‘ছেচল্লিশের ষোলই আগস্ট জিন্নার ডাকে সারা ভারত জুড়ে যে নিদারুণ দাঙ্গা শুরু হয়েছিল তাতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ খুন হয়েছে, দেশের দুই প্রান্তে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ তাদের চোদ্দপুরুষের বাড়িঘর থেকে উৎখাত হয়েছে। কয়েক লক্ষ তরুণীকে ধর্ষণ এবং অপহরণ করা হয়েছে। বড়লাটের কাছের সাঙ্গোপাঙ্গরা এটাকে তেমন গুরুত্ব দিতেই রাজি হয় নি। নিস্পৃহ মুখে বলেছে, এতবড় একটা দেশ স্বাধীনতা পেতে চলেছে, তার জন্যে এই মূল্যটুকু খুব বেশি নয়। ভাবা যায়? বড়লাট কি এটা জানতেন না? নিশ্চয়ই জানতেন। তবে তার মন্তব্য জানা যায় নি।
‘বেলেঘাটা থেকে সারা দেশের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে বসে থাকা ছাড়া গান্ধিজির হয়তো আর কিছুই করার ছিল না। খালিকুজ্জামান বলেছিলেন, ভারতের ইতিহাসে এটাই সবচেয়ে অন্ধকার সময়। জাতির জনক গান্ধিজিকে আমি কিন্তু এসকেপিস্ট বলতে রাজি নই। এই মহান মানুষটিকে শুধু বলতে পারি ভারতীয় ইতিহাসের খুব সম্ভব সবচেয়ে ট্রাজিক চরিত্র। এটা আমার মত।’
আবার কিছুক্ষণের জন্য ঘরের ভেতর নৈঃশব্দ্য নেমে এল। শুধু অদূরে সেই সমুদ্রগর্জন আর ঝিঁঝিদের কনসার্ট চলছেই। বিরামহীন। রাতজাগা পাখিগুলোর সাড়াশব্দ নেই। খুব সম্ভব তারা এতক্ষণ ডাকাডাকির পর ঘুমিয়ে পড়েছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শেখরনাথ বললেন, ‘জিন্না সেইসময় কঠিন অসুখে ভুগছিলেন। সেটা ইনকিউরেবল ডিজিস। রোগটা মুসলিম লিগের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হয়তো জানতেন। হয়তো বা জানতেন না। সুচতুরভাবে এই রোগের কথা গোপন রাখা হয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলি যে উনিশ শো আটচল্লিশের মাঝামাঝি ভারতের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চেয়েছিলেন, ততদিন অপেক্ষা করলে দেশভাগ হয়তো এড়ানো যেত। কারণ জিন্না বেশিদিন বাঁচেন নি। মৃত্যুর আগে পাকিস্তান কায়েম করার জন্যে তাই অদম্য জেদ ধরেছিলেন। হয়তো অনুমান করেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর পর মুসলিম লিগের পক্ষে পাকিস্তান আদায় করার মতো তাঁর মাপের বিশাল, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন অন্য কোনও নেতা নেই। মৃত্যুর আগে যা করার তাঁকেই করতে হবে। পাকিস্তান তার চাইই চাই। এদিকে কংগ্রেস নেতৃত্বেরও তর সইছিল না। স্থির হয়ে গেল দেশটা ভাগ করেই স্বাধীনতা আসবে। ভারত ভাগ্যবিধাতারও খুব সম্ভব সেই ইচ্ছাই ছিল।’
একটানা বলার পর থামলেন শেখরনাথ। বিনয় অবাক হয়ে ভাবে, সেই কবে বিশের দশকে যাবজ্জীবন কালাপানির দন্ডাদেশ নিয়ে আন্দামানে সাজা খাটতে এসেছিলেন শেখরনাথ। তারপর একদিনের জন্যও ইন্ডিয়ার মেনল্যান্ডে ফিরে যাননি। অথচ দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন বঙ্গোপসাগরের এই সুদূর দ্বীপপুঞ্জে থেকেও দেশের সমস্ত ইতিহাস তার জানা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকে বিনয়।
শেখরনাথ ফের শুরু করলেন, ‘যাই হোক, মাত্র কয়েক বছর আগে কংগ্রেস পূর্ণ স্বরাজের ডাক দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে শুরুর দিকে তা পাওয়া যায়নি। ডমিনিয়ন স্টেটাস নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। কিছুদিন পরেই অবশ্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা এসেছে। এদিকে দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে শাসনভার ভাগ করে দেবার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল পুরোদমে। পনেরোই আগস্ট দেশ স্বাধীন হবে। তার মধ্যে দেশটাকে তো ভাগ-বাঁটোয়ারা করার কাজটা শেষ করা দরকার। তাই জুলাই মাসে স্যার সিরিল র্যাডক্লিফকে লন্ডন থেকে ভারতে উড়িয়ে আনা হল। তার কর্মক্ষমতা সম্পর্ক বড়লাট মাউন্টব্যাটেনের বিরাট আস্থা। কিন্তু ভারত সম্পর্কে পুঁথিগত কিছু ধারণা তার থাকতে পারে, তবে বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধি কতটুকু সে সম্পর্কে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এই লোকটিকেই পাঞ্জাব আর বাংলা ভাগ করে ভারত এবং পাকিস্তানের সীমানা ঠিক করে দেবার দায়িত্ব দেওয়া হল। তিনি হলেন পূর্ব এবং পশ্চিম দু’দিকের বাউন্ডারি কমিশনের চেয়ারম্যান। হাতে দু’মাস কয়েকদিন মাত্র সময়; এর মধ্যে বাংলা আর পাঞ্জাবের কোন কোন ডিস্ট্রিক্ট বা ডিস্ট্রিক্টের কতটা অংশ ভারত আর পাকিস্তান পাবে তা ঠিক করে দিতে হবে। এত বড় একটা দেশ ভাগ হবে, সেজন্য সময় মাত্র দু’মাস। স্বাধীনতার জন্যে এমন একটা অর্বাচীন খামখেয়ালি সিদ্ধান্তও মেনে নিতে হয়েছিল। আশ্চর্য, লিগ বা কংগ্রেসের নেতারা মুখ বুজে তা মেনে নিয়েছিলেন, কেউ সামান্য আপত্তি পর্যন্ত করেন নি। এমন একটা ভবিতব্যের কথা কে ভাবতে পেরেছিল?’
একটু থেমে শেখরনাথ আবার শুরু করলেন, ‘র্যাড ক্লিফ মাউন্টব্যাটেনের পরম আস্থাভাজন। আমি যতদূর জানি এই ধুরন্ধর ইংরেজটি আগে আর কখনও ভারতে আসেননি। নতুন দায়িত্ব পেয়ে টেবিলে ইন্ডিয়ার ম্যাপ বিছিয়ে তিনি ছুরি কাঁচি পেন্সিল নিয়ে বসলেন। দেশটা কাটাছেঁড়া হবে কিসের ভিত্তিতে? বেসিসটা কী? শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক ভাগাভাগিটাই সাব্যস্ত হল। এই নিয়ে অশান্তি, উত্তেজনা কম হয়নি। বেঙ্গল আর পাঞ্জাবের কোন কোন ডিস্ট্রিক্ট, ডিস্ট্রিক্টের অংশ, ভারত বা পাকিস্তানে পড়বে তাই নিয়ে মানচিত্রে ছুরির দাগ পড়তে লাগল। নেতারা, বিশেষ করে পাঞ্জাবের বড় বড় নেতারা যখন রে রে করে উঠলেন, নতুন মানচিত্র এনে আবার নতুন করে সীমানা ঠিক করা হল। বার বার এই সীমানা বদলানো হতে লাগল। যশোর খুলনা পশ্চিমবঙ্গে আসা উচিত ছিল। সিলেট ডিস্ট্রিক্ট আসামের সঙ্গে থাকাই সঙ্গত ছিল কিন্তু বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় আসামের নেতারা কোনও ভাবেই তাতে রাজি হলেন না। সামান্য কয়েক দিনে কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য স্থির করে ফেললেন র্যাডক্লিফ। আমি তো বলব, ভারতের ইতিহাসে এটা আরও একটা অন্ধকার সময়।’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।