একেকটা এলাকা পেরিয়ে যেতে যেতে বিশ্বজিৎ বলে যাচ্ছেন, ‘এই জায়গাটা ভিলানিপুর, –এটা হল হ্যাডো–’ ইত্যাদি।
একসময় বিশ্বজিতের জিপ পোর্টে পৌঁছে গেল।
১.৫ মূল পোর্টের গা ঘেঁষে
মূল পোর্টের গা ঘেঁষে কয়েকটা গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল। সেগুলোর পাশে কালীপদ জিপটা পার্ক করতেই বিশ্বজিৎ বিনয়কে নিয়ে নেমে পড়লেন। কালীপদকে বললেন, ‘বিনয়বাবুর লাগেজ জেটিতে নিয়ে এসো।’
পার্কিং এরিয়া থেকে খানিকটা এগলে মস্ত গেট। গেটের পর ডাইনে বাঁয়ে দু তিনটে বিল্ডিং। মাঝখান দিয়ে সোজা রাস্তা চলে গেছে। বিল্ডিংগুলোতে জাহাজ কোম্পানির অফিস। কোম্পানির ক’জন কর্মচারী এধারে ওধারে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। অলস আড্ডার মেজাজে। নগন্য পোর্ট, বিনয়ের মনে হল, খুব সম্ভব এই বন্দরে সবসময় তেমন ব্যস্ততা থাকে না। বিশ্বজিৎকে দেখে ওরা শশব্যস্তে এগিয়ে আসে।–’নমস্কার স্যার, রিফিউজিদের নিয়ে বিভাসবাবুরা এসে গেছেন। চলুন স্যার—’
বিশ্বজিৎ যে পোর্টব্লেয়ারের একজন জবরদস্ত অফিসার সেটা টের পাচ্ছিল বিনয়। বিশ্বজিৎ ফার্স্ট ক্লাস ম্যাজিস্ট্রেট এবং রিফিউজি ডিপার্টমেন্টের একজন হর্তাকর্তা, জাহাজি ব্যাপারটা তার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না, তবু কখন কী ঝঞ্ঝাটে ফেঁসে যাবে তা তো বলা যায় না, তাই এখানকার ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরদের তুষ্ট রাখতে হয়। সেই কারণেই খাতিরের এমন বহর।
কর্মচারীরা যে বিভাসদেরও চেনে তাও জানা গেল। এ ধরনের ছোট শহরে সবাই সবার পরিচিত।
বিশ্বজিৎ প্রতিনমস্কার জানিয়ে বললেন, ‘আপনাদের খবর সব ভালো তো?’
‘হ্যাঁ স্যার–’
বিশ্বজিৎরা হাঁটছিলেন। পাশাপাশি কর্মচারীরা চলেছে। বিশ্বজিৎ বললেন, ‘আপনাদের আর কষ্ট করে আসতে হবে না।’
কিন্তু কে কার কথা শোনে! কর্মচারীরা চলতেই থাকে। নাছোড়বান্দাদের কীভাবেই বা ঠেকানো যায়। বিশ্বজিৎ আর কিছু বললেন না।
লম্বা প্যাসেজ পেরিয়ে বিনয়রা মস্ত এক জেটিতে চলে এল। বিশ্বজিৎ বললেন, ‘এর নাম চ্যাথাম—’
চ্যাথামের কথা অনেক আগেই বিভাসদের মুখে শুনেছে বিনয়। এই প্রথম দেখল।
জেটির পশ্চিম কোনায় স্টিমশিপ ‘মহারাজা’ নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। কাল ‘রস’ আইল্যান্ডে উদ্বাস্তুদের নামিয়ে বিশাল জলযান এদিকেই এসেছিল। পাহাড়ের আড়াল থাকায় চ্যাথাম জেটিটা তখন চোখে পড়েনি।
জেটির মাঝখানে উদ্বাস্তুরা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে। সঙ্গে তাদের লটবহর। সবাই চুপচাপ। কেমন যেন উদাসীন। সরকারি বাবুরা যেখানে নিয়ে যাবেন সেখানেই তো যেতে হবে। এমন একটা নিরুপায় ভাব তাদের চোখেমুখে। চার দিন সমুদ্র আর এক রাত এবারডিন মার্কেটে কাটিয়ে দুশ্চিন্তা করার মতো শক্তিটুকুও বুঝিবা আর নেই। ভাঙাচোরা, ছিন্নমূল মানুষগুলো নিয়তির হাতে
.
নিজেদের সঁপে দিয়ে উপসাগরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।
বিভাস, নিরঞ্জন এবং পুনর্বাসন দপ্তরের ক’জন কর্মচারী উদ্বাস্তুদের কাছাকাছি পঁড়িয়ে কথা বলছিল। খানিক দূরে তিরিশ-চল্লিশজনের এক পাঁচমেশালি জটলা। মুখ-চোখ এবং দাড়ি পাগড়ি দেখে বর্মি এবং শিখদের চেনা যাচ্ছে। বাকিরা খুব। সম্ভব তামিল, মালাবারি মোপলা এবং ভারতের নানা এলাকার লোক। দু’চারজন বাঙালিও থাকতে পারে। সবাই বেশ বয়স্ক। পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন থেকে ষাট-পঁয়ষট্টির ভেতর বয়স।
জেটির গায়ে এক পাশে নোঙর ফেলে আছে ‘স্টিমশিপ ‘মহারাজা’। অন্যদিকে কালকের সেই দুটো স্টিমলঞ্চ ‘সি-গাল’ আর ‘নটিলাস’ লোহার শিকল দিয়ে জেটির সঙ্গে বাঁধা রয়েছে।
বিশ্বজিৎ বিনয়কে নিয়ে উদ্বাস্তুদের দিকে এগিয়ে গেলেন। শিপিং কোম্পানির কর্মচারীরা অবশ্য থেমে গেল। আন্দামান-নিকোবর আইল্যান্ডসের ম্যাজিস্ট্রেটকে খানিকক্ষণ সঙ্গ দিয়ে যথেষ্ট সম্মান দেখানো হয়েছে। তারা ধীরে ধীরে ফিরে যেতে লাগল।
হলধর সূত্রধর, মাখন রুদ্রপাল এবং আরও কয়েকজন বিনয়কে দেখতে পেয়েছিল। উদ্বাস্তুদের দঙ্গল থেকে তারা প্রায় দৌড়েই চলে আসে।
হলধর এক নিঃশ্বাসে তত্বড় করে বলে যায়, ‘ছুটোবাবু আইজ বিহানে উইঠা আপনের লেইগা পথের দিকে তাকাইয়াআছিলাম। কিন্তুক আপনে আইলেন না। হেরপর সরকারি বাবুরা যহন এই জাহাজঘাটায় লইয়া আইল, জবর ডরাইয়া গ্যাছিলাম। হগলে (সকলে) কওয়াকওয়ি করতে আছিল আপনে ভাটকি (ফাঁকি) দিয়া কইলকাতায় ফিরা যাইবেন। অহন কী ভালা যে লাগতে আছে!’ তার ষাটবাষট্টি বছরের শুষ্ক চোখ বাষ্পে ভরে যেতে লাগল। আনন্দে। ক্ষণিক উচ্ছ্বাসে।
মাখন অপরাধী অপরাধী মুখ করে বলল, ‘সকাল তরি (পর্যন্ত) আপনেরে না দেইখা ভাবছিলাম সমুন্দুরের মধ্যিখানে আমাগো বিসজ্জন দিয়া বুঝিন চইলাই যাইবেন। আমারে মাপকইরা দ্যান।‘ সে হাতজোড় করল।
বাকি সবাই একই সুরে বলে যেতে লাগল। বিনয় হেসে হেসে বলে, ‘দেখলেন তো আমি আপনাদের ফাঁকি দিই নি। ঠিক এসে গেছি। আপনারা যে যার জায়গায় ফিরে যান। আমি ওঁদের কাছে যাচ্ছি।’ একটু দূরে বিশ্বজিৎ নিরঞ্জন আর বিভাসের সঙ্গে কথা বলছেন। সে সেদিকে চলে গেল।
বিশ্বজিৎ জিগ্যেস করছিলেন, ‘নতুন সেটলমেন্টে রিফিউজিদের থাকার মতো সব ব্যবস্থা করা হয়েছে?’
নিরঞ্জন বলল, ‘হয়েছে।‘
‘চেনম্যান আর জরিপদাররা ওখানে আছে তো?’
‘নিশ্চয়ই।‘
চেনম্যান এবং জরিপদারদের ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল না বিনয়ের। এ নিয়ে সে কোনও প্রশ্ন করল না। সেটলমেন্টে গেলেই সব জানা যাবে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।