বিনয় শেখরনাথের দিকে তাকিয়ে থাকে; উত্তর দেয় না।
শেখরনাথ কারণটাও বিশদভাবে ব্যাখ্যা করে দিলেন, ‘আসলে একটা কট্টর ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রে মাইনোরিটিরা থাকতে একেবারেই ভরসা পাচ্ছে না। লিবারেল ইসলামিক স্টেট হলে এই সমস্যা হত না। ধর্মান্ধতা যে কী সাংঘাতিক সমস্যা সৃষ্টি করে, ভাবতে সাহস হয় না। ভারত আর পাকিস্তান এমন দুই রাষ্ট্র যে একটা দেশে কিছু ঘটলে তার প্রতিক্রিয়া এসে পড়ে আরেকটা দেশে। ইন্ডিয়ায়, বিশেষ করে পশ্চিমবাংলায় তার কিছু কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। আন্দামানে বসে তো মেনল্যাণ্ডের সমস্ত খবর পাই না। তবে শুনেছি, ওয়েস্ট বেঙ্গলে দু-চার জায়গায় মাইনোরিটি কমিউনিটির লোকজনের ওপর হামলা হয়েছে। দেশভাগের পর দুই দেশে শান্তি আসবে এটাই কাম্য ছিল কিন্তু বাস্তবে কী দেখা যাচ্ছে? ইংরেজরা কি চিরকাল মারামারি কাটাকাটির জন্যে এই সাব-কন্টিনেন্টকে দু’টুকরো করে দিয়ে গেল? যা চলছে তাতে মনে হয় পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানরা থাকতে পারবে না। এটা আমরা চাইনি। পূর্ব পাকিস্তানে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন লিবারেল বাঙালি অনেকেই আছেন। কিন্তু তারা আর ক’জন! বেশির ভাগই উন্মাদ হয়ে গেছে।’
মধ্যরাতে জেফ্রি পয়েন্টের এই ঘরটার পরিবেশ হঠাৎ থমথমে হয়ে যায়।
অনেকক্ষণ নিজের মধ্যে মগ্ন হয়ে রইলেন শেখরনাথ। দূরমনস্কর মতো কী ভাবছেন, বোঝা যাচ্ছেক না। বিনয় নিঃশব্দে তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল।
একসময় শেখরনাথ হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘দেশভাগের জন্যে শুধুমাত্র ইংরেজদের দোষারোপ করা ঠিক নয়। মূল চক্রী যদিও তারাই তবু আমাদের নেতারাও দায় এড়াতে পারেন না। স্বাধীনতার আগে সেই সময়কার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী একবার ঘোষণা করেছিলেন, উনিশ শো আটচল্লিশের মাঝামাঝি কোনও একটা সময় ভারতকে স্বাধীনতা দেওয়া হবে এবং ইংরেজরা দু’শো বছরের এই কলোনি ছেড়ে চলে যাবে। অস্বীকার করা যাবে না, গান্ধিজিও চেয়েছেন দেশটা দুটুকরো না করে কংগ্রেস কিছু দাবি মেনে নিয়ে মুসলিম লিগের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসুক। তিক্ততা, অবিশ্বাস কাটিয়ে দেশ শাসনের ভার তারা একসঙ্গে নিক। তুমি কি এসব জানো?’
বিনয় জানত না; আস্তে মাথা নাড়ল। উদ্বাস্তুদের প্রসঙ্গে এটলি, গান্ধিজি, কংগ্রেস আর মুসলিম লিগকে হঠাৎ কেন নিয়ে এলেন শেখরনাথ, বোঝা যাচ্ছে না। কোন গহন পথে তার চিন্তার ক্রিয়া চলছে, কিছুই বোধগম্য হচ্ছে না।
শেখরনাথ বলতে লাগলেন, তুমি একজন সাংবাদিক। উদ্বাস্তু হয়ে ইণ্ডিয়ায় চলে এসেছ। দেশের, বিশেষ করে দেশভাগের ইতিহাসটা তোমার জানা দরকার। তাঁর বলার ভঙ্গিতে ভর্ৎসনার সুর। ‘কলকাতায় ফিরে গিয়ে ইতিহাসটা ভাল করে পড়ে নিও। নইলে পার্টিশানের পারসপেক্টিভটা ঠিকমতো ধরতে পারবে না।’
বিনয় সংকোচে কুঁকড়ে গিয়েছিল। শেখরনাথ ঠিকই বলছেন, ইতিহাসটা তার বিশেষভাবে জানা প্রয়োজন।
শেখরনাথ থামেন নি।কিন্তু জিন্না ছিলেন নাছোড়বান্দা। অ্যাটলি বা গান্ধিজির প্রস্তাব তিনি কোনওমতেই মেনে নেবেন না। মাউন্টব্যাটেনেরও এটা পছন্দ হয় নি। জিন্না একটা সেপারেট দেশের জন্যে তখন মরিয়া। হী ওয়ান্টস এ সেপারেট মুসলিম নেশন–পাকিস্তান। নেহরু, প্যাটেল এবং কংগ্রেসের প্রথম সারির নেতারাও এটলির প্রস্তাব মেনে নেন নি। নেহরুরা যে কোনও শর্তে স্বাধীনতা চাইছিলেন। আসলে বয়েস হয়ে যাচ্ছিল। হাতের নাগালে ওখত্ তাউস। সিংহাসনে চড়ার লোভ কখনও ছাড়তে পারে? ক্ষমতারূপী সুপক্ক আম্রফলটি নাকের ডগায় ঝুলছে। নেহরু প্যাটেলদের মনের অবস্থাটা বুঝতেই পারছ। ভাবখানা সারাজীবন অনেক কষ্টটষ্ট করেছি, প্রচুর জেল টেল খেটেছি, সুযোগ যখন এসে গেছে ক্ষমতাটা ভোগ তো করে নিই।
‘গান্ধিজি ক্ষোভে, দুঃখে দিল্লি ছেড়ে বিহারে, বিহার থেকে কলকাতার বেলেঘাটায় গিয়ে বসলেন। মাউন্টব্যাটেন ঠিক এটাই চাইছিলেন। গান্ধিজি এই সময় দিল্লিতে থাকুন, সেটা তার অভিপ্রেত ছিল না। স্পষ্ট জানি না, তবে একটা কথা আমার মনে হয়—’
উৎসুক সুরে বিনয় জিগ্যেস করে, ‘কী কথা কাকা?’
শেখরনাথ বললেন, ‘নেহরু প্যাটেলরাও হয়তো তাই চাইছিলেন। গান্ধিজি দিল্লিতে থাকলে দেশভাগটা তিনি আটকাতে পারতেন কিনা বলতে পারব না; মাউন্টব্যাটেন, নেহরু বা জিন্নাদের পক্ষে খুবই অস্বস্তির কারণ হত। একটা কথা ভেবে আমার ভীষণ ধন্দ লাগে—’
বিনয় প্রশ্ন করল না। শেখরনাথের দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইল।
শেখরনাথ বলেই চলেছেন, ‘গান্ধিজি কতবার অনশনে বসে কত অসাধ্যসাধন করেছেন কিন্তু দেশভাগের মতো একটা নিদারুণ সিদ্ধান্ত সাত তাড়াতাড়ি নিতে যাওয়া হচ্ছে, তার কী মারাত্মক ফলাফল হতে পারে, সেটা একবার ভেবে দেখলেন না! কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য কয়েক লহমায় স্থির হতে চলেছে, অথচ গান্ধিজি অনশনে বসার কথা তো এই চরম মুহূর্তে নিতে পারতেন। বলতে তো পারতেন, দেশ ভেঙে টুকরো করার সিদ্ধান্ত আমি মানি না। আমৃত্যু অনশনে বসছি। নেহরু প্যাটেল জিন্না বা মাউন্টব্যাটেন যতই সর্বশক্তিমান হোন না, গান্ধিজি অনশনে বসলে দেশ ভাঙার শর্তে স্বাধীনতা অত সহজ হত না। গান্ধিজি কতবার বলেছেন, স্বাধীনতা এলে কংগ্রেসকে ভেঙে দেওয়া উচিত। দেশভাগ যখন হয় হয় সেই সময় কংগ্রেসকে ডিসব্যান্ড করার কথা একবার যদি মুখ ফুটে উচ্চারণ করতেন, নেহরুদের হাজারবার পার্টিশনের কথা ভাবতে হত। তিনি তা করলেন না। বরং রাজনীতির মূল সেন্টার দিল্লি থেকে বারো চোদ্দ শো মাইল দূরে কলকাতায় গিয়ে মুখ বুজে মৌনী হয়ে বসে থাকলেন! এত বড় মর্মান্তিক ঘটনা ঘটতে চলেছে সব জেনে বুঝেও তিনি একটি আঙুল পর্যন্ত তুললেন না। কী বলব তাকে? এসকেপিস্ট? পলাতক? বুঝতে পারছি না।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।