প্রাক্তন বিপ্লবীর বেদনার্ত কণ্ঠস্বর আন্দামানের দূর প্রান্তে জেফ্রি পয়েন্টের একটি ঘর থেকে বাইরে ছড়িয়ে পড়ল। নিঝুম রাতে চারিদিকের পাহাড়ে জঙ্গলে তার প্রতিধ্বনি হতে লাগল।
.
৪.১৭
একদিন রাত্রে সুভাষচন্দ্রের কথা উঠল।
সারাদিন উদ্বাস্তুদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন শেখরনাথ। তাদের কাজকর্মের তদারক করেন। যদি কারও কোনও সমস্যা দেখা দেয় তার সুরাহা করে দেন। পুনর্বাসন দপ্তর এবং বনবিভাগের অজস্র কর্মী রয়েছেন। তবু শেখরনাথের মনে হয়, দেশ থেকে উৎখাত হয়ে আসা এই মানুষগুলোর সমস্ত দায়িত্ব তারই। অপার মায়ায় তিনি যেন তার শেষ জীবনের সঙ্গে এই মানুষগুলোকে জড়িয়ে নিয়েছেন।
কিন্তু রাত্রিবেলা জেফ্রি পয়েন্ট যখন নিশুতিপুর সেই সময় দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কদের আত্মত্যাগের নানা কাহিনি শোনান শেখরনাথ। আজ বললেন, ‘দেশভাগের কথা উঠলেই সুভাষচন্দ্রকে আমার বিশেষ করে মনে পড়ে।’
বিনয় রীতিমতো অবাক হল।–-‘এ আপনি কী বলছেন কাকা! পার্টিশনের সময় নেতাজি তো দেশেই ছিলেন না। এমন একটা প্রচার করা হয়েছে যে পার্টিশনের অনেক আগেই প্লেন ক্র্যাশে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।’
শেখরনাথ বললেন, ‘নেতাজির এই মৃত্যুর রটনাটা বড়ই রহস্য। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষের বিশ্বাস প্লেন ক্রাশে তাঁর মৃত্যু হয় নি। এই মৃত্যুর প্রসঙ্গ থাক। আমার আশা একদিন না একদিন এই রহস্য ভেদ করে আসল সত্যটা বেরিয়ে আসবে।’
বিনয় চুপ করে রইল।
শেখরনাথ বলতে থাকেন, ‘দেশের জন্যে সুভাষচন্দ্রের অবদানের কথা একবার ভাবো। আই সি এস হওয়ার পর পরম আরামে তিনি বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু নিজস্ব সুখ স্বাচ্ছন্দ্য আরাম কেরিয়ারের কথা ভাবেন নি সুভাষ। অবশ্য স্বীকার করতেই হবে গান্ধিজি, জওহরলাল, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, জে এম সেনগুপ্ত থেকে রাজেন্দ্রপ্রসাদ, সর্দায়, প্যাটেল এমন বিরাট বিরাট জননায়করা কেউ ক্ষুদ্র স্বার্থের কথা ভাবেন নি। দেশই ছিল তাঁদের কাছে টপ প্রায়োরিটি। দেশের স্বাধীনতার জন্যে তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। দেশের কোটি কোটি মানুষকে তারা উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। গান্ধিজির কথা নতমস্তকে মানতেই হবে। তাঁর মত এবং পথের সঙ্গে আমাদের মতো সশস্ত্র বিপ্লবীদের মতাদর্শের মিল নেই। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ভারতে এসে ডান্ডি অভিযান, অসহযোগ আন্দোলন, আইন-অমান্য আন্দোলন, কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলনের ডাক দিয়ে তিনি দেশ জুড়ে যে জনজাগরণ ঘটিয়েছিলেন কে তা অস্বীকার করবে? তিনিই বোধহয় প্রথম দেশনেতা যাঁর ডাকে লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল। গান্ধিজির কথা মাথায় রেখেও বলব নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এ দেশে একজন বিরল জননেতা।’
জিজ্ঞাসু ছাত্রের মতো বিনয় প্রশ্ন করে, ‘কোন দিক থেকে বলছেন?’
‘দেখ, কংগ্রেসের নেতারা প্রায় সবাই ছিলেন আপসকামী। আলাপ-আলোচনা করে, অহিংস আন্দোলন চালিয়ে তারা ইংরেজদের কাছ থেকে স্বাধীনতা ভিক্ষে করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইম্পিরিয়েলিস্টরা কে কবে ভ্যাদভেদে গালগল্প করে বুঝদার সুবোধ বালকের মতো কলোনি ছেড়ে দেয়? বিশেষ করে ইন্ডিয়ার মতো একটা এতবড় কলোনি, যেখানে কত মধু! এ দেশের ওয়েলথ লুট করে ব্রিটিশ এম্পায়ার ফুলে ফেঁপে উঠেছে। মুখের কথায় সেই বিশাল মৌচাক কেউ ছাড়ে! এসব আকাশ কুসুম কল্পনা। স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যে অনেক ফারাক। গান্ধিজি অহিংস নীতিতে বিশ্বাস করতেন। অহিংসাই ছিল তার ধর্ম। আমি সেটা সম্মান করি। কিন্তু তার ডাকা কোনও কোনও আন্দোলন সহিংস, হিংস্র আকার ধারণ করলে তিনি তার রাশ টেনে ধরেছেন। ফলে স্বাধীনতা কবে পাওয়া যাবে সে সম্বন্ধে সংশয় দেখা দিয়েছে। দেশের মুক্তি, আমার মনে হয়, এর ফলে ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছিল।
‘কিন্তু কাকা—’ পুরোটা বলা হল না, দ্বিধান্বিতভাবে থেমে গেল বিনয়।
‘বলো বলো, চুপ করে গেলে কেন?’
‘সুভাষচন্দ্রও তো একসময় কংগ্রেসে ছিলেন।’
‘কী বলতে চাও, বুঝতে পেরেছি। সুভাষ অবশ্যই কংগ্রেসে ছিলেন, গান্ধিজিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। সবই ঠিক। কিন্তু কংগ্রেস নামে প্রতিষ্ঠানটিতে কি তাঁর পক্ষে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা সম্ভব হয়েছে? আগেই বলেছি কংগ্রেসের আপসকামী নীতির সঙ্গে তাঁর মতের মিল হচ্ছিল না। স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি আন-কমপ্রোমাইজিং। এর ফলে তাকে কংগ্রেসের ভেতর থেকেই চরম বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়েছে। পর পর দু’বছর উনিশ শো আটত্রিশ এবং উনচল্লিশে নানা বিরোধিতার মধ্যেও সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, এতটাই ছিল তাঁর জনপ্রিয়তা। কংগ্রেসের প্রেসিডেন্টকে সেই আমলে রাষ্ট্রপতি বলা হত। প্রথমবার তিনি রাষ্ট্রপতি হলেন হরিপুরায়, দ্বিতীয়বার ত্রিপুরীতে। হরিপুরায় সভাপতি হওয়ার পর একটা বছর কোনওরকমে কাটিয়ে দিতে পারলেও ত্রিপুরী কংগ্রেসে ফের জয়ী হয়ে যখন ফের রাষ্ট্রপতি হলেন তখন সংঘাতটা চরমে উঠল। স্বয়ং গান্ধিজি চাইছিলেন, আবার সুভাষচন্দ্র রাষ্ট্রপতি হোন। ত্রিপুরীতে তাঁর মনোনীত প্রার্থী ছিলেন পট্টভি সীতারামাইয়া। সুভাষচন্দ্র নির্বাচিত হলে গান্ধিজি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, ‘সিতারামাইয়াস ডিফিট ইজ মাই ডিফিট।’ নিজের ব্যক্তিগত পরাজয় বলেই সুভাষচন্দ্রের জয়কে ধরে নিয়েছিলেন। সুভাষচন্দ্র যাতে সুশৃঙ্খলভাবে কাজ না করতে পারেন সেজন্যে তার ইঙ্গিতে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির মেম্বাররা সুভাষচন্দ্রের প্রতি অনাস্থা তো প্রকাশ করলেনই, পদত্যাগও করে বসলেন। একজন নির্বাচিত সভাপতির সঙ্গে এমন আচরণ নিঃসন্দেহে খুবই বেদনাদায়ক। কংগ্রেস যে মাত্র একটি মানুষের নির্দেশে চলবে সেটা আগেই স্থির হয়েছিল। তার মনঃপূত নয়, এমন কিছু ঘটলে যাঁর যত সমর্থনই থাক, তাকে তিনি মেনে নেবেন না। হতাশ, মর্মাহত সুভাষচন্দ্রের পক্ষে এত বড় একটা রাজনৈতিক দল চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এমন অসহযোগিতা প্রত্যাশা করেননি সুভাষচন্দ্র। কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তিনি বেরিয়ে এলেন এবং নতুন দল ফরোয়ার্ড ব্লকের প্রতিষ্ঠা করলেন।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।