ঢোক গিলে ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে পরিতোষ বলল, কেডা কয় আপনে বাইরের মানুষ। আপনের লাখান (মত) রিফিউজিগো বান্ধব আর কেও (কেউ) এই আন্দামানে নাই। হেয়া (তা) ছাড়া—’
‘তা ছাড়া কী?’
‘আপনে কিছু কইলে চিফ কমিশনার থিকা (নেবে) সৰ্গলে (সবাই) শোনে। ইউ আর মোস্ট র্যাসপ্যাক্টেড (রেসপেক্টেড) পার্সন অফ দিজ আইল্যাণ্ডস। আমি অইলাম (হলাম) চুনা পুডি (পুঁটি)। আমার কথায় বড় কত্তারা কি কান দ্যায়? এক কান দিয়া হুনব (শুনবে), আরেক কান দিয়া বাইর কইরা দিব। আপনে কিছু কইলে হার (তার) ওজন কত! যা করনের আপনেরেই করতে অইব (হবে) কাকা।’
একটু মজাই হয়তো পেলেন শেখরনাথ, চোখ ছোট করে বললেন, ‘তোষামুদিটা ভালই শিখেছ। এমন মিন মিন করলে চলবে না। নিজের জন্যে তুমি কিছু চাইছ না। চাইছ উদ্বাস্তুদের জন্যে। এতগুলো মানুষকে কলকাতা থেকে এখানে টেনে আনা হয়েছে। তাদের জন্যে যা যা করা দরকার করবে, জোর করে সব আদায় করে নেবে। বড় কর্তাদের ভয়ে কুঁকড়ে থাকলে চলবে না।’
মুখ নিচু করে চুপ করে রইল পরিতোষ। বোঝা গেল, আন্দামান অ্যাডমিনিস্টেশনের হর্তাকর্তা বিধাতাদের কাছে উঁচু গলায় উদ্বাস্তুদের স্বার্থে কিছু দাবি করার মতো বুকের পাটা তার নেই। অথরিটি যে নির্দেশ বা হুকুম দেবে, মুখ বুজে তা-ই তালিম করে যাবে। ( পরিতোষের মতো একজন তুচ্ছ এমপ্লয়ির নিরুপায়তা বুঝলেন শেখরনাথ। তার পিঠে একটা হাত রেখে নরম গলায় বললেন, ঠিক আছে, যা করার আমিই করব। মনে সাহস আনন। ওপর থেকে অর্ডার এল আর তুমি চোখকান বুজে তাই করে যাবে সেটা হয় না। পুনর্বাসনের কাজটা হল মানুষ নিয়ে। এই জঙ্গলে কখন তাদের কোন বিপদের মুখে পড়তে হবে, আগেভাগে তো জানা যায় না। আমি তো চিরকাল এই জেফ্রি পয়েন্টে পড়ে থাকব না; তোমাকেই কিন্তু সব কিছু করতে হবে। যদি জোর করতে হয় তাই করবে। তোমার অথরিটিকে বোঝাতে হবে নিজের স্বার্থে তুমি কিছুই করছ না। যা করছ দেশ-হারানো, জন্মভূমি থেকে উৎখাত, একদল মানুষের জন্যে। এমনভাবে জোর দিয়ে বলবে যাতে কর্তারা সেটা ভাল করে বুঝতে পারে। দেখবে তাতে কাজ হবে।
এবারও উত্তর দিল না পরিতোষ। শেখরনাথ টের পেলেন তার দীর্ঘ বক্তৃতাও পরিতোষকে চনমনে করে তোলা তো দূরের কথা, প্রশাসনের কর্তাদের সম্পর্কে তার ভয়টাকে এতটুকু নড়াতে পারে নি। সেটা জগদ্দল পাথরের মতো তার ওপর চেপে আছে। তিনি বললেন, ঠিক আছে, আপাতত আমিই সব ব্যবস্থা করছি। রিহ্যাবিলিটেশনের গাড়ি টাড়ি তো কিছুই নেই বললে, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কোনও জিপ বা ট্রাক আছে?
এবার মুখ খুলল পরিতোষ।–’একহান (একটা) জিপ আর একহান লরি আছে।‘
‘আমি বিশুকে একটা চিঠি লিখে দিচ্ছি। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের আজীব সিংকে বলবে তার জিপটা কয়েক ঘন্টার জন্যে আমার চাই। তোমাদের ডিপার্টমেন্টের কারওকে আমার চিঠিটা দিয়ে এখনই বিশুর কাছে পাঠিয়ে দেবে। আজীব সিংকে বলবে, যে যাচ্ছে ব্যম্বু ফ্ল্যাটের জেটিতে তাকে পৌঁছে দিয়েই যেন ওদের জিপ চলে আসে। তোমাদের এমপ্লয়িটিকে পাঠাবার ব্যবস্থা বিশুই করে দেবে। একটু বোসো–’
শেখরনাথ ক্ষিপ্র হাতে একটা চিঠি লিখে খামে ভরে আঠা দিয়ে সেটার মুখ আটকে দিলেন। তার ওপর বিশ্বজিৎ রাহার নাম লিখলেন।
চিঠি নিয়ে পরিতোষ চলে গেল।
প্রাচীন বিপ্লবীটিকে যত দেখছে, ততই তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে যাচ্ছে বিনয়ের। দেশকে ভালবেসে একদিন ইংরেজের হাতে কত নিদারুণ নির্যাতন সহ্য করেছেন, সেলুলার জেলের সলিটারি সেলে কতদিন তাঁকে কাটাতে হয়েছে। জেলরের হুকুমে ‘টিকটিকি’তে চড়িয়ে পাঠান আর জাঠ পেটি অফিসার কি টিণ্ডালরা চাবুক মেরে মেরে তাঁকে রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে। দেশভাগ আর স্বাধীনতার পর সেই অদম্য স্বাধীনতা-সংগ্রামীর অফুরান ভালবাসা এসে পড়েছে পূর্ব পাকিস্তানের ছিন্নমূল মানুষগুলোর ওপর। যতদিন না তারা পাহাড় জঙ্গল সমুদ্রে-ঘেরা এই সৃষ্টিছাড়া জেফ্রি পয়েন্টে মনের মতো করে নির্বিঘ্নে তাদের উপনিবেশ গড়ে তুলছে তার ঘুম নেই, বিশ্রাম নেই, স্বস্তি নেই। তার সর্বক্ষণের শ্বাসপ্রশ্বাসে জড়িয়ে গেছে পূর্ব পাকিস্তানের সর্বস্বখোয়ানো এই মানুষগুলো। অন্যদিকে আন্দামানের প্রাচীন জনজাতি জারোয়াদের জন্যও তাঁর উদ্বেগের অবধি নেই। এই অরণ্যবাসী মানুষগুলোর যাতে লেশমাত্র ক্ষতি না হয় সেদিকেও তার তীক্ষ্ণ নজর। তিনি চান সবাই পাশাপাশি থাকুক। সুষ্ঠু, বিঘ্নহীন সহাবস্থানটাই তার একান্ত কাম্য।
বিনয় ধন্দে পড়ে গিয়েছিল। চব্বিশ ঘন্টা বুশ পুলিশের নজরদারি সত্ত্বেও জারোয়ারা আজ বেপরোয়া হামলা চালালো। শেখরনাথের আশঙ্কা তারা এরকম বার বার হানা দেবে। ক্যানেস্তারা পিটিয়ে আর ব্লাঙ্ক ফায়ার করে শেষ পর্যন্ত তাদের রোখা যাবে না। এই যখন অবস্থা, তখন অ্যানথ্রোপলজিকাল ডিপার্টমেন্টের জনৈক সুভাষ মজুমদার জেফ্রি পয়েন্টে এসে কোন ভোজবাজিতে এই মহা বিপজ্জনক সমস্যার সমাধানটা কী করে করবে, সে ভেবে পেল না। তার মনে যে সংশয় দেখা দিয়েছে সেটা বলেও ফেলল।
শেখরনাথ জানলার বাইরে তাকিয়ে কিছু ভাবছিলেন। চোখ ফিরিয়ে বললেন, ‘নৃতত্ত্ব বিভাগের এই বিজ্ঞানীটি আন্দামানের আদিম বাসিন্দা ওঙ্গে, সেস্টিনালিজ, গ্রেট আন্দামানিজ আর জারোয়াদের নিয়ে অনেক কাজ করেছে। বিশেষ করে জারোয়াদের নিয়ে দূরে বসে ব্রিটিশ অ্যানথ্রোপলজিস্টদের বইয়ের পাতা ঘেঁটে থিওরিটিক্যাল রিসার্চ নয়, রীতিমতো ওদের সঙ্গে মিশে প্রচুর গবেষণার কাজ করে চলেছে। সাউথ আর মিডল আন্দামানের জারোয়াদের সঙ্গে সুভাষই একমাত্র ইন্ডিয়ান অ্যানথ্রোপলজিস্ট যে কিনা যোগাযোগ করতে পেরেছে। জারোয়াদের ভাষা, জীবনযাত্রার ধরন, প্রায় সবটাই জানে। ব্রিটিশ অ্যানথ্রোপলজিস্টরা জারোয়াদের সঙ্গে কতটা কনট্যাক্ট করতে পেরেছিল আমার স্পষ্ট ধারণা নেই। তাদের দু-চারটে লেখা পড়েছি– এইমাত্র। কিন্তু সুভাষ যে কত বড় কাজ করে চলেছে, ভাবা যায় না।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।