জনতা কাছাকাছি চলে এসেছে। কিন্তু কেউ কারওকে কিছু জিগ্যেস করছে না। পাশাপাশি হেঁটেই চলেছে।
আচমকা ভোরের অপার নৈঃশব্দ্যকে চিরেফেঁড়ে করুণ আর্ত চিৎকার, তার সঙ্গে মেশানো অস্পষ্ট বিলাপের মত কিছু। অবিরল কাঁদতে কাঁদতে কেউ যেন কী বলে চলেছে, তার একটি বর্ণও বোঝা যাচ্ছে না। সেই কাতর আর্তি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যেন অন্তহীন বিষাদ ছড়িয়ে দিচ্ছিল।
নিত্যানন্দ চমকে উঠেছিল। কে কাঁদে? এধারে ওধারে তাকাতে তাকাতে চোখে পড়ল, একটা বড় ডালপালাওলা গাছের তলায় একজন বুড়ো মেয়েমানুষ বসে আছে। সে-ই কেঁদে চলেছে। ছেদহীন, একটানা সেই কান্না।
নিত্যানন্দদের সঙ্গে যে বিশাল মানবগোষ্ঠী হাঁটছিল তারা কিন্তু বয়স্ক মেয়েমানুষটির দিকে ফিরেও তাকায় নি। এলাকাটা পেরিয়ে যত দ্রুত ভাগ্যকূলে পৌঁছনো যায়, সেটাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। পথের পাশে বসে কে আকুল হয়ে কাঁদছে, কতটা শোক বা যন্ত্রণায় তার বুকের ভেতরটা খান খান। হয়ে যাচ্ছে, দু-চার লহমা দাঁড়িয়ে যে সেই খবরটা নেবে তেমন সময় কারও নেই।
নিত্যানন্দর কেন যেন মনে হয়েছিল মেয়েমানুষটি অত্যন্ত বিপন্ন। অন্য সবার মতো সে তাকে এড়িয়ে যেতে পারে নি। কাছে গিয়ে তার কান্নার কারণটা জানতে চেয়েছিল। হঠাৎ কান্না থামিয়ে একেবারে চুপ বুড়ো মানুষটি। নিত্যানন্দ এবার জিগ্যেস করেছে, ‘আপনের লগে (সঙ্গে) আর কেওরে (কারওকে) তো দেখতে আছি না। আপনে কি এক্কেরে (একেবারে) একা?’ এবার আস্তে মাথা নেড়েছে মেয়েমানুষটি। অর্থাৎ তা-ই। নিত্যানন্দ বলেছে, ‘এইহানে (এখানে) বইয়া (বসে) আছেন ক্যান? আপনেগো কুন (কোন) গেরাম?’ সাড়া পাওয়া যায় নি। নিত্যানন্দ কিন্তু তাকে ছাড়ে নি।–’আপনে কি কুনোহানে (কোথাও) যাইতে চান?’ মাথা হেলিয়ে পশ্চিম দিকে আঙুল বাড়িয়ে দিয়েছিল মেয়েমানুষটি। কিছু একটা আন্দাজ করে নিত্যানন্দ বলেছে, ‘আপনে কি ইণ্ডিয়ায় যাইতে চান?’ জোরে মাথা ঝাঁকিয়েছে মেয়েমানুষটি। অর্থাৎ সে ভারতেই যেতে চাইছে। অবাক হয়ে গেছে নিত্যানন্দ ‘আপনের নিজের মানুষজন তো কেওরে (কারওকে) দেখি না। একা একা কেমনে অত দূর দ্যাশে (দেশে) যাইবেন? মেয়েমানুষটি ফের আগের মতোই আকুল কান্নায় ভেঙে পড়েছে। কান্নাজড়ানো ভাঙা ভাঙা গলায় বলেছিল, ‘পিরথিমীতে (পৃথিবীতে) আমার কেও (কেউ) নাই। হগল (সকল) শ্যাষ। নিত্যানন্দ হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে থেকেছে অনেকক্ষণ। নিঃসঙ্গ বয়স্ক মেয়েমানুষটিকে এভাবে ফেলে রেখে চলে যেতে তার পা সরে নি। অগুনতি সন্ত্রস্ত, ছিন্নমূল মানুষ উধ্বশ্বাসে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল, কিন্তু নিত্যানন্দ তা পারে নি। উলুপীর সঙ্গে পরামর্শ করে মেয়েমানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে স্টিমারঘাটায় চলে এসেছিল। সীমান্তের ওপারে পৌঁছবার পর তারা কোথায় থাকবে, কী খাবে, আদৌ কোনও আশ্রয় পাবে কিনা, ঠিক নেই। নিত্যানন্দ ভেবেছে তাদের যা হবার বয়স্কা মেয়েমানুষটিরও তাই হোক। একটা বাড়তি মানুষকে সঙ্গে নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঝাঁপ দিয়েছিল সে।
ভাগ্যকূলে গিয়ে চোখে পড়েছিল অজস্র মানুষে চারিদিক ছয়লাপ। সামনে পেছনে ডাইনে বাঁয়ে সেদিকেই তাকানো যাক, ভীত সন্ত্রস্ত সারি সারি মুখ। ভীষণ দমে গিয়েছিল নিত্যানন্দ। কেননা গোয়ালন্দের স্টিমার দিনে মাত্র একটা। দিন সাতেক ভাগ্যকূলে পড়ে থাকার পর তারা স্টিমারে উঠতে পেরেছিল। গোয়ালন্দে এসে আবার তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে, কারণ সেখানেও কত দিক থেকে কত মানুষ যে জড়ো হয়েছে! শেষ পর্যন্ত রিফিউজি স্পেশাল নামে ট্রেনে উঠতে পেরেছিল তারা। স্টিমারে আর ট্রেনে আসার সময় মাঝেমাঝেই মেয়মানুষটি বুকফাটা চিৎকার করে উঠেছে। এর ভেতরেই নিত্যানন্দ তাকে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে যেটুকু জানতে পেরেছে তা হল মেয়েমানুষটির গ্রামের নাম নবীগঞ্জ। পূর্ব পাকিস্তানের অন্য সব এলাকার মতো সেখানেও শুরু হয়েছিল একতরফা হত্যা, ধর্ষণ, ঘরে ঘরে আগুন জ্বালিয়ে আদিম বর্বরতা। একদিন তার স্বামী আর দুই জোয়ান ছেলেকে তার চোখের সামনে কুপিয়ে শেষ করে দিয়েছিল জন্তুর দল। রক্তের স্রোত বয়ে গিয়েছিল তাদের উঠোনে। চাপ চাপ তাজা রক্ত। তাদের সতেরো বছরের যুবতী একটি মেয়ে ছিল–তারা। সে ভয়ে ঘরের ভেতর তক্তপোষের তলায় লুকিয়ে ছিল; ঘাতকবাহিনী হিংস্র চিতার মতো গন্ধ পেয়ে তাকে টেনে বের করে এনেছিল। উঠোনের এক কোণে দাঁড়িয়ে একেবারে পাথর হয়ে গেছে বয়স্ক মেয়েমানুষটি। চোখের সামনে এইসব হাড়হিম-করা দৃশ্য দেখতে দেখতে মাটিতে আছড়ে পড়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে মূৰ্ছা। জ্ঞান ফেরার পর দেখেছে তাদের ঢেউ-টিনের চাল আর কাঁচা বাঁশের বেড়ার চারখানা বড় বড় ঘর নিয়ে যে বাড়ি সেটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তারা এবং সেই ঘাতকের দঙ্গলটা নেই। উঠোনের মাঝখানে জমাট-বাঁধা থকথকে রক্তের ভেতর পড়ে আছে তিনটে ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ। তার স্বামীর মাথাটা ধড় থেকে আলাদা হয়ে চামড়ার সঙ্গে কোনওরকমে আটকে আছে।
বিভীষিকায়-ভরা এই দৃশ্যগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ উন্মাদের মতো চিৎকার করে ওই হত্যাপুরী পেছনে ফেলে উধ্বশ্বাসে মেয়েমানুষটি দৌড়তে শুরু করেছিল। এক মুহূর্তও সে আর পাকিস্তানে থাকবে না। ধানখেত পাটখেতের ভেতর দিয়ে, খালবিলের ধার দিয়ে ছুটতে ছুটতে ভাগ্যকূলের স্টিমারঘাটার কাছাকাছি চলে এসেছে মেয়েমানুষটি। সে শুনেছে, বর্ডারের ওপারে ইন্ডিয়ায় পৌঁছতে পারলে প্রাণটা অন্তত বেঁচে যাবে। প্রিয়জনদের এভাবে হারিয়ে সে পাকিস্তানে একা-একা থাকবে কী করে? তার নামটা কোনওদিনই জানতে পারে নি নিত্যানন্দরা। যতবার জিগ্যেস করেছে বলেছে, সে তারার মা। নিত্যানন্দরা তাকে ডাকে খুড়িমা।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।