মাখন তার জমির কোণের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, ‘ওই দ্যাহেন (দেখুন) বড়কত্তা, বিন্দাবন নিজের জমিনের শিকড়বাকড়, বনতুলসী আইনা আমার জমিনে ফালাইছে।‘ তার মুখ, ভাবভঙ্গি নিপাট ভালমানুষের মতো, ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না এমন একটা মিনমিনে চেহারা। সে জানে শেখরনাথ এমন একজন মানুষ যার কাছে কোনও জারিজুরি, শয়তানি খাটবে না।
তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বৃন্দাবন চেঁচিয়ে উঠল।–’মিছা কথা কাকা। এই মাখা সাক্ষাইত (সাক্ষাৎ) শয়তান।‘
সঙ্গে সঙ্গে তুলকালাম বেধে গেল। মাখনরা দলে ভারী, বৃন্দাবনরা মাত্র দু’জন। সবাই পরিত্রাহি চিৎকার করতে করতে একে অন্যের দিকে আঙুল তুলে যা বলে যাচ্ছে তার কিছুটা বোঝা যায়, বাকিটা দুর্বোধ্য। দু’পক্ষই গলা এত চড়িয়েছে যে কানের পর্দা ফেটে যাবার দাখিল।
শেখরনাথের প্রবল ব্যক্তিত্ব থাকলেও তিনি কখনও উঁচু গলায় কথা বলেন না। সবসময় শান্ত, সামান্য গম্ভীর। কিন্তু এই মুহূর্তে সহনশক্তিতে যেন চিড় ধরল। ক্ষিপ্র পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। হাত তুলে কঠোর স্বরে বললেন, ‘একদম চুপ। আমি যাকে বলতে বলব সে-ই শুধু বলবে।’–বৃন্দাবন তুমি আগে বল।
কিভাবে আগাছা এবং শিকড়বাকড়ের বিশাল বোঝা মাথায় চাপিয়ে মাখন পালের জমির ওপর দিয়ে পুবদিকের পাহাড়ের নিচে সেগুলো ফেলে আসতে যাবার সময় একটা গাছের শিকড়ে পা আটকে পড়ে যাওয়ায় মাথার বোঝাটা ছিটকে পড়ে বাঁধন ছিঁড়ে গিয়ে সব ছত্রখান হয়ে পড়ে তার। সবিস্তার বিবরণ দিয়ে যায় বৃন্দাবন। তারপর পা’টা সামান্য তুলে বলে, ‘এই দ্যাহেন (দেখুন) আমার বুইড়া (বুড়ো) আঙ্গুলহান ফাইটা রক্তারক্তি অইছে। আর মান্না আর অর (ওর) গুষ্টি কয় আমি নিকি (নাকি) ইচ্ছা কইরা হের (তার) জমিনে আগাছা উগাছা ফালাইছি। আপনেই বিচার করেন বড়কত্তা–’ একটু দম নিয়ে ফের শুরু করে, ‘য্যাতই হেরে (তাকে) বুঝাই ইচ্ছা কইরা করি নাই। হ্যায় (সে) আর হের (তার) বউ আমারে কী আকথা কুকথা যে কইছে হোনলে (শুনলে) আপনে কানে আঙ্গুল দিবেন। আমারে অরা (ওরা) মাইরাই ফালাইত। মায়া আমারে বাঁচাইতে আইলে মান্নার বউ হেরে (তাকে) কয় কিনা খানকি মাগী। সাচা কথা কই কাকা, মায়াও চেইতা গিয়া (রেগে গিয়ে) হেরেও (তাকেও) খানকি কইছে। কতক্ষণ আর মুহ (মুখ) বুইজা সওন (সহ্য করা) যায়?’
তাকে থামিয়ে দিয়ে শেখরনাথ মাখনের দিকে তাকালেন।–’তোমার কী বলার আছে, এবার বল—’
মাখন বলল, ‘বিন্দাবন মিছা কইছে কাকা। ও ইচ্ছা কইরাই আমার জমিনে শিকড়বাকড় ফালাইছে—’
লোকটার চোখমুখ এবং বলার ভঙ্গি লক্ষ করে বোঝা যাচ্ছে সে সত্যি বলছে না। শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, ‘বৃন্দাবন তো আজই তার জমির শিকড় আর বনতুলসী কেটে তোমার জমির ওপর দিয়ে পুবদিকের পাহাড়ে ফেলতে যায় নি, আমি তাকে বেশ কয়েকদিন যেতে দেখেছি। কই, আগে তো কখনও এখানে ফেলে নি। আজ তার এমন দুর্মতি হবে কেন? তা ছাড়া ইচ্ছা করেই কি নিজের পায়ে রক্তারক্তি কান্ড বাধিয়েছে?’
মাখন বারকয়েক ঢোক গিলল। জবাব দিল না।
শেখরনাথ এবার জনতাকে লক্ষ করে বললেন, ‘তোমরা তো এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছিলে। কে ঠিক বলছে আর কে বেঠিক বলছে, তোমরাই বল—’
একজন আধবুড়ো উদ্বাস্তু, নাম অধর ঢালী, বলল, ‘আমরা নিজের চৌখে দেহি (দেখি) নাই। তয় (তবে) বিন্দাবনগো লগে মাখনগো কাইজা (ঝগড়া) বাধার পর দৌড়াইয়া আইছি—’
ভিড়ের অন্য সবাই তার কথায় সায় দিল।
শেখরনাথ তাদের বললেন, তোমাদের কী মনে হয়, বৃন্দাবনের পায়ের বুড়ো আঙুল যে ফেটে গেল সেটা কি সে ইচ্ছা করে ফাটিয়েছে?
সবাই চুপ।
বৃন্দাবন এবার ভয়ে ভয়ে বলল, কাকা, ‘আমার একহান (একটা) কথা আছে।’
শেখরনাথের চোখ বৃন্দাবনের দিকে ফিরল।–’কী কথা?’
‘আপনে সনাতনরে এই কুলোনি (কলোনি) থিকা মইদ্য আন্ধারমানে (মধ্য আন্দামানে) পাঠাইয়া দেওনের (দেবার) পর এইহানকার (এখানকার) অন্য রিফুজরা আমার আর মায়ার লগে কথা কয় না। দূর থিকা আমাগো হুনাইয়া হুনাইয়া (শুনিয়ে শুনিয়ে) কত কু কথা যে কয়! আপনেরে অ্যাদ্দিন কই নাই। (বলি নি)। আমারে কয় কুচরিত্তির, ঢ্যামনা, পরের বউরে ভাগাইয়া আনছি। মায়ারে কয় বেবুইশ্যা (বেশ্যা)। ইট্ট (একটু) ছুতানাতা পাইলে আমাগো ছিড়া খাইব। হেই লেইগা (সেজন্য) চুপ কইরা থাকি। আইজ মাথা থিকা (থেকে) আগাছার বুঝাহান (বোঝাটা) পইড়া যাইতে এই ছুতাহান (ছুতোটা) পাইয়া মাখন পালেরা গুষ্টিসুদ্ধা আমাগো দুইজনরে গাইল (গালাগালি) তত দিছেই (দিয়েছেই), আপনেরা না আইয়া (এসে) পড়লে আমাগো শ্যাষ (শেষ) কইরা ফালাইত (ফেলত)। এই হগল (সব) কথা অ্যাতদিন আপনেরে কই নাই। আইজ না কইয়া পারলাম না। এইর (এর) এট্টা বিহিত করেন কাকা–’ সে হাতজোড় করে কাকুতি মিনতি করতে লাগল।
সমস্ত ব্যাপারটা শেখরনাথের কাছে জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে। তিনি মাখন এবং অন্যান্য উদ্বাস্তুদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি বৃন্দাবনদের এখানে থাকতে দিয়েছি। তোমরা ওর পেছনে যদি লাগো তার ফল খুব খারাপ হবে। মাখন, তোমার এত সাহস হয় কী করে? আর একবার যদি শুনি বৃন্দাবনদের সঙ্গে ঝগড়া বাধিয়েছ, এখানে থাকতে পারবে না। জমিজমা কেড়ে নিয়ে লরিতে তুলে তোমাদের পোর্টব্লেয়ারে নিয়ে ছেড়ে দেব। কলকাতায় যে ফিরে যাবে, তার উপায় নেই। জাহাজের টিকিট কেটে দেওয়া হবে না। নিজেদের পেটের ভাত তোমাদেরই জোগাড় করে নিতে হবে। সরকারি কোনওরকম সাহায্য তোমরা পাবে না। সেটা তোমাদের পক্ষে ভাল হবে কিনা, ভেবে দেখ—

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।