‘সুভাষচন্দ্রের চরিত্রে স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসকামিতার স্থান ছিল না। এই শব্দটা মনেপ্রাণে অপছন্দ করতেন। কংগ্রেসি রাজনীতির মধ্যে কতরকম যে জটিলতা, কত অদৃশ্য দড়ি টানাটানি, তা মর্মে মর্মে তিনি অনুভব করেছেন।
‘নতুন দল তৈরি করলেন ঠিকই কিন্তু বুঝতে পারছিলেন ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষে থেকে তিনি ব্রিটিশ রাজত্বের বিরুদ্ধে যে ধরনের সংগ্রাম চান সেটা মোটেই সম্ভব নয়। এই সংগ্রামে তিনি সেভাবে সমর্থন পাবেন না, বিশেষ করে সব চেয়ে বড় রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের কাছ থেকে তো বটেই। মুসলিম লিগের অন্য উদ্দেশ্য রয়েছে; তাদের পাশে পাওয়ার কল্পনা নেহাতই দুরাশা। দেশের বিপ্লবী দলগুলোর তখন ছন্নছাড়া, ভাঙাচোরা হাল। একটা দলের সঙ্গে অন্য দলের সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত। তাছাড়া এই সব দলের অজস্র ছেলে তখন জেলে পচছে, হাজার হাজার বিপ্লবীকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মারা হয়েছে। বাকি যারা আছে তারা মানসিক দিক থেকে বিপর্যস্ত।
‘ছোটখাটো আরও বহু পলিটিক্যাল পার্টি তখনও ছিল কিন্তু তাদের মতাদর্শ অন্যরকম। এদের সমর্থন সম্বন্ধে সুভাষ হয়তো সন্দিহান ছিলেন। দেশের ভেতরে থেকে দেশের স্বাধীনতা লাভ সম্পূর্ণ দুরূহ। যা কিছু করতে হবে দেশের বাইরে গিয়ে।’
বিনয় জিগ্যেস করল, ‘সুভাষচন্দ্র কি এসব কোথাও লিখে গেছেন?’
শেখরনাথ বললেন, ‘আমার চোখে তা পড়ে নি। বহু বছর মেনল্যাণ্ড থেকে অনেকদূরে এই আন্দামান দ্বীপে পড়ে আছি। কলকাতা থেকে ক’টা বইই বা এখানে আসে!’
‘তা হলে আপনার এরকম ধারণা হল কিভাবে?’
‘সুভাষচন্দ্রের জীবন, রাজনৈতিক চেতনা, তার স্বাধীনতা লাভের পদ্ধতি, সেই সময়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অন্য পলিটিক্যাল পার্টিগুলোর এজেণ্ডা– এসব লক্ষ করলে তেমনটাই মনে হয়। তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিলেন ব্যাপকভাবে অস্ত্র হাতে তুলে না নিলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে সোনার খনিরূপ ভারতবর্ষের কলোনি থেকে দূর করা যাবে না। তাই—’ বলে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন শেখরনাথ।
খুব মগ্ন হয়ে শুনছিল বিনয়। বলল, ‘তাই কী?’
আনমনা ভাবটা কেটে গেল শেখরনাথের। বিনয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ছদ্মবেশে গোয়েন্দাদের সতর্ক চোখে ধুলো ছিটিয়ে কাবুল হয়ে কয়েকটা দেশ ঘুরে চলে গেলেন জার্মানি; সেখান থেকে সাবমেরিনে জাপান। পুরোদমে তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। জাপানি ফৌজ দুরন্ত গতিতে ভারতের দিকে ধেয়ে আসছে। প্রচারের ভাষায় ব্রিটিশবাহিনী ‘সাকসেসফুল রিট্রিট’ অর্থাৎ সাফল্যের সঙ্গে পশ্চাদপসরণ করছে। সুভাষচন্দ্র এই সুযোগটা নিলেন। গড়ে তুললেন প্রবাসী ভারতীদের, হিন্দু মুসলমান শিখ খ্রিস্টান সবাইকে নিয়ে এক দুর্বার বাহিনী। এদের অনেকে মিত্রপক্ষের সেনাবাহিনীতে ছিল। বাকিদের মিলিটারি ট্রেনিং দিয়ে নেওয়া হয়। গড়ে উঠল আজাদ হিন্দ ফৌজ ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি। মেয়েরাও এগিয়ে এসেছিল; গড়া হল মরণজয়ী নারী বাহিনী। আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রতিটি সেনানীর হৃদয়ে সুভাষচন্দ্র জ্বালিয়ে দিলেন–স্বাধীনতার মশাল। প্রতিটি সৈনিক তখন একেকটি আগুনের শিখা।
‘একটা ফ্রন্ট ধরে জাপ-বাহিনী, অন্য এক ফ্রন্ট ধরে আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনারা অভিযান শুরু করেছে। বিনয়, তুমি কল্পনা করতে পার, সুভাষচন্দ্র তাঁর অনুগামী সব সৈনিকের জন্যে ‘কমন কিচেন’-এর ব্যবস্থা করেছিলেন। শিখ হিন্দু মুসলিম সবাই পাশাপাশি বসে খেত। ভারতের আর কোনও রাজনৈতিক দল বা জননেতা কি এটা করতে পেরেছিলেন? আমার জানা নেই। তার সেনাদের মর্মে এই বার্তাটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু পৌঁছে দিয়েছেন, স্বাধীনতার চেয়ে বড় কিছু নেই। ধর্ম নিজস্ব ব্যাপার। আই এন এর প্রতিটি সৈনিক ভাবত প্রথমে তারা ভারতবাসী, তারপর হিন্দু, মুসলিম, শিখ বা খ্রিস্টান। মাতৃভূমির মুক্তি তাদের ফার্স্ট প্রায়োরিটি। দেশের মানুষকে একসূত্রে আর কেউ কি এভাবে গাঁথতে পেরেছেন, পেরেছেন কি তাদের পরস্পরের এত কাছে নিয়ে আসতে? আমার জানা নেই।
‘একদিন সচকিত ভারতবর্ষ শুনতে পেল সেই অবিস্মরণীয় কণ্ঠস্বর, ‘আমি সুভাষ বলছি—’ তারপর দেশবাসীকে আহ্বান জানালেন, এই মুক্তিযুদ্ধে তারাও যেন যুক্ত হয়। গান্ধিজি, জওহরলাল থেকে বড় বড় জননায়কদের তিনি আবেদন জানালেন এই সুবর্ণসুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়। ইউরোপে আফ্রিকায় এশিয়ায় চারিদিকে মিত্রশক্তি, বিশেষ করে ইংরেজ বাহিনী বেধড়ক মার খাচ্ছে, জার্মান বোমায় লণ্ডনের সিকি ভাগ ধ্বংস হয়েছে, পৃথিবী-জোড়া সাম্রাজ্যের গরিমা যাদের, তাদের অর্থনীতি চুরমার হতে চলেছে, দু’শো বছরের দম্ভ চুপসে গেছে, এই সময় যদি ভারতের ভেতর তুমুল আন্দোলন শুরু করা যায়, ব্রিটিশ গভর্ণমেন্ট স্বাধীনতা দিতে বাধ্য।
‘সারা দেশ জুড়ে তখন শিহরন। প্রবল উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা সুভাষচন্দ্রের ডাকে সাড়া তো দিলেনই না, উলটে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানালেন। একদল বলল, সুভাষচন্দ্র ফ্যাসিস্ট শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। তিনি তোজোর কুকুর। কুইসলিং। জাপানিদের ডেকে এনে ফ্যাসিস্টদের হাতে দেশকে তুলে দিতে চান। অথচ সেকেন্ড গ্রেট ওয়ারে ইম্পিরিয়ালিস্ট ব্রিটেনের সঙ্গে রাশিয়া যখন হাত মেলায় তখন সেটাকে পিপলস ওয়ার বলা হয়।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।