.
সব জানিয়ে নিত্যানন্দ হাতজোড় করে শেখরনাথকে বলেছে, বড়কত্তা, দুখী বুড়া মানুষরে পথে ফালাইয়া আইতে পারি নাই। কইলকাতায় আইয়া (এসে) কয়দিন শিয়ালদার ইস্টিশানে আছিলাম। হেরপর রিলিপ কেম্পে ছয়-সাত মাস। হেরপর এই আন্ধারমানে (আন্দামানে)। হারাদিনে (সারা দিনে) দুই-একটার বেশি কথা কয় না। হারাক্ষণ (সারাক্ষণ) মুখ বুইজা থাকে। শোকে মানুষ পাথর অইয়া (হয়ে) গ্যাছে। কুনো কুনো সোমায় বুক ফাটাইয়া কানতে (কাঁদতে) থাকে। একটু চুপ। তারপর ফের শুরু করল সে, ‘খুড়িমারে লইয়া আইয়া (নিয়ে এসে) কি দুষ (দোষ) করছি? কুনো অন্যায় অইচে (হয়েছে)?
শেখরনাথ চেয়ার থেকে উঠে এসে নিত্যানন্দর মাথায় হাত রাখলেন। গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কোনও অন্যায় করো নি। বরং পুণ্যের কাজ করেছ। তোমার মঙ্গল হোক। যাও, এবার সবাই শুয়ে পড়।‘
বিনয়কে সঙ্গে করে নিজেদের ঘরে ফিরে এলেন শেখরনাথ। লণ্ঠনটা টেবিলের ওপর রাখতে রাখতে বিনয় বলল, ‘নিত্যানন্দর মতো মানুষ আমি আগে কখনও দেখি নি কাকা। বিপদ আপদ, নানারকম আশঙ্কার মধ্যেও একটি নিরাশ্রয় বৃদ্ধাকে সঙ্গে করে ওপার থেকে নিয়ে এসেছে।‘
শেখরনাথ সায় দিলেন।–’ঠিকই বলেছ। এই মহা দুঃসময়ে, চরম সংকটেও লোকটা মনুষ্যত্বকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এটা বিরাট ব্যাপার। নিত্যানন্দ খুব সম্ভব নিরক্ষর। কিন্তু বহু মহা মহা পণ্ডিতের থেকেও ওর মহত্ত্ব অনেক বেশি।
একটু চুপচাপ।
শেখরনাথের ‘ওয়েস্ট এন্ড ওয়াচ’ কোম্পানির একটা সেকেলে গোলাকার পকেট-ঘড়ি আছে। সেটা কখনও তাকে ব্যবহার করতে দেখে নি বিনয়; যেখানে সেখানে ফেলে রাখেন। বালিশের তলা থেকে ঘড়িটা বের করে দেখতে দেখতে বললেন, ‘অনেক রাত হয়ে গেছে। দু’টো বেজে সাঁইত্রিশ। লণ্ঠন নিবিয়ে দিচ্ছি।’ তাড়া দিতে লাগলেন, ‘আজ আর তোমাকে লেখালিখি করতে হবে না। এখন ঘুমোও। জেগে থাকলে শরীর খারাপ হবে।‘
আলো নিবে গেছে। ঘর অন্ধকার।
বিনয় শুয়ে পড়েছে ঠিকই। পোর্টব্লেয়ারের পেনাল কলোনি শাদিপুর নিয়ে প্রতিবেদনটা মাত্র তিনচার পাতা লিখেছে সে। বাকিটা না হয় কাল লেখা যাবে। কিন্তু কিছুতেই ঘুম আসছে না। তারার মায়ের কান্না অনেক আগেই থেমে গেছে। কিন্তু সেটা যেন জেফ্রি পয়েন্টের সৃষ্টিছাড়া এই স্তব্ধ নিশুতি রাতে ফের শোনা যাচ্ছে। হয়তো কাল্পনিক। কিছুক্ষণ আগে কান্নাটা শুনতে শুনতে মনে হয়েছিল এমন কান্না আরও অনেক জায়গায় শুনেছে, কিন্তু কোথায় কোথায়, তখন মনে করতে পারে নি; এবার পারল। সেই কান্না সে শুনেছে ঝিনুককে আগলে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসার সময় তারপাশা স্টিমারঘাটায় হরিদাস সাহা নামে একটা আধবুড়ো সর্বস্বখোয়ানো উদ্বাস্তুর বউয়ের গলায়, শুনেছে গোয়ালন্দ থেকে কলকাতার ট্রেন রিফিউজি স্পেশালের কামরায়, শিয়ালদা স্টেশনের চত্বরে, যুগলদের মুকুন্দপুর কলোনিতে। প্রিয়জনদের হারিয়ে আসার অবিরল ক্রন্দন। কেউ হারিয়েছে যুবতী মেয়েকে, কেউ ছেলেমেয়ে স্বামী বা অন্য কারওকে। সারা উপ-মহাদেশ জুড়ে এই শোকার্ত হাহাকার হাজার বছরেও বুঝিবা থামবে না।
বুকে অব্যক্ত একটা কষ্ট হচ্ছে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। তার মধ্যে দু’চোখ বুজে এল বিনয়ের।
.
৪.১৪
আন্দামানে পুনর্বাসনের জন্য আসার কথা শুনলে সব উদ্বাস্তুই আতঙ্কে সিটিয়ে যায়। শিয়ালদা স্টেশনের চত্বরে কিংবা ত্রাণশিবিরের নরককুণ্ডগুলোতে তারা পচেগলে মরবে, তবু বঙ্গোপসাগরের অজানা এই দ্বীপপুঞ্জে কদাপি নয়। তাদের ভয় আন্দামানে নিয়ে যাওয়াটা একটা সরকারি চক্রান্ত। কিসের চক্রান্ত সে সম্বন্ধে তাদের পরিষ্কার কোনও ধারণা নেই, তার ওপর জাহাজে চারদিন পাড়ি দিয়ে নাকি সেখানে পৌঁছতে হয়। এই সব কারণেই একটা প্রচন্ড ভীতিতে তাদের শ্বাসপ্রশ্বাস আটকে আসতে থাকে। কিন্তু বৃন্দাবন অন্য সবার থেকে আলাদা। আন্দামানে আসার নামে সে মনে মনে প্রায় নেচে উঠেছিল। প্রথম সুযোগটি পাওয়ামাত্র মায়াকে নিয়ে পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীদের সঙ্গে সরকারি ট্রাকে চড়ে খিদিরপুর ডকে গিয়ে ‘এস এস মহারাজা’ জাহাজে উঠেছিল।
বৃন্দাবন এক তরতাজা, হাসিখুশি যুবক। তেইশ চব্বিশ বছরের মায়াও প্রায় তারই মতো। তার টানাটানা দীঘল চোখে, সুন্দর ভরাট মুখটিতে সর্বক্ষণ হাসি লেগেই থাকে। মনে হয় পৃথিবীতে তাদের মতো সুখী যুবক-যুবতী আর একজোড়া কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিশেষ করে জেফ্রি পয়েন্টে রিফিউজি কোটায় পনেরো বিঘে জমি পাওয়ার পর তাদের আনন্দ আর ধরে না। বিপুল উদ্যমে সেই সকাল থেকে সূর্যাস্ত অবধি জমির ছোট ছোট গাছ কেটে, ঝোঁপঝাঁপ, বনতুলসীর ঝাড় নির্মূল করে চলেছে তারা। তারপর হাল-লাঙল নামিয়ে আবাদের যোগ্য করে তুলবে। তাছাড়া জমিরই এক কোণে গড়ে নেবে ঘরবাড়ি। সুদূর পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা ডিস্ট্রিক্টের বিক্রমপুরে যা তারা ফেলে এসেছে এই দ্বীপের এক প্রান্তে অবিকল তারই আদলে সৃষ্টি করবে স্বপ্নের বাসস্থান। এমনই একটা ঝলমলে ভবিষ্যতের পরিকল্পনা চোখের সামনে রেখে ঠিকঠাক এগিয়ে যাচ্ছিল বৃন্দাবন আর মায়া।
কিন্তু এই সেদিন যে ছত্রিশটা নতুন ডি পি ফ্যামিলি জেফ্রি পয়েন্টে পুনর্বাসনের জন্য এল তাদের মধ্যে ছিল সনাতন দাস। রোগা, ক্ষয়াটে চেহারার আধাবয়সি এই লোকটা একাই এসেছে। জেফ্রি পয়েন্টে পৌঁছেই সে রীতিমতো তাণ্ডব ঘটিয়ে দিয়েছে। বৃন্দাবন আর মায়াকে এখানকার সেটলমেন্টে দেখতে পেয়ে একেবারে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিল। প্রচণ্ড আক্রোশে গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বৃন্দাবনের ওপর; শরীরের সবটুকু শক্তিতে তার গলার নলী ঠেসে ধরেছিল। ছিঁড়েই হয়তো ফেলত; শেখরনাথের জন্যই বৃন্দাবন বেঁচে যায়। সনাতনের এমন দানবিক ক্রোধের কারণটা হল, দেশভাগের পর সে তার বিবাহিত স্ত্রী মায়াকে নিয়ে ভারতে এসে শিয়ালদায় হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষের সঙ্গে আশ্রয় নেয়, তাদের ঠিক পাশেই থাকত বৃন্দাবনরা। মায়াকে ফুঁসলে তাকে নিয়ে গোপনে আন্দামানে চলে আসে বৃন্দাবন। সনাতন কিন্তু সরল সিধে ভালমানুষ নয়। শিয়ালদায় থাকতে থাকতে সে মায়াকে কলকাতার এক বেশ্যাপাড়ার দালালদের কাছে প্রচুর টাকায় বেচে দেবার ছক আঁটে। সেটা জানার পর মায়া উদ্ভ্রান্তের মতো বৃন্দাবনকে আঁকড়ে ধরে। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পাশাপাশি থাকতে থাকতে দু’জনের মধ্যে চোরা একটা টান চলছিল, যার আরেক নাম ভালবাসা। রোজ সীমান্তের ওপার থেকে ‘রিফিউজি স্পেশাল’ নামের ট্রেনটি আগাপাশতলা বোঝাই হয়ে হাজার হাজার উদ্বাস্তু অবিরল আসছে তো আসছেই। হয়তো শতবর্ষ ধরে আসতেই থাকবে। আগে যারা এসেছিল তাদের সঙ্গে প্রতিদিন এসে মিলছে আরও অজস্র। চারিদিকে থিক থিক করছে মানুষ। শোকাতুর, নিঃস্ব, ভগ্ননীড়। কত ধ্বংস, কত বিপর্যয়, কত মৃত্যু, কত রক্তস্রোতের ভেতর দিয়ে যে তাদের আসতে হয়েছে। এইসব মানুষের সামনে কোনও আশা নেই, আলো নেই, ভবিষ্যৎ নেই। শুধুই অন্তহীন নৈরাশ্য, গাঢ় অন্ধকার আর অনিশ্চয়তা। তবু তারই মধ্যে একটি যুবক আর একটি যুবতীর মধ্যে প্রেম-ভালবাসা সঙ্গোপনে তার কাজ করে যাচ্ছিল, হোক না তা নিষিদ্ধ।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।