জারোয়ারা কী ভাবল তারাই জানে। হয়তো কলোনির জমিতে ঢুকে পড়াটা তাদের পক্ষে নিরাপদ মনে হল না। আচমকা ঝাঁকে ঝাকে তির ছুঁড়ে তারা পলকে গভীর জঙ্গলে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আর আওয়াজের প্রয়োজন নেই। টিন-ক্যানেস্তারার শব্দ এবং ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার থেমে গেছে।
শেখরনাথ লক্ষ করেছিলেন, যে উদ্বাস্তুরা আতঙ্ক ঝেড়ে ফেলে টিন বাজিয়েছে তারা হল বৃন্দাবন, হলধর, চন্দ্র জয়ধর, রসময় শীল এবং আরও কয়েকজন। তাদের মধ্যে কী আশ্চর্য, মোহনবাঁশি কর্মকারও রয়েছে। এই তো কদিন আগে মোহনবাঁশির ফুসফুসে জারোয়াদের তির বিধেছিল। মৃত্যুর চোয়ালের ভেতর থেকে যে বেঁচে ফিরেছে সেই লোকটা এর মধ্যে এমন দুর্জয় সাহস পেল কী করে? কোন ভোজবাজিতে? খুব ভাল লাগছিল শেখরনাথের। তিনি প্রায় অভিভূত।।
বৃন্দাবন, মোহনবাঁশি, রসময় শীল, অর্থাৎ যারা টিন পিটিয়ে জারোয়াদের তাড়াতে সাহায্য করেছে, একে একে তাদের সবার কাছে গেলেন শেখরনাথ। প্রত্যেকের কাঁধে হাত দিয়ে বিপুল উৎসাহে বললেন, ‘এমনটাই চাই। দেশের বাড়ি থেকে উৎখাত হয়ে এতদূরে এসে নতুন বসতি গড়ে তুলছ। এটাই হবে তোমাদের নতুন দেশ। তিন দিকে জঙ্গল, জঙ্গলে জারোয়ারা, সমুদ্রে হাঙরের ঝক। এর মধ্যেই বেঁচে থাকতে হবে। সাহস না থাকলে সেটা সম্ভব নয়। সবার পিঠ টিঠ চাপড়ে দিয়ে মোহনবাঁশির কাছে এলেন। তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, তুমি আমাকে অবাক করে দিয়েছে। কর্মকার। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে এতটা সাহস দেখাতে পারবে ভাবতে পারি নি।
মোহনবাঁশি হাসল। কাকা, দ্যাশ গ্যাছে, ভিটা গ্যাছে, মাটি গ্যাছে। পরান হাতে কইরা কইলকাতা আইছিলাম। হেইহান (সেখান) থনে (থেকে) এই আন্ধারমান দীপি। অহন (এখন) তো আর কইলকাতায় ফিরা যাওনের উপায় নাই। বুকে ডর লইয়া বইয়া (বুকে ভয় নিয়ে বসে থাকলে তো শ্যাষ অইয়া (হয়ে) যামু। আপনেরা খালি (শুধু) আমাগো পাশে থাইকেন। তাইলে (তাহলে) মনের জোর বাড়ব।
‘আমরা সবসময় তোমাদের পাশেই থাকব। বলে অন্য উদ্বাস্তুদের দিকে তাকালেন শেখরনাথ। ‘বেলা অনেকটা চড়ে গেছে। সকাল থেকে অনেক ঝঞ্ঝাট গেল। কারও এখনও সকালের খাবার খাওয়া হয়নি। নাও, নাও, খেয়ে নাও। আজ আর কারও জমির কাজ করার দরকার নেই। কাল থেকে আবার লেগে যেও—’
.
শেখরনাথ আর বিনয়েরও চা’টা খাওয়া হয়নি। সবার সঙ্গে রুটি টুটি খেয়ে শেখরনাথ পরিতোষ বণিককে বললেন, তুমি আমাদের সঙ্গে চল, দরকারী কথা আছে।
পরিতোষ কোনও প্রশ্ন করল না। উৎসুক দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে শেখরনাথদের সঙ্গে তাঁদের ঘরে চলে এল।
শেখরনাথ তার বিছানায় বসলেন, বিনয় বসল নিজের বিছানায় আর পরিতোষ একটু দূরে ঘরের একমাত্র চেয়ারটিতে। শেখরনাথ বললেন, ‘যে কারণে তোমাকে ডেকে আনলাম, এবার সেটা মন দিয়ে শোন।’
কৌতূহল রয়েছে, সেইসঙ্গে দুশ্চিন্তাও–এইরকম একটা মানসিক অবস্থায় শেখরনাথের দিকে। তাকিয়ে রইল পরিতোষ।
শেখরনাথ বললেন, ‘জারোয়ারা কিরকম খেপে আছে, নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ।’
‘হ, কাকা–’ মাথা কাত করল পরিতোষ।
‘আগের যে হামলাটা হয়েছিল, মানে যাতে মোহনবাঁশি জখম হয়, তাতে পাঁচ সাতজন জারোয়া ছিল। কিন্তু আজ চল্লিশ পঞ্চাশজন। লক্ষণটা কিন্তু ভাল নয়—’
পরিতোষ উত্তর দিল না।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, বুশ পুলিশের দুই সিপাই জগপত আর মাসুদ আমাকে খবর দিয়ে গেছে, প্রায়ই দল বেঁধে জারোয়ারা হাতে তিরটির নিয়ে পেরিমিটার রোডের কাছাকাছি চলে আসছে।
‘হ, হেই খবরহান হ্যারা (তারা) আমারেও দিছে।‘
‘এর থেকে কী বোঝা গেল?’
‘আমার মনে লয় (হয়), জারোয়ারা আইজকার লাখান (আজকের মতো) বারে বারে রিফিউজিগো উপুর হামলা চালাইব।’
‘ঠিক ধরেছ।’
‘আজ টিন ক্যানেস্তারা পিটিয়ে, ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে ওদের তাড়ানো গেছে। কিন্তু জারোয়ারা খুব সম্ভব বুঝে গেছে যতই শূন্যে গুলি ছোঁড়া হোক বা আওয়াজ টাওয়াজ করা হোক, তাদের গায়ে একটা আঁচড়ও কাটা হবে না। তাই ওরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠবে। আজ রিফিউজিরা অনেকটাই সাহস দেখিয়েছে কিন্তু কয়েকজন খুন-জখম হয়ে গেলে তার রি-অ্যাকশন মারাত্মক হয়ে উঠবে। সেজন্যে এখন থেকেই প্রিকশনারি ব্যবস্থা করা দরকার।
‘হেইডা কেমুন কইরা (কেমন করে)?’
‘সুভাষ মজুমদারকে আনাতে হবে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। সুভাষ ছাড়া এই সমস্যার সমাধান আর কারও পক্ষে করা ইমপসিবল—’
‘কুন সুভাষ মজুমদারের কথা কইতে আছেন–অ্যানথ্রোপলিক্যাল ডিপার্টমেন্টের কী?’
‘হ্যাঁ, সে ছাড়া আর কে? আন্দামানে সুভাষ মজুমদার ছাড়া ওই নামের আর কেউ আছে বলে আমার জানা নেই। তোমাদের রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্টের কোনও গাড়িটাড়ি কি এখন জেফ্রি পয়েন্টে আছে?
‘না, নাই তো।’
‘কেন থাকে না? কতরকম এমার্জেন্সি ব্যাপার ঘটতে পারে। যখন তখন তেমন কিছু ঘটলে পোর্টব্লেয়ারে যাওয়া বা খবর দেওয়া দরকার। তোমাদের কর্তা বিশ্বজিৎ রাহাকে বলে পার্মানেন্টলি এখানে একটা গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করবে।’
‘কাকা, আপনে যদিন রাহা সাহেবরে কইয়া দ্যান, তাইলে কামটা তরতরি অইয়া যাইব।‘
‘আমি বাইরের লোক, এসব তো মেনলি তোমাদের পুনর্বাসন ডিপার্টমেন্টের কাজ। বিশেষ করে তুমি হলে এই জেফ্রি পয়েন্টের কর্তা। তোমারই করা উচিত।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।