বৃন্দাবন বলল, ‘আমি ইচ্ছা কইরা ফালাই নাই। পালমশয়ের জমিনের গাছের শিকড় পায়ে বাইজা (লেগে) পইড়া গ্যাছে—’
কিন্তু পাশে দাঁড়াবার মতো কারওকেই পাওয়া গেল না। অন্যের বউকে ভাগিয়ে এনে শেখরনাথের কৃপায় জেফ্রি পয়েন্টে দিব্যি বৃন্দাবনরা কাটিয়ে দিচ্ছে, পনেরো বিঘা সরকারি জমিও পেয়েছে, এটা উদ্বাস্তুরা কেউ মেনে নিতে পারছে না।
গগন বিশ্বাস বলল, ‘হেয়া (তা) যা-ই অউক (হোক), তুমার কিন্তুক হুইশার (হুঁশিয়ার) অইয়া শিকড় বাকড় আগাছার বোঝাহান লইয়া যাওন উচিত আছিল।‘
বৃন্দাবন হতাশ। কেউ তার যুক্তিতে কান দিচ্ছে না। সারা জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তুরা যেন তার বিরুদ্ধে জোট বেঁধেছে। এই শত্ৰুপুরীতে কতজনের সঙ্গে যুদ্ধ করা সম্ভব? গলার স্বর চড়িয়ে সে। যদি বলে তার সঙ্গে যা করা হচ্ছে সেটা আদৌ সুবিচার নয়; বৃন্দাবন জানে মুখ ফসকে এই কথাগুলো বেরিয়ে এলে সবাই মিলে তাকে ছিঁড়ে খাবে। সে দিশেহারা হয়ে পড়ল। এদিকে পায়ের বুড়ো আঙুলটা যন্ত্রণায় টনটন করছে। কী করবে, কী বলবে যখন ভেবে পাচ্ছে না সেইসময় মায়া একেবারে আগুন ধরিয়ে দিল। এতক্ষণ প্রায় নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থেকেছে। হঠাৎ হিতাহিত জ্ঞানশূন্যের মতো চেঁচিয়ে উঠল।–এই আপনেগো বিচার অইল (হল)! হেই থনে (থেকে) এট্টা মাইনষেরে (একটা মানুষকে) হুদাহুদি (শুধু শুধু) বাপ-মা তুইলা গাইলাইতে আছে (গালাগালি দিচ্ছে), তার কুনো দুষ (কোনও দোষ) নাই, তভু আপনেরা কেও (কেউ) একহান (একটা) আঙ্গুল তুলবেন না?
মাখনের বউ কালী ফের অগ্নিমূর্তি হয়ে খাই খাই করে উঠল।–’খানকি মাগীর চোপা দ্যাহেন (দেখুন)। তরে (তোকে) না কইছি চুপ মাইরা থাকবি! ফির (আবার) চোপা লাড়তে আছস (নাড়ছিস)? লাইত্থাইয়া (লাথি মেরে) তর (তোর) মুহ (মুখ) ভাইঙ্গা দিমু—’
মায়া আগেই খোলস থেকে বেরিয়ে এসেছিস। সেও মারমূর্তি হয়ে কালীর দিকে ছুটে এল।–’আমি খানকি? তুই খানকি, তর মায়ে খানকি, তর মাইয়া বুইন (বোন), চৈদ্দ গুষ্টি খানকি—’
এরপর তুমুল শোরগোল উঠল। কালী মায়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, চন্দ্র জয়ধররা কোনওরকমে তাকে সামলে রেখে সকালবেলায় একটা রক্তারক্তি কাণ্ড থামিয়ে দিল। তবে দুই যুযুধান পক্ষ থেকেই নোংরা, কদর্য খিস্তি খেউড়ের আদানপ্রদান চলতে লাগল। বুড়ো, আধবুড়ো উদ্বাস্তু যারা মাখন পালের জমিতে জড়ো হয়েছিল তারা সেটা থামাবার চেষ্টা করল না। করলেও ওরা শুনত না।
শুধু কালী বা মায়াই নয়, এখন এই তুমুল কুরুক্ষেত্রে বৃন্দাবন, মাখন এবং মাখনের ছেলেরাও যোগ দিয়েছে। দুনিয়ায় যতরকম বাছা বাছা, কদর্য, অশ্লীল খেউড় তাদের জানা ছিল পরস্পরের দিকে নিক্ষেপ করতে লাগল। পাহাড় সমুদ্র জঙ্গলে ঘেরা নিঝুম জেফ্রি পয়েন্ট এই সকালবেলায় একেবারে সরগরম।
অন্যের ঝগড়াঝাটি বা কোন্দল শোনার মতো আমোদ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে আর কী থাকতে পারে? আরও দূরে দূরে যে উদ্বাস্তুরা তাদের জমিতে কাজ করছিল তারাও শাবল কুড়ুল ফেলে মাখনের জমিতে চলে এল। দগদগে পচা ঘায়ের ওপর ভনভনে মাছির মতো তারা ভনভন করতে লাগল।
মাখন আর বৃন্দাবনদের মহাযুদ্ধ হয়তো সারাদিন ধরেই চলত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হল না।
.
জেফ্রি পয়েন্টের শেষ মাথায় শেখরনাথ আর বিনয় তাদের ঘরে বসে কথা বলছিলেন। অন্য দিন চাটা খেয়েই শেখরনাথরা জমিতে জমিতে ঘুরে উদ্বাস্তুদের কাজকর্ম লক্ষ করেন। কারও কোনও অসুবিধা বা সমস্যা দেখা দিলে তার সুরাহা করে দেন। কিন্তু শেখরনাথের শরীরটা ভোর থেকে ম্যাজম্যাজ করছিল, তাই ঠিক করে রেখেছিলেন একটু বেলার দিকে বেরুবেন। কিন্তু ইহল্লার তীব্র-আওয়াজ জেফ্রি পয়েন্টের বায়ুস্তর ভেদ করে এত দূরে চলে এসেছিল। তাই আর ঘরে বসে থাকা গেল না।
শেখরনাথ বিনয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতে হঠাৎ চকিত হয়ে উঠলেন। কান খাড়া করে একটানা সেই শব্দপুঞ্জ শুনতে লাগলেন। বিনয়ও তা শুনতে পেয়েছিল। সে জিগ্যেস করল, ‘কী ব্যাপার কাকা? এত চেঁচামেচি হচ্ছে কেন?’
শেখরনাথের কপালে ভাঁজ পড়েছে। বললেন, ‘নিশ্চয়ই কোনও ফ্যাসাদ বেধেছে। চল তো দেখি—’
শেখরনাথের পরনে ঘরোয়া পোশাক। লুঙ্গি আর হাফশার্ট। বিনয়ের পরনে আধময়লা পাজামা আর হাফ-হাতা গেঞ্জি। সেই অবস্থাতেই পায়ে চটি গলিয়ে দু’জনে বেরিয়ে পড়লেন। ওদিকে পুনর্বাসন দপ্তরের বেশ কয়েকটি কর্মী আর পরিতোষ বণিককেও দেখা গেল। তারা হন্তদন্ত উত্তরের জমিগুলোর দিকে চলেছে।
শেখরনাথের চোখে পড়ল, উত্তরে পেরিমিটার রোডের কাছাকাছি অনেক মানুষের জটলা। আন্দাজ করে নিলেন ওখানেই কিছু একটা ঘটেছে। বললেন, ‘তাড়াতাড়ি চল বিনয়। ব্যাপার সুবিধের মনে হচ্ছে না।’
দুজনে জোরে জোরে পা চালিয়ে দিলেন এবং কয়েক মিনিটের ভেতর মাখন পালের জমিতে পৌঁছে গেলেন।
শেখরনাথদের এবং পুনর্বাসনের কর্মী আর পরিতোষকে দেখে ভিড়টা সরে সরে পথ করে দিল। রণরঙ্গিণী মায়া আর কালী চুপ করে গেছে। একদিকে বৃন্দাবন, অন্যদিকে মাখন আর তার ছেলেদের মুখেও কুলুপ। সমস্ত আবহাওয়াটাই একেবারে স্তব্ধ। একটু আগেও যে এখানে মহাযুদ্ধ চলছিল এখন তা বোঝার উপায় নেই।
ওদিকে পুনর্বাসনের আমিন বর্মী লা-ডিন আর একজন কর্মচারী দৌড়ে গিয়ে দু’টো চেয়ার নিয়ে এল। শেখরনাথ বসতে বসতে বললেন, ‘কী হয়েছে? এত হইচই কেন?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।