আজকের দিনটা ভাল ছিল না মায়াদের পক্ষে। মাথার বিশাল বোঝা দুটো দুদিক থেকে দু’হাতে ধরে মাখনদের জমিতে চলে এসেছিল বৃন্দাবন। সে টের পাচ্ছিল, ধারাল বর্শার ফলার মতো মাখনদের সারা গুষ্টির হিংস্র চোখ তার পিঠে একের পর এক বিধছে। সে কোনও দিকে তাকাল না, প্রায় দমবন্ধ করে এগিয়ে যাচ্ছিল, আচমকা একটা বুনো গাছের শিকড়ে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলটা আটকে যাওয়ায় মাথার বোঝাসুদ্ধ হুড়মুড় করে পড়ে গেল। যে দড়ি দিয়ে বোঝাটা আটকানো ছিল সেটা ছিঁড়ে গিয়ে সব শিকড়বাকড় এবং আগাছা ছত্রখান হয়ে মাখনের জমির অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল।
পায়ে বেশ জোরেই লেগেছে। যন্ত্রণায় বুড়ো আঙুলটা ভীষণ টাটাচ্ছে। কোমর আর বুকেও চোট পেয়েছে বৃন্দাবন। আছড়ে পড়ায় চোখের সামনের সমস্ত কিছু অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ অনেকের প্রবল চিৎকার কানে এল। প্রথমটা আবছা আবছা, তারপর খুব স্পষ্ট হয়ে। ডান হাতের ভর দিয়ে ধড়মড় করে উঠে বসল বৃন্দাবন। ততক্ষণে মাখন পালের বিশাল বাহিনী তাকে ঘিরে ধরেছে। সবার চোখমুখ ক্রোধে আক্রোশে গনগন করছে।
হাত-পা ছুঁড়ে মাখন বলছিল, ‘এইডা (এটা) কী অইল (হল)? কী অইল এইডা?’
অন্য সবাই গলার শির ছিঁড়ে চেঁচিয়ে চলেছে। আশপাশের জমিগুলো থেকে উদ্বাস্তুরা চলে এসেছে। মথুর সাহা, হারাধন, খগেন, সৃষ্টিধর–এমন অনেকে। তারাও প্রচন্ড উত্তেজিত। ওধারের জমি থেকে মায়াও এসে একধারে দাঁড়িয়েছে। তার চোখেমুখে ত্রাস, উৎকণ্ঠা। শ্বাসরুদ্ধের মতো তাকিয়ে আছে সে। কী করবে যেন বুঝে উঠতে পারছে না।
পায়ের বুড়ো আঙুলের নখটা ফেটে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে। সেদিকে হুঁশ নেই বৃন্দাবনের। ভয়ে ভয়ে বলল, ‘দ্যাহেন (দেখুন) পালমশয়, আমি কি ইচ্ছা কইরা আপনের জমিনে। শিকড়বাকড় ফালাইছি? নিজেই—’
বৃন্দাবনকে শেষ করতে দিল না মাখন, উন্মাদের মতো হুঙ্কার ছাড়ল।–’ইচ্ছা কইরাই ফালাইছস। তর লাখান (তোর মতো) শয়তান পিরথিমীতে (পৃথিবীতে) আর এট্টা (একটাও) জন্মায় নাই।‘
মাখনের বউ কালীর লকলকে খরসান জিব। তার মতো কোন্দলবাজ (ঝগড়ুটে) মেয়েমানুষ জেফ্রি পয়েন্টে দ্বিতীয়টি পাওয়া যাবে না। চিলের মতো তীক্ষ্ণ গলায় চারপাশের সবার কানের পর্দা চিরে কেঁড়ে চিৎকার করল, কুচরিত্তির, বজ্জাত! য্যায় (যে) পরের বউরে চুরি কইরা আন্ধারমান দ্বীপি পলাইয়া (পালিয়ে) আইতে পারে হ্যায় (সে) আবার কথা কয় কুন (কোন) মুহে (মুখে)?’ রক্তবর্ণ চোখের তারা দু’টো বন বন করে ঘুরছে তার। ডান হাতের আঙুল নাচাতে নাচাতে সে চেঁচাতে লাগল।–’এক্কেরে চুপ মাইরা (করে) থাকবি–’
বৃন্দাবন বলল, ‘চুপ মাইরাই তো থাকি। কিন্তু নিজের চৌখেই তো দ্যাখলেন, ইচ্ছা কইরা ফালাই নাই। তভু আকথা-কুকথা কইতে আছেন ক্যান?’
আগুনখাকির মতো বৃন্দাবনের দিকে তেড়ে গেল কালী এবং তার পেছন পেছন মাখন আর তাদের ছেলেরা। কালী গলার স্বর আরও কয়েক পর্দা চড়িয়ে দিল।–’আকথা কুকথা কী রে? তর (তোর) জিম্ভ (জিব) টাইনা ছিড়া ফালামু—’
হাতের ভর দিয়ে বৃন্দাবন উঠে দাঁড়াল। তার মেজাজও তিক্ত হয়ে উঠেছে। রুক্ষ গলায় এবার বলল, ‘পায়ে পাও বাজাইয়া কাইজা (পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া) করেন ক্যান? আমার ধৈয্য (ধৈর্য) কিলাম থাকতে আছে না।‘
পেছন থেকে সামনের দিকে এগিয়ে এল মাখন। চোখ পাকিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে মুখ ভেংচে বলতে থাকে, ‘ধৈয্য থাকতে আছে না! কী করবি রে তুই হুমুন্দির পুত (সম্বন্ধীর ছেলে), কী করবি তুই!’
অনেকক্ষণ সহ্য করার পর এতক্ষণে রুখে উঠল বৃন্দাবন।–’গাইল (গালাগালি) দিও না পালের পুত। সোম্মান (সম্মান) দিয়া কথা কইতে আছিলাম। এইবার কিন্তুক ছাড়ুম না—’
কুৎসিত অঙ্গভঙ্গি করে দাঁতমুখ খিঁচিয়ে উঠল মাখন।–’তুই আমার এইটা ছিঁড়বি–’ বলে শরীরের বিশেষ একটা অংশ দেখিয়ে দিল।
এদিকে চিৎকার চেঁচামেচি শুনে কাজকর্ম ফেলে আরও দূরের জমিগুলো থেকে অনেকে চলে এসেছে। মায়া আরও এগিয়ে এসেছিল। সকালবেলায় এমন একটা কান্ড ঘটে যাবে, সে ভাবতেও পারে নি। তবে বুঝতে পারছিল চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। তার মুখটা শক্ত হয়ে উঠছিল।
অন্য যে উদ্বাস্তুরা এসেছে তারা হল জলধর বারুই, মহাদেব রুদ্রপাল, গগন বিশ্বাস, বসন্ত দাস, চন্দ্র জয়ধর এবং আরও অনেকে। তারা বেশির ভাগই বয়স্ক লোকজন। তাদের দিকে তাকিয়ে বৃন্দাবন কাতর মুখে বলল, ‘আপনেরা হোনেন (শুনুন), পালের পুত আমারে কী কয়? এই বিচার হগলে (সবাই) করেন—’
ক্রোধে উত্তেজনায় ফেটে পড়ল মাখন।–’পুঙ্গির পুত, মানুষজন ডাইকা সালিশি মারাও—’
অন্য উদ্বাস্তুদের দিকে ফিরে বৃন্দাবন বলল, ‘নিজেরাই ক’ন, আমি আপনেগো ডাইকা আনছি?’
মাখনও ভিড়টাকে বলল, ‘উই দ্যাহেন (ওই দেখুন) হালার পুতে আমার জমিনে শিকড়বাকড় ফালাইয়া কী করছে! আমি অরে (ওকে) গাইল (গালাগালি) দিমু না তো কুলে (কোলে) বহাইয়া (বসিয়ে) ক্ষীরমোহন খাওয়ামু?’
চন্দ্র জয়ধর বলল, ‘এই কামটা তুমি ভালা কর নাই বিন্দাবন। অন্যের জমিনে হাবিজাবি ফালাইলে ম্যাজাজ (মেজাজ) কী ঠিক থাকে?’
অন্য বয়স্ক উদ্বাস্তুরা চন্দ্রর কথায় সায় দিল।–-’না না, এইডা ঠিক অয় (হয়) নাই।‘

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।