মায়া যে বৃন্দাবনের বিয়ে-করা বউ নয়, কোনওদিনই তা জানা যেত না যদি ধূমকেতুর মতো সনাতন জেফ্রি পয়েন্টে এসে না পড়ত। সনাতনের মতো হাড্ডিসার, পোকায়-কাটা, শীর্ণ চেহারার লোক যে কিনা নিজের স্ত্রীকে পয়সার জন্য বেচে দিতে চায় সে ভেতরে ভেতরে কতটা সাঘাতিক তাও অজানাই থাকত।
সেদিন বৃন্দাবনের মৃত্যু ছিল অবধারিত। তাকে সনাতনের মারমুখী হামলা থেকে রক্ষা করে একধারে দাঁড় করানো হয়েছিল, খানিকটা দূরে সনাতনকে। বৃন্দাবন কারও দিকে তাকাতে পারছিল না; অন্যের বউকে ভাগিয়ে আনা এবং তা ধরা পড়ে যাওয়ায় তার মুখে একটা তীব্র অপরাধী অপরাধী ভাব। সনাতন অবশ্য রক্তচক্ষু মেলে বৃন্দাবনকে দেখছিল আর জান্তব ক্রোধে দাঁতে দাঁত ঘষে চাপা হুঙ্কার ছাড়ছিল; পারলে সে তখন বৃন্দাবন আর মায়াকে ছিঁড়ে খায়।
তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল জেফ্রি পয়েন্টের সব উদ্বাস্তুরা এবং বনবিভাগ আর পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীরা। আর দুটো চেয়ারে বসে ছিলেন শেখরনাথ আর বিনয়। এমন একটা চমকদার ঘটনা আন্দামানের ঘোর জঙ্গল এবং পাহাড়ে-ঘেরা সৃষ্টিছাড়া, দুর্গম সেটলমেন্টে ঘটতে পারে, স্বচক্ষে দেখেও কেউ যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।
শেখরনাথ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় মানুষ। ব্রিটিশ আমলের প্রাক্তন এই বিপ্লবীর ব্যক্তিত্বও প্রবল। তার সামনে কেউ টু শব্দটিও করছিল না। বৃন্দাবন-সনাতনদের সমস্ত কাহিনী শোনার পর তিনি কী বলেন তা শোনার জন্য উদ্বাস্তুরা উদগ্রীব হয়ে ছিল। কেননা এর মধ্যেই তারা জেনে গেছে শেখরনাথ যা বলবেন, প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা নিঃশব্দে তা মেনে নেবেন।
শেখরনাথ আর সনাতনকে জেফ্রি পয়েন্টের সেটলমেন্টে রাখা সঙ্গত মনে করেননি। সে এখানে থাকলে নিত্যনতুন ঝঞ্জাট বাধিয়ে বসবে। কোনও দিন রক্তারক্তি কান্ডও ঘটিয়ে ফেলতে পারে। এত বড় ঝুঁকি নেওয়া যায় না। তাই তাকে ষাট মাইল দূরের মিডল-আন্দামানে পাঠিয়ে দেবার বন্দোবন্ত করে দিয়েছেন। যে সমুদ্রে ঝাঁকে ঝাকে হিংস্র হাঙর ঘুরছে সাঁতরে সেটা পাড়ি দিয়ে এখানে এসে হামলা করার সাহস তার হবে না।
শেখরনাথের সিদ্ধান্ত মুখ বুজে জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তুরা শুনে গেছে; সনাতনের এখান থেকে চলে যাওয়াটাও দেখেছে। কিন্তু মনে মনে এটা কেউ মেনে নিতে পারেনি। একটা জন্তুর হাত থেকে মায়াকে রক্ষা করে বৃন্দাবন যত মহত্ত্বই দেখাক, তাদের কাছে অন্যের বউকে চুরি করে আনাটা একটা অত্যন্ত গর্হিত অপরাধ। তারা বৃন্দাবনের গায়ে নারীহরণকারীর অদৃশ্য একটা তকমা লাগিয়ে দিয়েছিল। আর মায়া তাদের চোখে দুশ্চরিত্র, নোংরা মেয়েমানুষ। স্বামী যত অমানুষই হোক, তাকে ত্যাগ করে পরপুরুষের সঙ্গে পালিয়ে আসাটা মহাপাপ। সেটলমেন্টের অন্য উদ্বাস্তুরা পারতপক্ষে ওদের সঙ্গে কথা বলে না। কিন্তু একই কলোনিতে ব্যারাকবাড়িতে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। উঠতে বসতে দেখাও হয় নিত্যদিন। চোখাচোখি হলে নাক কুঁচকে, তেরছা নজরে সবাই এমনভাবে তাকায় যেন দু’টো পচা বিষ্ঠার পোকা তাদের চারপাশে অনবরত ঘুরছে। বৃন্দাবন আর মায়ার প্রতি এই লোকগুলোর যে কী তীব্র ঘৃণা! অথচ তারা একবারও ভেবে দেখে না বৃন্দাবন মায়াকে রক্ষা না করলে কোন জাহান্নামে গিয়ে ঠেকত মেয়েটা।
৪.১৫ শেখরনাথকে অমান্য করার ক্ষমতা
৪.১৫
শেখরনাথকে অমান্য করার ক্ষমতা জেফ্রি পয়েন্টের উদ্বাস্তুদের কারও নেই। বৃন্দাবন আর মায়ার ব্যাপারে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন কেউ যেন ওদের উত্যক্ত না করে। কিছুদিন নিষেধাজ্ঞাটা তারা মুখ বুজেই মেনে নিয়েছে, অনেকটা নিরুপায় হয়েই। কিন্তু ঘৃণা যেখানে প্রবল, কতদিন আর চুপচাপ থাকা যায়। উদ্বাস্তুদের ধারণা, শেখরনাথ ঠিক করেন নি। স্বামীত্যাগী একটি মেয়েমানুষ এবং যে তাকে ফুসলে নিয়ে এসেছে তাদের আশকারা দেওয়াটা খুবই অনুচিত কাজ। এটা জেফ্রি পয়েন্টবাসী ছিন্নমূল মানুষগুলোর কাছে একটা যারপরনাই খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। কিন্তু কার ঘাড়ে ক’টা মাথা যে শেখরনাথের মুখের ওপর কথা বলে!
আবহাওয়াটা থমথমে হয়েই ছিল। যে কোনও সামান্য ছুতোনাতায় একটা বিস্ফোরণ যে ঘটে যাবে সেটা বৃন্দাবন আর মায়া বুঝতে পারছিল। পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মচারী, অফিসার আর শেখরনাথকে বাদ দিলে আর কেউ যে তাদের পাশে নেই সেটা পদে পদে ওরা টের পাচ্ছিল। জেফ্রি পয়েন্টের প্রায় সব উদ্বাস্তু তাদের শত্রুপক্ষ। এই চক্রব্যুহে তারা মুখ বুজেই থাকে। সরকারি কর্মচারী বা শেখরনাথের জন্য কেউ তাদের ওপর হয়তো চড়াও হবে না; কিন্তু কেউ যদি তাদের সঙ্গে কথা না বলে, তাদের শুনিয়ে শুনিয়ে নিজেদের মধ্যে চোখা চোখা মন্তব্য করে যায়, এই নির্বান্ধব পরিবেশে তারা থাকবে কী করে? যথেষ্ট বারুদ মজুদ হয়েই ছিল। শুধু ছোট্ট একটা আগুনের ফুলকি এসে পড়ার অপেক্ষা। আজ সেই ফুলকিটাই এসে পড়ল। তার ফলে তুলকালাম কাণ্ড ঘটে গেল।
সকালবেলা চা রুটি টুটি খেয়ে যে উদ্বাস্তুরা তাদের ভাগের জমি পেয়ে গেছে তারা নিজের নিজের জমিতে কাজ শুরু করে দিয়েছিল। কাজ বলতে আগাছা, ঝোঁপঝাড়, পুরনো গাছের শিকড়-বাকড় উপড়ে ফেলা। প্রায় সবার জমিতেই জলডেঙ্গুয়ার (বনতুলসী) চাপ-বাঁধা জঙ্গল; সেসব সাফ করা। এইসব জলডেঙ্গুয়া কয়েক শো বছর ধরে আন্দামানের মাটিতে ঝাড়েবংশে বেড়ে উঠেছে। উর্বর জমি পেয়ে প্রতিটি বনতুলসী এক মানুষ দেড়মানুষের মতো লম্বা; এদের শিকড় মাটির তলায় তানেক দূর অবধি ছড়িয়ে আছে। জলডেঙ্গুয়ার বংশ নিপাত করতে না পারলে ধান চাষ একেবারেই অসম্ভব।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।