করে তোমার প্রশ্নের উত্তরগুলো জেনে নিও।’
বিনয় আর কিছু বলল না। অফুরান কৌতূহল নিয়ে সুভাষ মজুমদারের জন্য উদগ্রীব অপেক্ষা করা ছাড়া এখন আর তার কিছু করার নেই। বিচিত্র ওই নৃতত্ত্ববিদকে দেখার জন্য সে ব্যগ্র হয়ে থাকবে।
.
৪.১৯
কাল জেফ্রি পয়েন্টের আমিন লা-ডিনকে শেখরনাথের চিঠি দিয়ে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা জিপে পাঠিয়ে দিয়েছিল পরিতোষ বণিক। জিপটা লা-ডিনকে পোর্টব্লেয়ারের এধারের ব্যাম্বু ফ্ল্যাটে জেটিতে নামিয়ে দিয়ে কালই ফিরে এসেছিল।
আজ অন্য একটা জিপে লা-ডিন ফিরে এল। জিপটা সোজা উদ্বাস্তুদের জন্য যে ব্যারাকগুলো তোলা হয়েছে সেখানে এসে থামল।
কাল সকালের দিকে জারোয়ারা দল বেঁধে উদ্বাস্তুদের কলোনিতে ভয়াবহ হামলা চালিয়েছিল। শেখরনাথ উদ্বাস্তুদের জমিতে গিয়ে কাজ করতে বারণ করেছিলেন; তাই জমি সাফাই বন্ধ ছিল। উদ্বাস্তুরা ব্যারাকের চারপাশে এধারে ওধারে থোকায়-থোকায় বসে বা ঘোরাঘুরি করে দিনটা কাটিয়ে দিয়েছে। আজ কিন্তু জেফ্রি পয়েন্টের ছবিটা অন্যরকম। সকাল হতে না-হতেই চা-রুটি খেয়ে ছিন্নমূল মানুষগুলো দা-কুড়াল, কোদাল-টোদাল নিয়ে জমিতে নেমে পড়েছে। আসলে জারোয়াদের ভয়টা তারা কাটিয়ে উঠছে। শুধু সকালের দিকেই নয়। দুপুরে খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে ফের জমির আগাছা বাছাই শুরু করেছে। এই সাহস দেখানোটা সত্যিই বিরাট সুলক্ষণ।
বিকেলবেলা বিনয়কে সঙ্গে নিয়ে শেখরনাথ ব্যারাকগুলোর কাছাকাছি রসময় শীলের জমিতে তাদের কাজকর্ম দেখছিলেন। কিন্তু নজর ছিল পুব দিকের পাহাড়ের গায়ে যে পাথর-কাটা রাস্তাটা জেফ্রি পয়েন্টের দিকে ঢাল বেয়ে নেমে এসেছে সেই দিকে। জিপটাকে ব্যারাকের সামনে এসে থামতে দেখে বিনয়কে বললেন, ‘চল, সুভাষরা এসে গেছে।
লম্বা লম্বা পা ফেলে শেখরনাথরা জিপটার কাছে চলে এলেন। ততক্ষণে লা-ডিন এবং আরও একজন নেমে পড়েছেন। অচেনা, আধবয়সি মানুষটিচল্লিশ-পঞ্চাশের মতো বয়স, ছিপছিপে বুদ্ধিদীপ্ত চেহারা, মাঝারি হাইট, পরনে ঢোলা ফুলপ্যান্ট আর শার্ট, পায়ে চপ্পল, চোখে পুরু ফ্রেমের। চশমা–তিনিই যে সুভাষ মজুমদার বুঝতে পারল বিনয়। যে গাড়িটা চালিয়ে এনেছে সেও নেমে পড়েছে।
শেখরনাথ বললেন, ‘যাক, তুমি এসে গেছ। ভেবেছিলাম আজ দুপুরের আগে আগে চলে আসবে। দেখলাম সেটা মিলে গেছে।’
প্রাচীন বিপ্লবীটির পা ছুঁয়ে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন সুভাষ। বললেন, ‘কাল রাহাসাহেব (বিশ্বজিৎ রাহা) যখন গাড়ি পাঠিয়ে আমাকে তার বাংলোতে ডেকে নিয়ে জানালেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। জেফ্রি পয়েন্টে যেতে হবে, আমার আপত্তি বা অসুবিধে আছে কিনা। বললাম, কোনওটাই নেই। শুধু আমাদের অ্যানথ্রোপলজিকাল ডিপার্টমেন্টের বড় কর্তা ডাক্তার শ্যামচৌধুরিকে একবার জানাতে হবে। রাহা সাহেব চিঠি লিখে তার অনুমতি আনিয়ে নিলেন। কিন্তু তখন অনেকটা রাত হয়েছে। ততক্ষণে ব্যাম্বু ফ্ল্যাট-চ্যাথাম ফেরি সারভিস বন্ধ হয়ে গেছে। আসার উপায় ছিল না।’
আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন শেখরনাথ। কিছু বললেন না।
সুভাষ মজুমদার বলতে লাগলেন, ‘সকালে উঠেই যে চলে আসব তার উপায় ছিল না। আপনি জেফ্রি পয়েন্টের জন্যে পার্মানেন্টলি একটা গাড়ি চেয়েছেন। গাড়ি আর ড্রাইভারের ব্যবস্থা করতে বেশ দেরি হয়ে গেল রাহা সাহেবের। তারপর সেই গাড়ি চ্যাথাম জেটিতে এনে স্টিমারে তুলে ব্যাম্বু ফ্ল্যাটে নামাতে বেশ খানিকটা সময় লাগল। এতসব হাঙ্গামার পর তবে আসতে পারলাম।’
‘ঠিক আছে, রাস্তায় অনেক ধকল গেছে। এখন চল আমাদের সঙ্গে। আজ আর তো কিছু করা যাবে না। সন্ধে হতে বেশি দেরি নেই। রাতটা ভাল করে রেস্ট নাও। যা করার কাল কোরো।‘
‘হ্যাঁ, তাইই করতে হবে। সুভাষ শেখরনাথের সঙ্গে কথা বলছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার চোখ বার বার এসে পড়ছিল বিনয়ের দিকে।–’আপনি নিশ্চয়ই বিনয় বসু। বলে হাতজোড় করলেন।‘
বিনয়ও হাতজোড় করে বলল, হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। নিশ্চয়ই আমার কথা বিশ্বজিৎবাবুর কাছে শুনেছেন।
‘হ্যাঁ। আপনি ‘নতুন ভারত’ কাগজের সাংবাদিক। আন্দামানে রিফিউজি রিহ্যাবিলিটেশন কভার করতে এসেছেন আর এখন জেফ্রি পয়েন্টে আছেন।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।