‘আসলে ব্রিটিশ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের শিরদাঁড়া আতঙ্কে কেঁপে গিয়েছিল। আর্মি, নেভি এবং এয়ার ফোর্সে হাজার হাজার ভারতীয় সেনানী এবং অফিসার রয়েছে। সুভাষচন্দ্রের অনুপ্রেরণায় তারা যদি ব্যাপকভাবে বিদ্রোহ ঘটায়, সেই সঙ্গে আসমুদ্র হিমাচল সাধারণ মানুষেরা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে, ইংরেজ দশদিনও ভারতের মাটিতে টিকে থাকতে পারবে না। চাটিবাটি গুটিয়ে যে কলোনি তাদের জন্য সোনার ডিম পাড়ে সেটি পেছনে ফেলে জাহাজ কি প্লেনে উঠে চিরকালের মতো পালাতে হবে। দেশবাসীর দুর্ভাগ্য সুভাষচন্দ্রের অভিযান এবং স্বপ্ন সফল হয়নি। যদি হত তবে দেশভাগ করে স্বাধীনতা আসত বলে আমার মনে হয় না। এই সাম্প্রদায়িক ভাগ-বাঁটোয়ারা তিনি কিছুতেই মেনে নিতেন না। ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাস কিভাবে লেখা হত, আমার জানা নেই।
দীর্ঘ সময় অবিরল বলে যাওয়ার পর চুপ করলেন শেখরনাথ। বিনয় কোনও প্রশ্ন করল না। নীরবে প্রাক্তন বিপ্লবীটির দিকে তাকিয়ে রইল।
একসময় গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেখরনাথ বললেন, ‘যা সর্বনাশ ঘটার তা তো ঘটেই গেছে। আচ্ছা বিনয়, তুমি কি জানো, নেতাজি সুভাষচন্দ্র একটি ভাষণে কী বলেছিলেন?’
কোন ভাষণটির কথা শেখরনাথ বললেন, সে বিনয় বুঝতে পারছিল না। সে নীরবে তাকিয়ে থাকে।
শেখরনাথ তাকে লক্ষ করেন নি। আপন মনেই বলতে লাগলেন, ‘দেশ স্বাধীন হলে কিভাবে সেটা গড়ে তোলা হবে তার একটা রূপরেখা অনেক আগেই তিনি ভেবে রেখেছিলেন। স্বাধীন ভারতের ভিত্তি হবে গণতন্ত্র, জাতীয় ঐক্য, অর্থনীতিকে নতুন করে গড়ে তোলা। তিনি চেয়েছিলেন প্রতিটি দেশবাসীর জন্য সামাজিক ন্যায়, চেয়েছিলেন সাম্প্রদায়িকতা, জাতিভেদ এবং অস্পৃশ্যতা-মুক্ত পরিবেশ। চেয়েছিলেন দেশের ঐশ্বর্য শুধু হাতে-গোনা কয়েকজনের হাতে না চলে যায়, তার ভাগ যেন সমানভাবে এদেশের মানুষ পায়। সমাজতন্ত্রের কথাও তাঁর মাথায় ছিল। তবে সেই সমাজতন্ত্র মার্ক্সের বই থেকে উঠে আসা কমিউনিজম নয়; রাশিয়ার অন্ধ অনুকরণও নয়। এই দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি,সমাজব্যবস্থা থেকেই তা উঠে আসবে। তার একটা স্বপ্ন সফল হয়নি। তাঁর দ্বিতীয় স্বপ্নটা সার্থক হবে কিনা, ভবিষ্যতেই তা বলতে পারবে।’ একটু থেমে বললেন, ‘অনেক রাত হয়ে গেল; এবার শুয়ে পড়।’
আলো নিবিয়ে শুয়ে পড়েছে দু’জনে। বাইরে রাত ঝিম ঝিম করছে। বিনয় কিন্তু ঘুমোত পারল না। পাশের বিছানায় শুয়ে থাকা সর্বত্যাগী বিপ্লবীটির অন্তর্লীন দুঃখ, বেদনা, ক্ষোভ, স্বপ্নভঙ্গের আক্ষেপ তার বুকের ভেতরটা খানিক দূরের সমুদ্রের মতো অবিরাম আলোড়নে উথালপাতাল হয়ে যেতে লাগল।
.
৪.১৮
জেফ্রি পয়েন্টের দিনগুলো বাঁধা রুটিনে কেটে যাচ্ছে। একটা দিন যেন আরেকটা দিনের হুবহু কার্বন কপি। সকালে ঘুম ভাঙার পর এখানে কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে যায়। উদ্বাস্তুরা সমুদ্রের ধারে ম্যানগ্রোভের ঝোঁপের আড়ালে প্রাকৃত কর্মটি সেরে, মুখটুখ ধুয়ে চা আর বাসি রুটি গুড় খেয়ে যে যার জমিতে চলে যায়। বনতুলসীর উদ্দাম ঝোঁপ, আগাছার ঝাড় বা ছোট ছোট গাছগুলো কাটা, মাটির তলায় অন্য যেসব বুনো গাছের শিকড়বাকড় ছড়িয়ে আছে সেগুলো উপড়ে ফেলা। দুপুরে সূর্য মাথার ওপর উঠে এলে এবেলার মতো কাজ শেষ। ক্লান্ত ছিন্নমূল মানুষগুলো তখন ফিরে এসে সমুদ্রে চান টান সেরে খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয়। তারপর আবার জমিতে গিয়ে ঝোঁপঝাড় সাফাই সেই সূর্যাস্ত অবধি। এর কোনও হেরফের নেই।
চিরকাল পুনর্বাসন দপ্তরের ব্যারাকে থেকে সরকারি লঙ্গরখানায় চারবেলা খেয়ে ইহজীবন কাটিয়ে দেওয়া চলবে না। জমি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চৌরস করে চাষের উপযোগী করতে হবে। শুধু তাই নয়, নিজের নিজের জমির একধারে প্রতিটি পরিবারকে বাড়িও তুলে নিতে হবে। রিহ্যাবিলিটেশন ডিপার্টমেন্ট এই বাবদে সবরকম সহায়তা দেবে। কিন্তু অনন্তকাল তো এমনটা চলতে পারে না। মূল কথাটা হল উদ্বাস্তুদের স্বয়ম্ভর হতে হবে। ফসল ফলিয়ে, ঘরবাড়ি বানিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে নিজেদের জন্মভূমি থেকে বহুদূরের এই দ্বীপে নিজেদের পায়ে তাদের দাঁড়াতে হবে। পরনির্ভর নয়, স্বাধীন স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে। সরকারের তরফ থেকে সেটাই তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই নির্দেশমতোই উদ্বাস্তুরা দিনভর খেটে চলেছে। পরিশ্রমে তাদের লেশমাত্র গাফিলতি নেই। তারাও স্বাবলম্বী হতে চায়।
কিন্তু বঙ্গোপসাগরের এই দ্বীপপুঞ্জে যেখানে চারিদিকে সমুদ্র, পাহাড়, হাজার বছরের অরণ্য সেখানে সমস্ত কিছুই তো মসৃণ নয়। হিংস্র জারোয়ারা আছে, সমুদ্রে হাঙর আছে, তা ছাড়া উদ্বাস্তুদের নিজেদের মধ্যেও ঝগড়াঝাঁটি কোন্দল আছে। নানারকম সমস্যা। তবু তারই মধ্যে সূর্য-ওঠে, সূর্যাস্ত হয়। প্রাকৃতিক নিয়মে একটা দিনের পর আরেকটা দিন আসে। এই নিয়মের হেরফের নেই।
শেখরনাথ এবং বিনয়ের দৈনিক নির্ঘন্ট প্রায় একইরকম। সকালে উঠে চাটা খেয়ে উদ্বাস্তুদের জমির পর জমিতে ঘুরে বেড়ানো। যাতে নিজেদের মধ্যে ছিন্নমূল মানুষগুলো কোনওরকম হুজ্জত না বাধায় সেদিকে সতর্ক নজর শেখরনাথের। তিনি চান যত দ্রুত সম্ভব পূর্ববাংলার সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর জন্য এই উপনিবেশ গড়ে উঠুক। নির্বিঘ্নে, সুষ্ঠুভাবে। যদি কোনও সংকট দেখা দেয় তিনি তাদের পাশেই থাকবেন। বিনয়ের ভূমিকা পুরোপুরি দর্শকের। বা পর্যবেক্ষকের। সারাদিনে সে যা দেখে, যেসব অভিজ্ঞতা হয়, রাত্রে ‘নতুন ভারত’-এর জন্য সেই সব মালমশলা দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে। তারপর শেখরনাথের সঙ্গে দেশের অতীত বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেক রাত অবধি নানা আলোচনা। বহুজনের হিতে যে বিপ্লবীটি তার শেষজীবনটি সঁপে দিয়েছেন তাঁর কাছ থেকে কত কিছু শোনা যায়, কত কিছু শেখা যায়। এই মানুষটি প্রতিদিন একটু একটু করে বিনয়ের চিন্তাভাবনাকে সমৃদ্ধ করে তুলছেন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।