পুনর্বাসন বিভাগের, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকজন বড় বড় গাছ কাটিয়ে ডালপালা এবং গাছের গুঁড়ি খন্ড খন্ড করে হাতি দিয়ে সরিয়ে ট্রাকে তুলে নিয়ে স’মিলে পৌঁছে দেয়। প্যাডক, চুগলুম, দিদু বা রেনট্রি–এমন সব মহাবৃক্ষের মোটা মোটা শিকড় মাটির তলায় কতদূর চলে গেছে ওপর থেকে বোঝার উপায় নেই। এই সব গাছের শিকড়ও বনবিভাগ থেকে তুলে নিয়ে যায়। বাকি জঙ্গলটা সাফ করতে হয় উদ্বাস্তুদেরই। এ মায়া আর বৃন্দাবন তাদের জমিতে আজ জলডেঙ্গুয়া কাটছিল। পাঁচ একর অর্থাৎ পনেরো বিঘা জমির জঙ্গল সাফ করা কি মুখের কথা! পুনর্বাসনের লোকেরা উদ্বাস্তুদের প্রচুর দড়িদড়া দিয়েছে। বনতুলসী, ঝোঁপটোপ কাটার পর তারা দড়ি দিয়ে সেগুলো বেঁধেছেদে কয়েক খেপে পুবদিকের পাহাড়ের তলায় রেখে আসে। সরকারি কর্তারা ওই এলাকাটাই কাটা ঝোঁপঝাড় রেখে আসার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। অনেকটা জমে গেলে ট্রাকে বোঝাই করে সেসব কোথায় নিয়ে যাওয়া হয় কে জানে।
জমি দেওয়া হলেও এর মধ্যে আল তৈরি করা তো সম্ভব নয়। বাঁশের খুঁটি পুঁতে পুঁতে আপাতত সীমানা ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। আল না থাকায় একজনের জমির ওপর দিয়ে আরেকজনকে যাওয়া-আসা করতে হয়। যতদিন না মাটি কেটে জমির সীমানা বরাবর উঁচু করে আল বানানো হচ্ছে, এইভাবেই যাতায়াত করতে হবে।
বৃন্দাবনদের জমির ঠিক গায়েই মাখন পালদের জমি। দেশে থাকতে মাখন লক্ষ্মী গণেশ সরস্বতী কালী দুর্গা, বছরের কয়েকটা মাস এইসব দেবদেবীর মূর্তি গড়ে বিক্রি করত। কিন্তু এতে ক’টা পয়সাই বা মেলে! তাছাড়া তাতে সাত আটজনের একটা গুষ্টির পেট চলে নাকি? নয় নয়, করেও মাখনের পাঁচপাঁচটা ছেলেমেয়ে, তাছাড়া তারা স্বামী স্ত্রী, বিধবা মা। বছরের বাকি মাসগুলো তো নিষ্কর্মা ঘটের মতো বসে থাকলে চলে না। মাখনদের বেশ কয়েক বিঘে জমি ছিল। যখন মূর্তি গড়ার বায়না থাকত, সেই সময়টা বড় তিনটে ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে মাখন চাষবাস করত। তাতে সারা বছরের খোরাকিটা উঠে আসত। বাকি খরচ মিটত মূর্তি গড়ার মজুরি থেকে। মোটামুটি এইভাবেই জীবনের এতগুলো বছর কাটিয়ে এসেছে মাখনরা। কিন্তু দেশভাগের পর এতদিনের অভ্যস্ত জীবন পুরোপুরি পালটে গেছে। ঘরবাড়ি জমিজমা খুইয়ে সীমান্তের এপারে আসতেই তাদের গায়ে লেগে গেল ‘রিফিউজি’ তকমা। বছরখানেক দমদমের ত্রাণশিবিরে কাটিয়ে এখন তারা জেফ্রি পয়েন্টের বাসিন্দা। বংশগত মূর্তি তৈরির যে ধারাটা বাপ-ঠাকুরদা এবং তাদের বাপ-ঠাকুরদাদের আমল থেকে একশো দু’শো বছর কি তারও বেশি সময় ধরে চলে আসছিল, বর্ডারের এপারে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে তাতে চিরকালের মতো ছেদ পড়ে গেছে। আন্দামানে এসে পাঁচ একর অর্থাৎ পনেরো বিঘা জমি পাওয়ার পর মাখনদের চাষবাস ছাড়া আর কোনও গতি নেই; বাকি জীবনটা এই নিয়েই কাটিয়ে যেতে হবে। শুধু তারাই নয়, ছুতোর, কর্মকার, জেলে, বারুই, মল্ল, সকলেরই এক হাল। চোদ্দ পুরুষের বৃত্তি খুইয়ে এখানে আজীবন হয়তো জমিতে লাঙল ঠেলেই চলতে হবে।
আজ সকাল থেকে অন্য সবার মতো মাখন, মাখনের বউ কালী আর তিন ছেলে মেঘু, শীতল আর গাকে নিয়ে অন্য উদ্বাস্তুদের মতো তাদের জমির আগাছা শিকড়বাকড় তুলে দড়ি দিয়ে বিশাল বিশাল একেকটা বান্ডিল বেঁধে খেতের একধারে জমা করে রাখছিল।
ওদিকে বৃন্দাবনদের জমির কোণের দিকে আগাছার বাণ্ডিলের পাহাড়। কম করে চল্লিশ পঞ্চাশটা বাণ্ডিল তো হবেই। জলডেঙ্গুয়ার ঝাড়ে দা চালাতে চালাতে বৃন্দাবনের নজর সেদিকে চলে যায়। একটু দূরে মায়া গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে শিকড়বাকড় তুলছিল। সে তাকে বলল, ‘মায়া, মেলা (অনেক) বোঝা জইমা গ্যাছে। এক কাম করি, এগুলানরে (এগুলোকে) পুবের পাহাড়ে রাইখা আহি (আসি)।
একটানা জমিতে কাজ করে চলেছে মায়া। তার কপালে দানা দানা ঘাম জমেছে। পরিশ্রমে মুখটা লাল টকটকে। হাওয়ায় চুল উড়ছে। শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে সে বলল, ‘লও (চল), আমিও তুমার লগে (সঙ্গে) বোঝা লইয়া যাই।
মাথা নাড়তে নাড়তে বৃন্দাবন বলল, না না, এই কাম মাইয়ামাইষের (মেয়েমানুষের) না; তুমি পারবা না। আহো (এসো), আমার মাথায় বোঝা তুইলা দিবা।
মায়া অনেক বোঝালো, দু’জনে বান্ডিলগুলো নিয়ে গেলে কাজটা তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু কোনওভাবেই রাজি হল না বৃন্দাবন। অগত্যা ধরাধরি করে দুটো বান্ডিল তার মাথায় তুলে দিল মায়া।
বৃন্দাবনকে যেতে হবে মাখনদের জমির ওপর দিয়ে। যখনই সে আর মায়া এইভাবে যাতায়াত করে, মাখনরা তীব্র বিরক্তি এবং ঘৃণায় ভুরু কুঁচকে তেরছা নজরে তাকায়। বুঝিয়ে দেয়, জেফ্রি পয়েন্টের অন্য উদ্বাস্তুরা যতবার খুশি তাদের জমিতে আসুক আপত্তি নেই, কিন্তু বৃন্দাবনদের যাওয়া আসাটা তাদের ঘোর অপছন্দ। পারলে ওদের ছিঁড়ে খায় কিন্তু কিছুই করার নেই। পুনর্বাসন দপ্তরের কর্তারা, বিশেষ করে শেখরনাথ হুশিয়ারি দিয়েছেন কেউ বৃন্দাবনদের সঙ্গে ঝামেলা করলে তার ফল ভাল হবে না। তাই মুখ বুজে, নিঃশব্দে অঙ্গভঙ্গি করেই মাখনদের সন্তুষ্ট থাকতে হয়।
সনাতনের সঙ্গে সেই ঝঞ্ঝাটের পর মায়া আর বৃন্দাবন নিজেদের পুরোপুরি গুটিয়ে নিয়েছিল। তারা বুঝে গেছে সৃষ্টিছাড়া এই কলোনিতে তাদের বান্ধব বলতে উদ্বাস্তুদের মধ্যে একজনও নেই। নেহাত পুনর্বাসনের অফিসাররা আর শেখরনাথ মাথার ওপর আছেন, তাই কোনওরকমে টিকে আছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।