ভয়ে মাখনের মুখ সাদা হয়ে গিয়েছিল। ত্রস্ত ভঙ্গিতে সে বলল, ‘কাকা, আমাগো দুষ (দোষ) অইয়া (হয়ে) গ্যাছে। কামটা (কাজটা) ভালা করি নাই। এমুন (এমনটা) আর কুনোদিন অইব (কোনওদিন হবে না। মাফ কইরা দ্যান—’
স্থির, কঠিন দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ মাখনের দিকে তাকিয়ে রইলেন শেখরনাথ। তারপর বললেন, ‘আমার কথাগুলো মনে থাকে যেন। চারপাশের ভিড়টাকে লক্ষ করে বললেন, ‘বৃন্দাবন আর মায়ার সঙ্গে অসভ্যতা, ইতরামি করলে তোমরাও কেউ পার পাবে না।’
এরপর পরিতোষ বণিকের দিকে তাকালেন শেখরনাথ।–’বৃন্দাবনের পাটা জখম হয়েছে; এখনও রক্ত পড়ছে। এখানে ফার্স্ট এডের জিনিসপত্র আছে না?’
পরিতোষ ঘাড় কাত করল।–’আছে কাকা–’
‘এক্ষুনি কারওকে দিয়ে ফাস্ট-এড বক্সটা এনে ওষুধপত্র লাগিয়ে বৃন্দাবনের পায়ে ব্যাণ্ডেজ বেঁধে। দেবার ব্যবস্থা কর।‘
পরিতোষ চোখের ইশারায় পুনর্বাসনের একজন কর্মীকে ওষুধপত্র আনতে পাঠিয়ে দিল। শেখরনাথের সব দিকে নজর। বৃন্দাবনকে বললেন, ‘তোমার মাথা থেকে মাখনের জমিতে যে জঞ্জাল পড়ে গেছে; সেগুলো আগে সাফ করে পুব দিকের পাহাড়ে ফেলে আসবে। তারপর নিজেদের জমির কাজ ফের শুরু করবে।
‘হেইডা (সেটাই) ভাইবা (ভেবে) রাখছিলাম (রেখেছিলাম)। পালমশয় হের (তার) আগেই আমাগো চৈদ্দ (চোদ্দ) গুষ্টির—’
বৃন্দাবনকে থামিয়ে দিয়ে শেখরনাথ বললেন, ‘যা হবার হয়ে গেছে। ওসব ভুলে যাও। তোমাকে। আর জেফ্রি পয়েন্টের সব উদ্বাস্তুকে বলছি, ফের যেন কোনওরকম অশান্তি না হয়। দেশভাগের পর সব হারিয়ে এদেশে এসেছ। আন্দামান দ্বীপে পা রাখার জায়গা পেয়েছ। সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে থাকো। ঘরবাড়ি তোল, জমি চৌরস করে চাষবাস কর। তা নয়, সামান্য কারণে ঝগড়া! কূটকচালি! আমার কথাগুলো মনে থাকে যেন।’
শেখরনাথ আর বসলেন না। শরীরটা ভাল নেই। তার ওপর হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে পড়ায় বেশ অসুস্থই লাগছে। বিনয়কে সঙ্গে নিয়ে তিনি নিজেদের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
.
৪.১৬
কোনও কোনওদিন রাতের খাওয়াদাওয়া চুকিয়ে নিজেদের ঘরে এসে নানা বিষয়ে কথা বলতে বলতে শেখরনাথ অবধারিত যে প্রসঙ্গে চলে আসেন তা হল স্বাধীনতা। বিনয় আগেই জেনে গেছে, স্বাধীনতার নামে এই খণ্ডছিন্ন দেশকে তিনি মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেন নি। দু’শো বছরের পরাধীনতা থেকে এই যে মুক্তি, সেটা কি আদৌ মুক্তি! সারা দেশে না হলেও বাঙালির জীবনে যে দগদগে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা কি কোনওদিন নিরাময় হবে?
আজ টেবিলের ওপর দু’টো তেজী হ্যারিকেন জ্বলছিল। জেফ্রি পয়েন্ট গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে। সমস্ত চরাচর একেবারে নিঝুম। খোলা জানলার বাইরে কুয়াশায় ঢাকা পাহাড় এবং জঙ্গল ঝাপসা ঝাপসা। সমুদ্রটা চোখেই পড়ে না। কিন্তু পাহাড়প্রমাণ উঁচু উঁচু ঢেউগুলোর অবিরল পাড়ে আছড়ে পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। মাঝে মাঝে রাতজাগা পাখির কর্কশ চিৎকার এবং ঝিঁঝিদের একটানা গলাসাধা ছাড়া বিশ্বব্রহ্মান্ডের কোথাও আর কোনও আওয়াজ নেই। প্রতিটি রাতেই জেফ্রি পয়েন্টের চেহারা ঠিক এইরকম হয়ে যায়।
বিনয় তার বিছানায় বসে ছিল, শেখরনাথ একটু দূরে তার বিছানায় বালিশে হাতের ভর রেখে আধ-শোওয়া মতো হয়ে কথা বলছিলেন, ‘জানো বিনয়, পাকিস্তান হওয়ার পর জিন্না বলেছিলেন, ‘আমরা একটা ‘মথ-ইটন’ অর্থাৎ পোকায়-কাটা মুসলিম জাহান পেলাম। ভারতবর্ষ কি তার চেয়ে ভাল কিছু পেয়েছে? ক্ষতে-ভরা, রক্তাক্ত, বিধ্বস্ত এক দেশ।’
শেখরনাথ যা ভুলতে পারেন না, যা সারাক্ষণ তাঁকে ভেতরে ভেতরে তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় বিদ্ধ করে সেটাই আজ আবার বলতে লাগলেন, ‘এই স্বাধীনতার সবচেয়ে ওয়স্ট সাফারার আমরা– বাঙালিরা। পাঞ্জাবেরও প্রচুর রক্ত ঝরেছে। হাজার হাজার মানুষ সেখানেও খুন হয়েছে, অগুনতি তরুণী ধর্ষিত হয়েছে, গ্রামকে গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে। তবে ওদের মোটামুটি একটা স্বস্তিও মিলেছে। টোটাল এক্সচেঞ্জ অফ পপুলেশন। এপারের মুসলমানরা পশ্চিম পাঞ্জাবে চলে গেছে, ওপারের হিন্দু আর শিখেরা ইস্ট পাঞ্জাবে চলে এসেছে। যদিও তা বাঞ্ছিত ছিল না। অখণ্ড, স্বাধীন ভারতের কনসেপ্টের সঙ্গে তা একেবারেই মেলে না। কিন্তু এটা মন্দের ভালো। তাছাড়া সেন্ট্রাল গভর্ণমেন্ট সিন্দুক খুলে পাঞ্জাবের রিহাবিলিটেশনে টাকার বস্তা ঢেলে দিয়েছে। কত রকমের যে দান-খয়রাত। এদিকে বাঙালি উদ্বাস্তুদের জন্য সরকারের হাতের মুঠি খুলতেই চায় না।’
বিনয় এসব জানে। তবু নীরবে শুনতে থাকে।
শেখরনাথ থামেন নি।–’একেক সময় আমার কী মনে হয় জানো? বেঙ্গলেও এক্সচেঞ্জ অফ পপুলেশন হলে বোধহয় ভাল হত।’
বিনয় বেশ অবাকই হল।–’আপনি এরকম ভাবছেন কেন কাকা?’
‘পাকিস্তান রাষ্ট্রটার জন্মই হয়েছে শত্রুতা, বিদ্বেষ, ঘৃণা আর অবিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে। দু’বছরেরও বেশি হল পাকিস্তান তো কায়েম হয়ে গেছে। পূর্ব বাংলায় যে হিন্দু, বৌদ্ধ আর খ্রিস্টানরা ছিল তারা তো নতুন দেশটাকে স্বদেশ বলে মেনেও নিয়েছিল। তবু সেখানে বার বার একতরফা দাঙ্গা হচ্ছে কেন? কেন মাইনোরিটির নিরাপত্তা নেই? চোদ্দ পুরুষের ভিটেমাটি খুইয়ে কেন স্রোতের মতো উদ্বাস্তুরা পশ্চিমবাংলা, আসাম আর ত্রিপুরায় পালিয়ে আসছে?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।