বিনয় চিন্তাগ্রস্তের মতো তাকিয়ে থাকে। জারোয়াদের সমস্যাটা কিভাবে সামলানো যাবে, সে সম্বন্ধে তার কোনও ধারণাই নেই।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, ‘মোহনবাঁশিকে যখন তির মারা হয় তোমাকে অনুরোধ করে বিশু আর আমি বলেছিলাম, খবরটা যেন তোমাদের পেপারে না বেরোয়। তুমি বুঝতে পেরেছিলে নিউজটা বেরুলে কলকাতা তোলপাড় হয়ে যাবে। লেফট পার্টিগুলো একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আন্দামানে। রিফিউজি নিয়ে আসা অসম্ভব হয়ে পড়ত। উদ্বাস্তুদের বৃহত্তর স্বার্থে তুমি মোহনবাঁশির রিপোর্টটা পাঠাও নি। কিন্তু প্রচুর লোক যদি হতাহত হয় সেই খবর চেপে রাখা অসম্ভব। আমরা তোমাকে। বার বার এমন খবর গোপন রাখতে অনুরোধ করতে পারি না। তাছাড়া তুমি না জানালেও খবরটা লুকনো থাকবে না। কোনও না কোনওভাবে মেনল্যাণ্ডে সেটা পৌঁছে যাবে। জারোয়ারা বড় আকারে হামলা চালানোর আগেই এর একটা বিহিত করতে হবে।’ বলে জানলার বাইরে দূরমনস্কর মতো তাকিয়ে রইলেন। এ বিনয় লক্ষ করছিল। শেখরনাথ যে জারোয়া হামলার আশঙ্কায় প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন এবং জারোয়াদের গায়ে একটা টোকা না মেরেও কিভাবে তাদের ঠেকানো যায় সেই ভাবনায় ডুবে আছেন, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। নিঃশব্দে বসে থাকে বিনয়। আন্দামানে আসার পর থেকে সে একজন নিস্পৃহ সাংবাদিক হয়ে থাকতে পারে নি। এখানকার উদ্বাস্তুদের সুখদুঃখ বর্তমান ভবিষ্যতের সঙ্গেও যেন আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। তার নিজের ভেতরেও যে প্রবল উৎকণ্ঠা চলছে সেটা টের পাচ্ছিল বিনয়।
হঠাৎ শেখরনাথ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।–’চল তো বিনয়, দেখি উদ্বাস্তুরা চা রুটি টুটি খেয়ে জমিতে চলে গেছে কিনা–’
দু’জনে যখন বাইরে বেরুবার জন্য পা বাড়িয়েছেন সেই সময় ক্যানেস্তারা পেটানোর তীব্র আওয়াজে জেফ্রি পয়েন্টের প্রায় নিঝুম সকালের নৈঃশব্দ্য খান, খান হয়ে গেল।
‘সর্বনাশ। জারোয়ারা নিশ্চয়ই কলোনির দিকে আসতে শুরু করেছে। ঠিক খবরই দিয়েছিল মাসুদ জগপতরা। চল চল, দেখি উদ্বাস্তুরা মাঠে চলে গেল কিনা—’
বাইরে যেতেই চোখে পড়ল, না উদ্বাস্তুরা এখনও মাঠে গিয়ে কাজ শুরু করে নি। লাইন দিয়ে পুনর্বাসনের কর্মীদের কাছ থেকে সকালের খাবার চা রুটি নিচ্ছে। পরিতোষ অন্যদিনের মতো এই খাদ্য বিতরণ তদারক করছিল। কান ফাটানো ক্যানেস্তারার আওয়াজে খাবার দেবার প্রক্রিয়াটা বন্ধ হয়ে গেল।
পুনর্বাসন আর বন দপ্তরের কর্মীরা বুশ পুলিশের এই আওয়াজ করার কারণটা জানে। উদ্বাস্তুরাও এতদিনে জেনে গেছে।
শেখরনাথ লম্বা লম্বা পায়ে প্রায় দৌড়েই পরিতোষদের কাছে চলে এলেন। তার পেছন পেছন বিনয়ও। তার চোখে পড়ল উদ্বাস্তুদের মুখগুলো ভয়ে ছাইবর্ণ হয়ে গেছে। দিশেহারার মতো তারা উত্তর দিকে তাকিয়ে আছে। চা-রুটি নেবে কি, আতঙ্কগ্রস্তের মতো নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে, ‘আবার জারো (জারোয়া) আইতে আছে। আমরা এইবার শ্যাষ।
শেখরনাথ তাদের বললেন, ‘ভয় পেও না। আজ কেউ জমিতে যাবে না।–পরিতোষ, লা ডিন, ধনপত, বিস্কুট আর গুড়ো দুধের ফাঁকা টিনের বাক্স আছে না? বিদেশ থেকে অনেক চ্যারিটেবল অর্গানাইজেশন টিনের বাক্স বোঝাই করে পাউডার মিল্ক বিস্কুট ইত্যাদি নানা ধরনের শুকনো খাবার আন্দামানে উদ্বাস্তুদের জন্য পাঠায়। সেগুলোর কথাই জিগ্যেস করলেন শেখরনাথ।
পরিতোষ বলল, ‘মেলা (অজস্র)।’
‘সেগুলো বের করে এনে লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকো। মাসুদরা ক্যানেস্তারা পেটাচ্ছে, তোমরাও পেটালে জারোয়ারা পালিয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি কর—’
পুনর্বাসনের কর্মীরা দৌড়ে ব্যারাকের পেছন দিকের গুদাম থেকে কুড়ি পঁচিশটা টিনের বাক্স নিয়ে এল। জঙ্গলে-ঘেরা জেফ্রি পয়েন্টের সব জায়গাতেই গাছের ডালপালার টুকরো পড়ে আছে। সেগুলো তুলে কর্মীরা সমানে টিন পেটাতে শুরু করল। ভয়ার্ত উদ্বাস্তুরা প্রথমটা কুঁকড়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর দু-চারজন কী ভেবে ফাঁকা ক’টা টিন তুলে বেপরোয়া কাঠের টুকরো দিয়ে পিটিয়ে চলল। হয়তো তাদের মনে হয়েছে, জেফ্রি পয়েন্টের এই উপনিবেশ থেকে তো আর কলকাতায় ফিরে যাওয়ার উপায় নেই। জারোয়ারা যে কোনও দিন, যে কোনও মুহূর্তে হানা দিতে পারে। তাদের গায়ে হাত ঠেকানো যাবে না; রেহাই পাওয়ার একমাত্র উপায়ে নানারকম বিকট আওয়াজ করে, ভয় পাইয়ে জারোয়াদের ফের জঙ্গলে পাঠিয়ে দেওয়া।
বুশ পুলিশরা ক্যানেস্তার পেটাচ্ছে, এদিকে পুনর্বাসনের কর্মী আর উদ্বাস্তুরা ফাঁকা টিন পেটাচ্ছে। প্রচণ্ড আওয়াজ তিন দিকের পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে প্রবল প্রতিধ্বনি তুলছে।
উত্তর দিকে যতদূর জঙ্গল ফেলিং হয়েছে আর যেখানে বুশ পুলিশের উঁচু টঙগুলো দাঁড়িয়ে আছে সেই পেরিমিটার রোড অবধি এখানকার ব্যারাকগুলোর পাশ থেকে মোটামুটি দেখা যায়। হঠাৎ চোখে পড়ল কালো কালো খর্ব চেহারার পঞ্চাশ ষাটজনের এক দঙ্গল জারোয়া তির-ধনুক নিয়ে ওধারের জঙ্গল বেরিয়ে এসে দু’দিক থেকে এত আওয়াজে ভড়কে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদিকে টঙের মাথা থেকে বুশ পুলিশের দলটা ক্যানেস্তারা বাজাতে বাজাতে সমানে চিৎকারে করে চলেছে, ‘হোঁশিয়ার হোঁশিয়ার—’ তারপরই ওদের মধ্যে দু-একজন আকাশের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে সমানে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করতে লাগল। টিন-ক্যানেস্তারা পেটানোর শব্দের সঙ্গে বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ- সব মিলিয়ে এক তুলকালাম কাণ্ড।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।