.
শেখরনাথের প্রবল অনিচ্ছা এবং আপত্তি সত্ত্বেও জেফ্রি পয়েন্টের উত্তর দিকের জঙ্গল ফেলিং চলছেই। অরণ্য নির্মূল করে উদ্বাস্তু উপনিবেশের জন্য প্রচুর জমি চাই।
জঙ্গল যত কাটা হচ্ছে, কাল্পনিক পেরিমিটার রোডও ততই পিছিয়ে যাচ্ছে। বুশ পুলিশের উঁচু উঁচু টঙগুলোও খুলে নিয়ে যতদূর পর্যন্ত জমি উদ্ধার হচ্ছে তার প্রান্তে নিয়ে বসানো হচ্ছে। আরও যত জমি উদ্ধার হবে সেইমতো টঙগুলোও সরিয়ে নেওয়া হবে।
একদিন সকালবেলায়, তখনও জেফ্রি পয়েন্টের ব্যস্ততা শুরু হয় নি, কমন কিচেনে চা তৈরির আয়োজন চলছে, শেখরনাথ আর বিনয় তাদের ঘরে বসে কথা বলছিল।
শেখরনাথ বললেন, ‘আমার ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে বিনয়!’
বিনয় অবাক হল।–’কিসের দুশ্চিন্তা কাকা?’
‘যেভাবে উত্তর দিকে বেপরোয়া জঙ্গল কাটা হচ্ছে তাতে জারোয়াদের মধ্যে প্রচণ্ড রি-অ্যাকশন হবে। আমি বহুকাল আন্দামানে আছি। ওখানকার ট্রাইবালদের, বিশেষ করে জারোয়াদের মতিগতি ঠিক বুঝতে পারি। আগেও উদ্বাস্তুদের ওপর বারকয়েক হামলা হয়েছিল। তাতে মোহনবাঁশি তো মরতে বসেছিল। আমার ধারণা, এবার খুব বড় রকমের অ্যাটাক ওরা করবে।‘
বিনয় কী উত্তর দিতে যাচ্ছিল তার আগেই বুশ পুলিশের দু’জন তাগড়াই চেহারার সিপাই এসে হাজির। তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক এবং দুর্ভাবনার ছাপ। শেখরনাথ এদের চেনেন। ওরা হল মাসুদ জান আর জগপত সিং।
দরজার সামনে তারা দাঁড়িয়ে ছিল। হাতের ইশারায় দু’জনকে ঘরের ভেতর ডেকে দুটো বেতের চেয়ার দেখিয়ে বললেন, ‘বোসো। হঠাৎ নজরদারি ছেড়ে টঙের মাথা থেকে চলে এলে যে! কিছু গোলমাল হয়েছে?
বুশ পুলিশরা পালা করে দিনরাত পেরিমিটার রোড বরাবর টঙগুলোর ওপর বন্দুক আর ক্যানেস্তারা নিয়ে জারোয়াদের ওপর নজরদারি চালায়। একেকটা দলের আট ঘন্টা করে ডিউটি। এইভাবে তিন শিফটে তিনটে দল জারোয়াদের গতিবিধির ওপর লক্ষ্য রাখে। যদি আন্দামানের এই হিংস্র, আদিম বাসিন্দাদের জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তু কলোনির দিকে আসতে দেখে তক্ষুনি ক্যানেস্তারা পিটিয়ে তুমুল শোরগোল তোলে। তাতে ঘাবড়ে গিয়ে জারোয়ারা আর উদ্বাস্তুদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় আসে না; উত্তর দিকের গভীর অরণ্যে পালিয়ে যায়। কখনও যদি আসার চেষ্টা করে আকাশের দিকে বন্দুক উঁচিয়ে বার বার ফাঁকা আওয়াজ করে। বন্দুক যে মারাত্মক বিপজ্জনক বস্তু তা অরণ্যবাসী জারোয়ারাও জানে। তারা তখন চিৎকার করতে করতে পালিয়ে যায়। ভারত সরকারের কঠোর নির্দেশ আছে–বুশ পুলিশ ফাঁকা আওয়াজ করতে পারে কিন্তু কোনওভাবেই যেন জারোয়াদের তাক করে গুলি না চালায়। জনজাতি সংরক্ষণের নীতি নেওয়া হয়েছে সরকারি স্তরে। শুধু আন্দামানের জারোয়া, ওঙ্গে আর সেন্টিনালিজদেরই নয়, দেশের যেখানে যত উপজাতি আছে তাদের নিজস্ব পরিবেশে সবরকম নিরাপত্তা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এসব বিনয়ের অজানা নয়।
মাসুদ জান বলল, ‘চাচাজি বহোৎ বুরা খবর—’
‘কিসের খারাপ খবর?’
মাসুদ জান জানায়, জারোয়ারা ক’দিন ধরে পেরিমিটার রোডের কাছাকাছি যখন তখন চলে আসছে। দু-চারজন নয়। শ’য়ে শ’য়ে। মাসুদদের মনে হচ্ছে যে কোনও সময় তারা রিফিউজি কলোনিতে হানা দেবে।
শেখরনাথের কপালে ভাঁজ পড়ল। বললেন, ‘মহা বিপদ।‘
‘আমাদের কী করা দরকার চাচাজি?’
‘হুঁশিয়ার থাকো। আর ওদের দেখলেই জোরে জোরে ক্যানেস্তারা বাজাবে, হল্লা করবে, তেমন বুঝলে ব্ল্যাঙ্ক ফায়ারও করবে। দেখো ওদের গায়ে গুলি টুলি না লাগে—’
জগপত সিং বলল, ‘ইয়াদ আছে চাচাজি। লেকিন ইয়ে জারুয়ালোগ বহোৎ খতরনাক। ওদের জঙ্গল খতম করে রিফুজরা গাঁও বসাতে আসছে, এটা ওরা মানতে চাইছে না। জোর গু হুয়া উনলোগনকা। ওদের সামলানো বহোৎ বহোৎ মুশিবত।‘
আস্তে আস্তে মাথা নাড়লেন শেখরনাথ। চিন্তাগ্রস্তের মতো বললেন, ‘ঠিকই বলেছ। কিন্তু যেভাবে হোক সামলাতে হবেই। ডিউটি ছেড়ে অনেকক্ষণ এসেছ। তাড়াতাড়ি চলে যাও। ভেবে দেখি কী করা যায়—’
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর শেখরনাথ থমথমে মুখে বললেন, ‘বিনয়, আমি ঠিক এই ভয়টাই করেছিলাম। বিশুকে, চিফ কমিশনারকে এত করে বোঝালাম, জেফ্রি পয়েন্টের উত্তর দিকে যেটুকু জঙ্গল কাটা হয়েছে সেই পর্যন্তই থাক। বিশু অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বড় অফিসার হলেও তার কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নেই। চিফ কমিশনারই আন্দামান নিকোবর আইল্যাণ্ডের সর্বেসর্বা। কিন্তু তিনি কিছুতেই শুনলেন না। উত্তর দিকের জঙ্গল কাটা আগে থেকেই নাকি স্থির হয়ে আছে। জঙ্গল রিক্রম না করলে ইস্ট পাকিস্তানের ডিসপ্লেসড পীপলের পুনর্বাসন হবে কী করে? সংকট দু’দিকের। জঙ্গল কাটলে জারোয়ারা খেপে উঠছে। না কাটলে পুনর্বাসন ধাক্কা খাবে। খবর পেয়েছি দু’মাস পর কলকাতা থেকে আরও দু’শো ফ্যামিলি আসছে।
বিনয় বলল, ‘হ্যাঁ। এটা বিরাট সমস্যা।
‘ভেবে দেখ, এর আগে জারোয়ারা হানা দিয়ে মোহনবাঁশিকে প্রায় শেষই করে ফেলছিল। নেহাত তার আয়ু ছিল, আর সময়মতো তাকে আমরা পোর্টব্লেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যেতে পেরেছিলাম, ডাক্তার চট্টরাজ আর টিম ওকে বাঁচিয়ে তুলেছে। মোহনবাঁশি তিরে জখম হওয়ায় এখানকার উদ্বাস্তুরা ভয় পেয়ে তুমুল গোলমাল শুরু করে দেয়। কিছুতেই তারা আন্দামানে থাকবে না। অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তাদের সামলানো গেছে। মাসুদরা যা বলে গেল, তাতে ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে। প্রথম দিকে দু-চারজন জারোয়া হানা দিয়েছে, কিন্তু এখন শয়ে শয়ে জারোয়াকে পেরিমিটার রোডের কাছাকাছি দেখা গেছে। এতগুলো জারোয়া যদি একসঙ্গে তির টির চালায় কত রিফিউজি যে মার্ডার কি ইনজিওরড হবে, ভাবতে সাহস হয় না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।