বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আর দেরি করে কী হবে? যাওয়ার ব্যবস্থা করো।’
হাঁকাহাঁকি করে উদ্বাস্তুদের দুই মিলঞ্চ ‘সি-গাল আর ‘নটিলাস’-এ তুলে ফেলল নিরঞ্জনরা। তারপর সেই বর্মি শিখ টিমেরা উঠল। সবার শেষে বিশ্বজিৎ আর বিনয়।
বিনয় উঠেছিল ‘নটিলাস’-এ। নিচের ডেকটা উদ্বাস্তুতে বোঝাই। সেখানে জায়গা না পেয়ে অনেকে আপার ডেকেও চলে গেছে। তাদের দেখাশোনা করছিল নিরঞ্জন। বিভাস বাকি উদ্বাস্তুদের নিয়ে ‘সি-গাল’-এ উঠেছে।
বিশ্বজিৎ বিনয়কে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে ‘নটিলাস’-এর দোতলায় চলে এল। এখানে ডেকের একদিকে কিছু উদ্বাস্তু বসে আছে। অন্য ধারে বর্মি, শিখ এবং নানা জাতের লোকের জটলা। বিশ্বজিতের কাছে এসে বর্মিরা সসম্ভ্রমে কপালে হাত ঠেকিয়ে কেউ বলছে নমস্তে’, কেউ বা আদাব’।
বিশ্বজিৎ প্রতি-নমস্কার জানিয়ে তাদের খোঁজখবর নিচ্ছিলেন–কে কেমন আছে, কাজকর্ম কেমন চলছে, ছেলেমেয়েরা কে কী করছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
চ্যাথাম জেটিতে বিনয় লোকগুলোকে দেখেছিল ঠিকই, তবে খানিকটা অন্যমনস্কর মতো এবার ভালো করে লক্ষ করল। সবার গায়ের চামড়া কর্কশ, তামাটে। গালে গলায় কপালে সরু সরু অগুনতি রেখা; সেখানে পুঞ্জীভূত রুক্ষতা জমাট বেঁধে আছে। আন্দাজ করল, এরা হয়তো দীর্ঘকাল এই দ্বীপে রয়েছে। আন্দামানের অজস্র তীব্র রোদ, বছরে দু’বার প্রবল বৃষ্টিপাত আর নোনা হাওয়া তাদের চেহারায় শুষ্ক কাঠিন্য এনে দিয়েছে। বোঝ যাচ্ছিল বিশ্বজিৎকে ওরা যেমন চেনে, তিনিও তাদের সবাইকে চেনেন।
একটা লম্বা-চওড়া লোক, মুখে কাঁচা-পাকা অজস্র দাড়ি–খুব সম্ভব সে পাঠান–জিগ্যেস করল, সাহাব, পাকিস্তানসে আর কত আদমি আন্দামানে আসবে?’
বিশ্বজিৎ হাসলেন, ‘অনেক। এই তো সবে শুরু।‘
লোকগুলো আর দাঁড়াল না; যেখানে ছিল সেখানে ফিরে গেল।
বিশ্বজিৎ বিনয়ের দিকে তাকান। –‘এঁরা কারা জানেন?’
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়। -–‘না।‘
‘এক সময়ের দুর্ধর্ষ সব কয়েদি। যাবজ্জীবন জেল খাটতে আন্দামান পাঠানো হয়েছিল। এদের লাইফ হিস্ট্রি শুনলে বুকের রক্ত হিম হয়ে যাবে। মুক্তি পাবার পর বিয়ে-শাদি করে শান্তশিষ্ট গৃহপালিত প্রাণী হয়ে গেছে।‘
বিনয় যা ভেবেছিল- লোকগুলো অনেককাল আন্দামানে আছে–সেটা মিলে গেছে। কিন্তু নানা দুষ্কর্মের জন্য তাদের যে কালাপানি পাঠানো হয়েছিল তা বোঝা যায়নি। সে রীতিমতো অবাক হল অন্য একটা কারণে। জিগ্যেস করল, ‘এই ক্রিমিনালদের বিয়ে হল কী করে? মেয়ে পেল কোথায়?’
‘আন্দামানে তাদের জন্যে সুটেবল ব্রাইড মানে যোগ্য পাত্রী ছিল। বিয়ে আটকায় কে?’
‘এই তো সবে দেশ স্বাধীন হল। তার আগে আসামীদের জন্যে এখানে কনে মজুত ছিল?’
‘ছিল, ছিল’- হাসতে হাসতে বিশ্বজিৎ বললেন, ‘এইসব প্রাতঃস্মরণীয়া মেয়েমানুষও পুরুষদের মতো এখানে জেল খাটতে এসেছিল।’
পুরুষদের ‘কালাপানি’তে পাঠাবার কথা বিনয়ের জানা আছে। কিন্তু মেয়েদের কথা এই প্রথম শুনল। খানিকক্ষণ চুপকরে থাকে। তারপর জিগ্যেস করে, ‘এদের বিয়ে হল কী করে?’
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘এত তাড়া কীসের? এখানে যখন এসেই পড়েছেন সব জানতে পারবেন।’
ওদিকে দু’টো লঞ্চই ছেড়ে দিয়েছিল। উপসাগরের নীল জল উথালপাথাল করে তারা কোনাকুনি ছুটে যাচ্ছে।
সূর্য এতক্ষণে আরও খানিকটা ওপরে উঠে এসেছে। এখন আর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকা যায় না। নোনা জলে তীব্র রোদ যেন ঝলকে যাচ্ছে।
আধ ঘণ্টাও লাগল না, উপসাগর পাড়ি দিয়ে ওপারে পৌঁছে গেল ‘সি-গাল’ আর ‘নটিলাস’।
বিশ্বজিৎ বললেন, এই জায়গাটার নাম ‘বাম্বুফ্ল্যাট’।
এখানেও দু’টো কাজ চলার মতো ছোট জেটি রয়েছে। জলও গভীর নয়। তাই বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। কিন্তু লঞ্চের পক্ষে অসুবিধে নেই।
লঞ্চ বাঁধাহ্যাঁদা হলে উদ্বাস্তুদের নামানো হল। প্রাক্তন কয়েদিদের সঙ্গে বিনয়রাও নেমে পড়ল। তারা বিশ্বজিৎকে ‘আদাব’ এবং ‘নমস্তে’ জানিয়ে চলে গেল।
জেটির মাথায় অ্যাসবেস্টসের অল্প একটু ছাউনি। সেটার তলা দিয়ে সবাই ওধারে চলে গেল। বাইরে পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়েছে। সেখানে বারো চোদ্দোটা মাঝারি আকারের লরি লাইন দিয়ে দাঁড় করানো রয়েছে। সেগুলোর মাথা খোলা। সামনে ড্রাইভারের কেবিন। পেছন দিকে কাঠের মজবুত পাটাতন। ড্রাইভার এবং খালাসিরা যে যার লরির পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
লরির সারির ওধারে একটা জিপ চোখে পড়ে। কালীপদ বিনয়ের মালপত্র নিয়ে সেদিকে চলে গেল।
বিনয় বুঝতে পারছিল, গাড়িগুলো পুনর্বাসন দপ্তরের। উদ্বাস্তুদের নিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষা করছে।
বিশ্বজিৎ নিরঞ্জন আর বিভাসকে বললেন, ‘তোমরা ডি.পি ফ্যামিলিগুলোকে লরিতে ভোলো৷ বিনয়বাবু আর আমি জিপে গিয়ে বসছি। সবাই উঠলে একসঙ্গে রওনা হব।’
লরির ড্রাইভার খালাসিদের মতো জিপের চালক তার গাড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। বিশ্বজিৎকে দেখে তার শরীর টানটান হয়ে গেল। ছফিটের মতো হাইট। লম্বাটে মুখ, চওড়া বুক, ছড়ানো মজবুত কঁধ, মাথায় প্রচুর চুল, মুখটা পরিষ্কার করে কামানো, তবে থুতনিতে তেকোনা দাড়ি। পরনে ঢোলা ফুলপ্যান্ট আর শার্ট। বয়স সাতাশ-আটাশের মতো। কপালে হাত ঠেকিয়ে সে বলল, ‘আদাব–’
আদাবের জবাবে মাথা সামান্য হেলিয়ে বিশ্বজিৎ বলেন, ‘ক্যায়সা হ্যায় নাসিম?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।