পায়ের শব্দে মুখ তুলে তাকালেন বিশ্বজিৎ। বললেন, ‘বসুন—’
বিশ্বজিতের দিকে চোখ রেখে মুখোমুখি একটা সোফায় বসে পড়ল বিনয়।
বিশ্বজিৎ ধীরে ধীরে মাথাটা ডাইনে থেকে বাঁয়ে, বাঁয়ে থেকে ডাইনে হেলাতে হেলাতে বললেন, ‘নো স্যার, তাপসী লাহিড়ি বা ঝিনুক নামে কারওকে পাওয়া গেল না। আমি পুরো লিস্টটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছি। ওই নাম দু’টো কোত্থাও নেই।’
এক ফুঁয়ে সব আলো কেউ যেন নিভিয়ে দিয়েছে। চতুর্দিক থেকে অনন্ত হতাশা বিনয়কে ঘিরে ধরতে থাকে।
বিহুলের মতো সে বলে, ‘নেই? বিশ্বজিৎ কী ভেবে বললেন, আমার চোখে হয়তো এড়িয়ে গেছে। আপনি বরং একবার দেখুন।
কাঁপা হাতে বিশাল লিস্টটা তুলে নেয় বিনয়। দৃষ্টিশক্তিকে প্রখর করে রুদ্ধশ্বাসে প্রতিটি পাতা আঁতিপাঁতি খুঁজতে থাকে। নেই, নেই। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অন্য কোথাও ঝিনুক থাকতে পারে কিন্তু এই তালিকায় নেই।
খিদিরপুর ডকে আর রস আইল্যান্ডে আবছাভাবে একটি মেয়ের মুখে ঝিনুকের আর্দল চোখে পড়েছিল। পরে মনে হয়েছিল, সেটা হয়লে ভুল। কিন্তু ‘চলুঙ্গা’ জাহাজে তাকে স্পষ্ট দেখা গেছে। তখন বিকেল। পড়ন্ত বেলার অজস্র আলোয় ভরে ছিল সমস্ত চরাচর। তার ভেতর চোখের ভ্রম হয় কী করে? চকিতে বিদ্যুতাড়িত গতিতে একটা সংকেত বিনয়ের মাথার ভেতর খেলে যায়। যার সঙ্গে এসে থাক, ঝিনুক তাকে নিজের আসল নামটা নিশ্চয়ই জানায়নি। এ নিয়ে তার মনে এখন আর লেশমাত্র ধন্দ নেই৷ মিডল আন্দামানে গেলে সব সংশয়ের অবসান হবে। তার সংকল্প আরও দৃঢ় হয়। মধ্য আন্দামানে তাকে যেতে হবে। যেতেই হবে।
সেন্টার টেবিলে লিস্টটা নামিয়ে রাখে বিনয়। বিশ্বজিৎ তা লক্ষ করছিলেন। জিগ্যেস করলেন, ‘নিজের চোখে দেখবে তো?’
আস্তে মাথা নাড়ে বিনয়।–‘দেখলাম। নেই।‘ মনের ভেতর কোন গূঢ় ভাবনা চলছে সেটা আর জানায় না।
রান্নার লোকটি এসে বলে, ‘সার (স্যার), খাবার হয়ে গেল দেব?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, দাও–’ বিশ্বজিৎ উঠে পড়লেন।–‘চলুন বিনয়বাবু—’
হল-ঘরের একধারে সমুদ্রের দিকের জানলার পাশে ডাই টেবিল। সেখানে গিয়ে বসতে না-বসতেই ভুবন দুজনকে বড় প্লেটে লুচি তরকারি বেগুনভাজা আর মিষ্টি দিয়ে গেল।
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘পেট ভরে খেয়ে নিন। খাওয়া হতে বেরিয়ে পড়ব। জেফ্রি পয়েন্টে পৌঁছতে পৌঁছতে বিকেল হ যাবে। তার আগে খাবারদাবার কিন্তু মিলবে না।‘
বিনয় জিগ্যেস করল, ‘জেফ্রি পয়েন্টটা কোথায়?’
এখান থেকে অনেকটা দুরে। পঞ্চাশ বাহান্ন মাইল তো হবে সমুদ্রের একটা ‘বে’ আছে ওই দিকটায়। ওখানে রিফিউজিতে নতুন সেটলমেন্ট বসানো হচ্ছে।
‘ওখানে জঙ্গল নেই?’
বিশ্বজিৎ হাসলেন।–’আন্দামানে এমন কোনও জায়গা পাবেন না যেখানে জঙ্গল নেই। জেফ্রি পয়েন্টেও ডিপ ফরেস্ট। গেলে দেখতে পাবেন।’
গভীর জঙ্গলে কীভাবে বসতি গড়ে উঠছে, ভেবে পেল না বিনয়। তবে এ নিয়ে সে আর কোনও প্রশ্ন করল না।
খাওয়া হয়ে গেলে কার্তিককে ডেকে বললেন, ‘এই স্যারে সঙ্গে ওঁর ঘরে যাও। ওঁর মালপত্র গোছগাছ করে কালীপ গাড়িতে রেখে আসবে।‘
কিছুক্ষণের মধ্যে বিনয়কে সঙ্গে নিয়ে নিচে নেমে এলেন বিশ্বজিৎ। জিপে স্টিয়ারিং ধরে বসে ছিল কালীপদ। গাড়িটা বেশ প্রশস্ত। সামনের দিকে ড্রাইভার ছাড়াও দু’জন বেশ আরাম করে বসতে পারে।
বিশ্বজিৎ তার ফ্রন্ট সিটেই উঠে বসল। বিনয়ের সুটকেস হোন্ড-অল পেছন দিকের সিটে রেখে গিয়েছিল কার্তিক।
কালীপদকে কিছু বলতে হল না। খুব সম্ভব তার জানা আছে, কোন দিকে যেতে হবে। স্টার্ট দিয়ে ঢাল বেয়ে খানিকটা নেমে ডানধারের রাস্তা ধরে জিপটাকে ছুটিয়ে নিয়ে চলল।
চড়াই উতরাই পেরিয়ে গাড়ি চলেছে তো চলেছেই। রাস্তার দু’ধারে কোথাও খাদ, কোথাও সমতল জমি। খাদে জঙ্গল মাথা তুলে আছে। কোথাও বা ধানের খেত। মাঝে মাঝে কাঠের বাড়ি, দু’চারটে দালান-কোঠা।
কাল রাত্তিরে ওই পথ দিয়েই বিশ্বজিতের বাংলোয় গিয়েছিল বিনয়। তখন পরিপূর্ণ চাঁদ আলো ঢেলে দিচ্ছিল নিচের পৃথিবীতে। সমস্ত কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। এখন এই দিনের বেলাতেও রাস্তাঘাট এবং দুধারের দৃশ্যাবলি চিনতে অসুবিধা হল না। ছবির মতো সব মাথায় গাঁথা হয়ে গেছে।
ফুঙ্গি চাউং পার হয়ে জিপের মুখ ডান পাশের রাস্তার দিকে যখন কালীপদ ঘোরাচ্ছে রীতিমতো অবাকই হল বিনয়। কেননা, তাদের বাঁ দিকে যাবার কথা। সেখানে এবারডিন বাজারের লাগোয়া দু তিনটে বাড়িতে উদ্বাস্তুরা রয়েছে। বিনয় ভেবেছিল সকালে সেখানে যাবে তারা। তারপর উদ্বাস্তুদের সঙ্গে সেটলমেন্টের দিকে রওনা হবে।
গলার স্বর সামান্য উঁচুতে তুলে বিনয় বলল, ‘এ কী, আমরা এবারডিন মার্কেটে যাব না?’ বিশ্বজিৎ বললেন, ‘না।‘
‘তা হলে?’
‘আমরা সোজা পোর্টে যাচ্ছি।’
পোর্ট হল বন্দর। সেখানে কেন যেতে হবে বোঝা যাচ্ছে না। বিনয় বিমূঢ়ের মতো জিগ্যেস করল, ‘কিন্তু রিফিউজিরা?’
বিশ্বজিৎ বললেন, ‘বিভাসরা এতক্ষণে ওদের নিয়ে সেখানে পৌঁছে গেছে। পোর্ট থেকে আমরা একসঙ্গে সেটলমেন্টে যাব।’
জিপ মোড় ঘুরে ফের দৌড় শুরু করল। এতক্ষণ দু’পাশে ছাড়া ছাড়া কিছু বাংলো জাতীয় বাড়ি চোখে পড়ছিল। কোনওটাই কাছাকাছি নয়, একটার সঙ্গে অন্যটার দূরত্ব অনেকখানি।
ক্রমশ বাড়ির সংখ্যা বাড়ছে কাঠের বাড়ির চাইতে পাকা বিল্ডিং বেশি। একতল্ম, দোতলা, মাঝে মাঝে দু-একটা তেতলাও। বেশ কগ কাঠ চেরাইয়ের কারখানাও চোখে পড়ল। শহর এদিকটায় দস্তুর মতো জমজমাট। রাস্তায় প্রচুর লোকজন। জিপ, ভ্যান, কিছু প্রাইভেট কারও ব্যস্তভাবে পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে।

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।