লোকটা বলল, ‘নিত্যানন্দ বণিক। তয় (তবে) চিনাজানা (চেনাজানা) মাইষে (মানুষরা) নিত্যা কইয়া ডাকে।‘
‘নিত্যানন্দ, এবার ওই বৃদ্ধার কথা বল—’
যেসব উদ্বাস্তুরা কান্নার আওয়াজে ঘুম থেকে উঠে এসেছিল তারা কেউ ব্যারাক বা তাঁবুতে ফিরে যায় নি; অপার কৌতূহল নিয়ে কুয়াশা-ভেজা জমিতে শেখরনাথদের সামনে ঘেঁষাঘেঁষি করে উবু হয়ে বসে পড়েছে। তবে নিত্যানন্দ কিন্তু দাঁড়িয়েই রয়েছে। সে শুরু করল।–’আমাগো দ্যাশ আছিল ঢাকা জিলার ভাইগ্যকূলে (ভাগ্যকূল), ইস্টিমার-ঘাটা থিকা তিরিশ মাইল দূরে মুন্সিপুর গেরামে (গ্রামে)। উই দিকে বড় দাঙ্গার সোমায়ও (সময়ও) অশান্তি আয় (হয়) নাই। হিন্দু-মুসলমানের মইদ্যে (মধ্যে) মিলমিশ আছিল। কাইজা (কাজিয়া) বিবাদ কুনোদিন বাধে নাই। কিন্তুক পাকিস্থান হওনের পর মুসলিম লিগের গুন্ডা আর আনসারেরা পরথম পরথম (প্রথম প্রথম) হিন্দুগো শাসাইত, ভিটামাটি দ্যাশ ছাইড়া ইন্ডিয়ায় চইলা যাইতে অইব (হবে)। হের (তার)পর রাইতের আন্ধারে ঘরে ঘরে আগুন ধরাইয়া দিতে লাগল; যুবুতী মাইয়াগো টাইনা লইয়া যাইত, বাধা দিলে দাও (দা) দিয়া কোপাইয়া শ্যাষ কইরা দিত।‘
দেশভাগের ঠিক আগে সেই সময়ের অখণ্ড ভারত জুড়ে দাঙ্গা শুরু হয়েছিল। তখনকার মতো মুন্সিপুর রেহাই পেলেও পাকিস্তান কায়েম হওয়ার সময় থেকেই নিত্যানন্দদের গ্রাম শুধুই নয়, চারপাশের এলাকা একেবারে নরক হয়ে উঠেছিল; যেমন পূর্ব পাকিস্তানের অসংখ্য গ্রাম-গঞ্জে এমনটা হয়েছে। দেশভাগের আগে যত রক্তপাত হয়েছে, দেশভাগের পর হয়েছে তার বিশ পঞ্চাশ গুণ বেশি। পাকিস্তান হওয়ার পরও আগুন, ধর্ষণ, হত্যাকান্ড থামে নি।
যে ছিন্নমূল মানুষরা অনন্ত আতঙ্কে সীমান্তের ওপার থেকে পশ্চিমবঙ্গ হয়ে আন্দামানে চলে এসেছে এসব তাদের সকলেরই জানা। সীমা-পরিসীমাহীন ত্রাস আর উৎকণ্ঠা নিয়ে শুধু প্রাণ বাঁচাতে তাদের দেশ ছাড়তে হয়েছে। শ্রোতাদের কেউ সাড়াশব্দ করল না।
নিত্যানন্দ বলতে লাগল, ‘দ্যাশে আর থাকন গ্যাল না। একদিন নিশুত রাইতে আমার বউ উলুপী আর একমাত্র পোলা মংলারে লইয়া চোরের লাখান (মতো) চৈদ্দ পুরুষের ভিটা ছাইড়া বাইর অইয়া (হয়ে পড়লাম।
এরপর সে যা বলে গেল তা এইরকম। মুন্সিপুর থেকে তাদের যেতে হবে ভাগ্যকূল স্টিমার ঘাটায়। সেখান থেকে স্টিমার ধরে গোয়ালন্দ। গোয়ালন্দ থেকে রিফিউজিদের জন্য স্পেশাল ট্রেনে চেপে কলকাতার নিরাপদ আশ্রয়ে।
ভাগ্যকূল তো ঘরের কাছে নয়; পাক্কা তিরিশ মাইল দূরের পথ। এতটা রাস্তা পায়ে হেঁটে যে যাবে, তাতে প্রাণের ঝুঁকি আছে। আনসার আর লিগের ঘাতকবাহিনী দা কুড়াল তলোয়ার বর্শা ট্যাটা এমন সব মারণাস্ত্র নিয়ে তক্কে তক্কে থাকে। কাফের দেখলে নিস্তার নেই; ঝাঁপিয়ে পড়বে।
পূর্ব পাকিস্তানের সকলেই তো আর অমানুষ হয়ে যায় নি, দয়ামায়া আছে এমন মানুষের সংখ্যাও প্রচুর। এক পরিচিত বিশ্বাসী মাঝি ঘুরপথে খালবিল আর একটা ছোট শাখানদী পেরিয়ে নির্জন, জংলা জায়গায় এসে নৌকা থামাল। সেখান থেকে ভাগ্যকূল দু-আড়াই মাইলের বেশি হবে না। এই দিকটা তখনও হানাদারদের নজর এড়িয়ে শান্তই আছে। কোনওরকম গন্ডগোল হয়নি।
মাঝির নাম ফকিরা। সে বলেছিল, ‘নিত্যাভাই, তুমরা এহানে (এখানে) লাইমা (নেমে) যাও। যত তরাতরি পার, পাও (পা) চালাইয়া ইস্টিমারঘাটায় চইলা যাইবা। আল্লার মেহেরবানিতে তুমাগো কুনো বিপদ অইব (হবে) না; তেনিই (তিনিই) রক্ষা করবেন।
নেমে পড়েছিল নিত্যানন্দরা, ফকিরা নৌকোর মুখ ঘুরিয়ে ফিরে গিয়েছিল।
তখনও ভোরের আলো ফোটে নি। আবছা আবছা অন্ধকারে ভরে আছে চরাচর। এলাকাটায় গন্ডগোল না বাধলেও, বাধতে কতক্ষণ। পূর্ব পাকিস্তানে যে কোনও গ্রামগঞ্জে বা শহরে যখন তখন আগুন জ্বলে উঠতে পারে, বয়ে যেতে পারে রক্তের স্রোত। পৃথিবীর এই ভূখণ্ডে চিরশান্তির কোনও অঞ্চল বলে কিছু নেই।
নিত্যানন্দের মাথায় টিনের একটা বাক্স, তার বউ উলুপীর কাখে শতরঞ্চি-বাঁধা বিছানা এবং দু’চারটে কাপড়চোপড়, তাদের বারো বছরের ছেলে মংলা বা মঙ্গলের কাঁধে কাপড়ের থলিতে টুকিটাকি কিছু জিনিসপত্র। যেটুকু বওয়া সম্ভব ঠিক ততটুকু নিয়েই তারা বেরিয়ে পড়েছে। বাকি সমস্ত কিছু পেছনে পড়ে থেকেছে।
নিত্যানন্দরা শুনেছে, একবার ভাগ্যকূলে পৌঁছতে পারলে কিছুটা হলেও আতঙ্ক কাটবে। স্টিমার ঘাটায় নাকি কিছু পুলিশ-টুলিশ দেওয়া হয়েছে। দেশ ছেড়ে যারা চলে যাচ্ছে, যৎসামান্য হলেও ব্যবস্থা করা হয়েছে তাদের নিরাপত্তার।
নিত্যানন্দরা নিঃশব্দে এগিয়ে যাচ্ছিল। বুকের ভেতর অনন্ত উৎকণ্ঠা। দু-আড়াই মাইল রাস্তা কোনওরকমে পেরিয়ে যেতে পারলে মোটামুটি স্বস্তি। ( হঠাৎ চোখে পড়ল পেছন থেকে আরও অনেকে আসছে। আধো-অন্ধকারে সারি সারি ছায়ামূর্তির দঙ্গল। ঘাসের ওপর দ্রুত পা চালিয়ে হাঁটার অস্পষ্ট আওয়াজ ছাড়া মুখে কারও টু শব্দটি নেই।
প্রথমটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল নিত্যানন্দরা। ঘাতক-বাহিনী নয় তো? পরক্ষণে চোখে পড়েছিল ছায়ামূর্তিগুলির মাথায় বা কাঁধে তাদের মতোই বাক্স বা নানা আকারের ছোটবড় পোঁটলাটলি। ওই দঙ্গলটার মধ্যে রয়েছে বুড়োধুড়ো, কাচ্চাবাচ্চা, নানা বয়সের পুরুষ এবং মেয়েমানুষ। শ্বাসপ্রশ্বাস সহজ হয়ে এসেছিল নিত্যানন্দদের। না, ভয়ের কারণ নেই। নারী-পুরুষের ওই দঙ্গলটাও তাদের মতোই এই হননপুরী পেছনে ফেলে চিরকালের মতো চলে যাচ্ছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।