ইতিহাসের এই জটিল দিকগুলো ততটা জানা ছিল না বিনয়ের। সে অবাক হয়ে শুনে যাচ্ছে। দেশভাগ যে এই প্রাক্তন মুক্তিযোদ্ধা প্রাচীন বিপ্লবীটির হৃদয়ে কতটা ক্ষত সৃষ্টি করেছে, টের পাওয়া যাচ্ছে। কী উত্তর দেবে, ভেবে পেল না বিনয়।
ইতিহাসের সেই মর্মান্তিক ভয়াবহ সময় আজ যেন প্রবলভাবে শেখরনাথের ওপর ভর করেছে। তিনি ভেতরকার চাপা যন্ত্রণা ক্রমাগত উগরে দিতে লাগলেন।–’পাকিস্তান কায়েম হওয়ার পর জিন্না কী ভরসা দিয়েছিলেন? পাকিস্তানের যারা নাগরিক হবে তার ধর্ম যাই হোক, হিন্দু, খ্রিস্টান বৌদ্ধ, শিখ–সবাই নিরাপদে, সসম্মানে থাকতে পারবে। তাদের স্বাধীন ধর্মাচরণে, সামাজিক অনুষ্ঠানে কোনও রকম বাধার সৃষ্টি বরদাস্ত করা হবে না। রাষ্ট্র তার সবরকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে। প্রশাসনের চোখে হিন্দু মুসলিম খ্রিস্টান বা শিখের মধ্যে এতটুকু ভেদাভেদ, বৈষম্য করা হবে না। পাকিস্তানের প্রতিটি মানুষ হবে সেই দেশের সম্মানিত নাগরিক। জিন্নার হয়তো এই রকমই সদিচ্ছা ছিল। কিন্তু বাস্তবে কী দেখা গেল?’
বিনয় মগ্ন হয়ে শুনে যাচ্ছিল। নিজের অজান্তেই তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল—’কী?’
‘পাকিস্তানে মাইনোরিটি কমিউনিটি বিশেষ করে হিন্দু আর শিখরা কি নিরাপদে থাকতে পারল? জিন্না দীর্ঘজীবী হন নি; পাকিস্তান হাসিল করার কিছুদিনের মধ্যেই তার মৃত্যু হয়। বেঁচে থাকতে থাকতেই তিনি দেখে গেছেন পাকিস্তানে যে ভয়ঙ্কর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল তাতে লাখে লাখে হিন্দু এবং শিখ দুই সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। আমার কী মনে হয় জানো?’
‘কী?’
‘জিন্না পাকিস্তান চেয়েছিলেন এবং তাঁর দাবি মতো একটা দেশ আদায়ও করে ছেড়েছিলেন–এসব ঠিক। কিন্তু তিনি কট্টরপন্থী বা গোঁড়া সাম্প্রদায়িক ছিলেন বলে মনে হয় না। কিন্তু মৃত্যুর আগে এমন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যে ফান্ডামেন্টালিস্টদের নিয়ন্ত্রণ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। প্রশাসনের লাগামও তার শীর্ণ শিথিল মুঠি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। তার ফল হয়েছিল এই, লক্ষ লক্ষ মানুষকে সীমান্তের ওপার থেকে এপারে বাস্তুহারা হয়ে চলে আসতে হল। হল কী? এখনও পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু আসার বিরাম নেই। আমার কী মনে হয় জানো?’
উত্তর না দিয়ে বা প্রশ্ন না করে উন্মুখ তাকিয়ে রইল বিনয়।
শেখরনাথ থামেন নি।–’পাকিস্তানে মাইনোরিটি যতকাল আছে এই উদ্বাস্তু স্রোত কখনও থামবে না।
এরপর অনেকক্ষণ নীরবতা।
হঠাৎ একসময় শেখরনাথ একেবারে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন।–’তুমি কি যুগান্তর, অনুশীলন সমিতি, ব্ৰতী সমিতি, স্বদেশ বান্ধব সমিতি, সুহৃদ ও সাধনা সমিতি–এই নামগুলো শুনেছ?’
বিনয় অবাক।–’যুগান্তর আর অনুশীলন সমিতি ছাড়া আর কোনও নাম শুনিনি।‘
‘মাত্র কয়েকটার নাম বললাম। আন-ডিভাইডেড বেঙ্গলে এরকম অজস্র গুপ্ত সমিতি গড়ে উঠেছিল। সবই সশস্ত্র বিপ্লবীদের সংগঠন। অবশ্য পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, ইউ পি এবং আরও কয়েকটা প্রভিন্সেও এমন অনেক সমিতিও অ্যাক্টিভ ছিল। বিপ্লবীরা মনে করত, লক্ষ বছর চরকা কাটলেও কিচ্ছু হবে না। মিনমিনে, ভ্যাদভেদে অহিংস আন্দোলনে দেশের স্বাধীনতা আসবে না। ওসব আকাশকুসুম কল্পনা। ইংরেজদের ঝাড়ে মূলে তাড়াতে হলে বন্দুক পিস্তল ছাড়া উপায় নেই।
‘সারা দেশের কথা থাক। বাংলার কথাই বলি। সবচেয়ে বেশি গুপ্ত সমিতি ছিল বাংলাতেই। হাজার হাজার তাজা তরুণ ইংরেজদের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়ে লড়াই করেছে। ধরা পড়ে জেলখানায় পচে মরেছে, কত প্রাণ যে ফাঁসির দড়িতে শেষ হয়ে গেছে তার সীমাসংখ্যা নেই। এই মৃত্যুঞ্জয়ী শহিদদের ক’জনকে আমরা মনে রেখেছি?’
এই বিপ্লবীদের কথা আগেও কয়েকবার বলেছেন শেখরনাথ। নিঝুম মধ্যরাতে দেশভাগের কথা বলতে বলতে ফের সেই প্রসঙ্গ কেন তুললেন, বিনয় বুঝতে পারছে না। সে অপেক্ষা করতে লাগল।
নিজের ঝোঁকে বলে যেতে লাগলেন শেখরনাথ।–’পাঞ্জাব, ইউ পি, মহারাষ্ট্র–সারা দেশের বিপ্লবীরা স্বাধীনতার জন্যে অনেক স্যক্রিফাইস করেছে। এঁদের সবাইকে প্রণাম জানিয়েও বলব, পাঞ্জাবি আর বাঙালিদের স্যাক্রিফাইসের তুলনা নেই। তার নীট ফলটা কী দাঁড়াল? দুটো প্রভিন্সই দুটুকরো হয়ে গেল। লক্ষ লক্ষ মানুষ জন্মভূমি খেয়াল। লক্ষ লক্ষ মানুষ খুন হল, তাদের ঘরের যুবতী মেয়েদের লুট করে ধর্ষণ করে হত্যা করা হল। বিপ্লবীদের আত্মদানের বিনিময়ে বাঙালি আর পাঞ্জাবিদের কি এটাই প্রাপ্য ছিল বিনয়? দুটো প্রভিন্স এত মূল্য দিল আর স্বাধীনতা নামে ইংরেজরা যা দিয়ে গেল তার সুফলটা ভোগ করছে বাকি ভারত। একটা ব্যাপার লক্ষ কর, বিপ্লবীদের ত্যাগের, আত্মদানের ইতিহাসটাকে আর গুরুত্বই দেওয়া হচ্ছে না। আমার ভয় হয়–’ বলে বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। শেখরনাথ। তারপর শুরু করলেন, আক্ষেপে ক্ষোভে হতাশায় তাঁর কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এল।-–’বিরাট নিঃশব্দ একটা চক্রান্ত চলছে।‘
সবিস্ময়ে বিনয় জিগ্যেস করে, ‘কিসের চক্রান্ত কাকা?’
‘ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে বিপ্লবীদের অবদানের ইতিহাস সম্পূর্ণ মুছে যাবে। ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বাঘা যতীন থেকে উপেন বন্দ্যোপাধ্যায়, উল্লাসকর দত্ত, সাভারকর ব্রাদার্স থেকে সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবর্তীদের তো মাথায় করে রাখা উচিত ছিল। সেই মর্যাদা কি তাদের দেওয়া হচ্ছে? স্বাধীন ভারত ওঁদের ভুলে যাবে, নীরবে অস্বীকার করবে, কোনওদিন কি ভাবা গিয়েছিল?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।