‘সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার, একসময় সুভাষচন্দ্র যখন কংগ্রেস ছেড়ে চলে আসেন নি, তিনি এবং জওহরলাল, দু’জনেই ছিলেন যুব ফ্রন্টের নেতা। এঁদের ঘিরেই তরুণ ভারত স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল। দু’জনের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব।
‘জওহরলাল কোথায় সুভাষচন্দ্র এবং তার আজাদ হিন্দ বাহিনীকে স্বাগত জানাবার জন্যে সারা দেশ জুড়ে আন্দোলনের ডাক দেবেন, তা নয়। সুভাষের ভারত-অভিযানকে কংগ্রেস এবং দেশের অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর মতো একেবারেই পছন্দ করলেন না। অন্য সব জননেতা তো বটেই জওহরলালও তার মতামত স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন। সুভাষ বাহিনী ভারতে প্রবেশ করুক তিনি তা চান না।
‘অ্যালায়েড ফোর্স কিন্তু আজাদ হিন্দ ফৌজকে রুখতে পারে নি, দেশের ভেতর বহুদূর পর্যন্ত চলে এসেছিল এই বাহিনী। কোহিমার কাছাকাছি ময়রাঙে এসে জাতীয় পতাকা তুলেছিল। বিনয়, তুমি জাহাজ থেকে নেমে পোর্টব্লেয়ারে এসেই জানতে পেরেছিলে, এবারডিন মার্কেটের কাছে জিমখানা ময়দানেও জাপবাহিনীর সঙ্গে সুভাষচন্দ্র চলে এসেছিলেন। এখানেও জাতীয় পতাকা তুলেছেন। সেলুলার জেল দেখাতে দেখাতে সেদিন তোমাকে বলেছি সেখানেও সুভাষ এসেছিলেন। তিনি জাতীয় পতাকা তুলে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণও দিয়েছেন। যেসব ইংরেজ এখানে ছিল তারা কুকুরের মতো পালিয়ে গিয়েছিল। জাপান সরকার তাদের ফৌজ কিছুদিন এখানে রাখলেও সুভাষচন্দ্রকেই এই দ্বীপপুঞ্জের পূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। নিশ্চয়ই ভুলে যাও নি।’
বিনয় আস্তে মাথা নাড়ল–‘না। এই ইতিহাস কি ভোলা যায়?’
‘সুভাষ দু-তিনদিনের বেশি এখানে থাকতে পারেন নি। মণিপুর কোহিমা ফ্রন্টের দিকে তাকে চলে যেতে হয়েছিল। দেশের মাটিতে এই তার শেষ পদার্পণ। বিশাল ব্রিটিশ কলোনির সামান্য একটু অংশকে কিছুদিনের জন্যে অন্তত তিনি স্বাধীন করতে পেরেছিলেন। দেশের তখনও ঘুম ভাঙে নি। কিংবা বলা যায়, দেশনেতারা একরকম নীরবই ছিলেন।
‘জাতির চরম দুর্ভাগ্য, আজাদ হিন্দ ফৌজের পরাজয় ঘটে। তার কারণ রণকৌশলের ত্রুটি বা বাহিনীর উদ্যম এবং দেশপ্রেমের অভাব নয়। জাপান বর্মা অবধি এসেও আর এগুতে পারেনি, মিত্রশক্তি তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এই প্রচণ্ড প্রত্যাঘাত জাপানের পক্ষে সামলানো সম্ভব হয়নি। তাদের রিট্রিট অর্থাৎ পিছু হটতে হয়েছিল। এই অবস্থায় আজাদ হিন্দ ফৌজকে সাহায্য করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। পেছন থেকে অস্ত্রের সাপ্লাই, রি-ইনফোর্সমেন্ট সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। খালি হাতে, খালি পেটে তো যুদ্ধ চালানো যায় না।
‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির অসংখ্য সেনানী আর সেনানায়করা অ্যালায়েড ফোর্সের হাতে ধরা পড়লেন। দিল্লির লালকেল্লায় শাহনওয়াজ, ধীলনদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার শুরু হল। এইবার দেশের টনক নড়ল যেন। সারা ভারতবর্ষ উত্তাল হয়ে উঠল। আজাদ হিন্দের বীর সেনানীদের মুক্তির দাবিতে দিকে দিকে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। তাদের দমন করার জন্যে ইংরেজের পুলিশ গুলি লাঠি তো চালালই, ব্যাপক ধরপাকড়ও শুরু করল। কিন্তু দেশজোড়া বিপুল জনজাগরণকে ঠেকানোর সাধ্য তাদের ছিল না। প্রতিটি ভারতবাসীর মুখে তখন শুধু ‘নেতাজি সুভাষ’ আর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’। একটা ইনফরমেশন দিচ্ছি; শুনলে তুমি অবাক হবে বিনয়। এইসময় সারা দেশের নানা প্রান্তে, এমনকি দক্ষিণ ভারতেও যে শিশুরা জন্মেছে তাদের নামকরণ হয়েছিল সুভাষচন্দ্রের নামে। দেশ কোন চোখে, কী অসীম শ্রদ্ধায় তাঁকে দেখত একবার ভেবে দেখ বিনয়।‘
এটা বিনয়ের জানা ছিল না। কারণ সে তখন পুব বাংলার এক কোণে রাজদিয়ার মতো একটা নগণ্য আধা-গ্রাম আধা-শহরে রয়েছে। প্রকাণ্ড দেশের কতটুকু খবরই বা সেখানে পৌঁছত! অনন্ত বিস্ময়ে সে তাকিয়ে থাকে।
শেখরনাথ বলতে থাকেন, ‘দেশ জুড়ে যে স্বতঃস্ফূর্ত উন্মাদনা তাতে বেগতিক হয়ে পড়লেন কংগ্রেস নেতারা। ভুলভাই দেশাই আর জওহরলাল কালো কোট পরে লাল কেল্লায় ধীলন আর শাহনওয়াজদের মুক্তির দাবিতে সওয়াল করতে নেমে পড়লেন। যাঁরা একদিন সুভাষের আজাদ হিন্দ বাহিনীকে রুখবার জন্যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তাঁরা রাতারাতি বদলে গেলেন। ভাবখানা এই, আজাদ হিন্দ এবং সুভাষের সঙ্গে আমরাও আছি। ভাবা যায়?
‘সুভাষচন্দ্রের কর্মকাণ্ডের ইমপ্যাক্ট কতদূর ছড়িয়ে পড়েছিল চিন্তা করা যায় না। করাচি এবং বোম্বাইতে নৌবিদ্রোহ শুরু হয়ে গেল। ইংরেজ তখন ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ছে। বিদ্রোহ শুধু নেভির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে এমন কোনও কথা নয়। তাদের আতঙ্ক সেটা সেনাবাহিনী এবং এয়ারফোর্সের মধ্যেও যে কোনও মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কংগ্রেস নেতারা, যতদূর মনে হয় প্যাটেল বুঝিয়ে সুঝিয়ে নৌবাহিনীকে শান্ত করলেন। তুমুল আন্দোলন ধীরে ধীরে থেমে গেল। আর কোর্ট মার্শাল করে নেভির কর্তারা শত শত সোনার টুকরো ভারতীয় তরুণ অফিসারকে হত্যা করল। এই নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই, কেউ একটা আঙুল পর্যন্ত তুলল না।
‘সেই সময়ের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেট এটলি একটি সার সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। একটি ভাষণে তিনি বলেছেন, সুভাষচন্দ্র যুদ্ধে জিততে পারেন নি, তার অভীষ্ট পূর্ণ হয়নি, এসব ঠিক কিন্তু তার সামরিক কর্মকাণ্ড ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিতকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। ভারতের স্বাধীনতা একদিন আসত কিন্তু সুভাষের পরাজয় সেটা অনেক এগিয়ে এনেছিল।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।