বিনয়রা যে ঘরে আছে তার পেছন দিকে রয়েছে আরও পাঁচ ছ’টা অ্যাসবেস্টসের ছাউনি দেওয়া লম্বা লম্বা ঘর। সেগুলো পুনর্বাসন দপ্তরের কর্মীদের আস্তানা। সেখানেও কেউ জেগে আছে মনে হল না।
বাইরে বেরিয়ে কয়েক পা এগিয়ে থেমে গিয়েছিল বিনয়রা। স্নায়ুগুলো টান টান করে আন্দাজ করতে চেষ্টা করলেন শেখরনাথ। বিনয়ও তা-ই করল। কয়েক লহমা বাদে শেখরনাথ দিক নির্ণয় করে ফেললেন।–’আমার কী মনে হয় জানো, কান্নার আওয়াজটা আসছে নতুন রিফিউজিদের তাঁবুগুলোর দিক থেকে।‘
বিনয়েরও তেমনটাই মনে হচ্ছে। সে আস্তে মাথা নাড়ল।–’হ্যাঁ। ওখানেই যাওয়া যাক।‘
শেখরনাথ বললেন, ‘একটু দাঁড়াও।’ বলেই হাঁকডাক করে পরিতোষদের ঘুম ভাঙালেন। পরিতোষ, ধনপত এবং রিহ্যাবিলিটেশনের অন্য সব কর্মীরা হুড়মুড় করে বেরিয়ে এল।
অবাক বিস্ময়ে পরিতোষ জিগ্যেস করল, ‘কী অইছে (হয়েছে) কাকা?’
শেখরনাথ বললেন, ‘শুনতে পাচ্ছ না?’
চোখে ঘুমের ঘোর ছিল পরিতোযের। লহমায় সেটা কেটে গেল। কান্নার শব্দটা তার কানে গেছে। কান খাড়া করে শুনতে শুনতে বলল, ‘মনে লয় (হয়), নয়া রিফিউজিগো যে তাম্বুগুলানে (তবুগুলোতে) রাখা অইছে (হয়েছে) হেইহান (সেখান) থিকা আওয়াজহান আইতে আছে (আসছে)। কিন্তুক এত রাইতে অমুন কইরা কান্দে ক্যাডা (কে কাঁদে)? ক্যানই বা কান্দে (কেনই বা কাঁদছে)?’
‘সেটা জানার জন্যেই তো চলে এসেছি। তুমি এখানকার একজন বড়কর্তা। তোমার এত ঘুম যে এই সেটলমেন্টে কত দুঃখে কে কাঁদছে, টেরই পাও না? আরও দু-চারটে লণ্ঠন জ্বালিয়ে আনতে বল তোমার লোকজনদের। তারপর দেখি কী হল।‘
বর্মীরা চটপট পাঁচ ছ’টা জ্বলন্ত হ্যারিকেন জ্বেলে নিয়ে এল। এদিকে ব্যারাকে যে উদ্বাস্তুরা রয়েছে তাদেরও ঘুম ভেঙে গেছে। অনেকেই দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। কয়েকজনের হাতে কেরোসিনের কুপি বা লণ্ঠন।
ডানপাশে খানিকটা এগিয়ে যেতে দেখা গেল, একুশটা তাবুর প্রায় সবাই বেরিয়ে এসে গোল হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কাকে যেন ব্যগ্রভাবে কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছে। এখানেও প্রচুর আলো। এতজন একসঙ্গে কথা বলায় গুঞ্জনের মতো শোনাচ্ছে।
পরিতোষ ভীষণ ব্যস্ত হয়ে পড়ল।–’এই, তোমরা সইরা সইরা (সরে সরে) খাড়াও (দাঁড়াও)। কাকায় আইছেন (কাকা এসেছেন)। পথ দ্যাও, (দাও)।‘
উদ্বাস্তুদের জটলাটা সসম্ভ্রমে খানিকটা দূরে সরে রাস্তা করে দিল। এবার চোখে পড়ল একটি মেয়েমানুষ, ষাটের কাছাকাছি বয়স, গাল ভাঙা, চোখ গর্তে ঢোকানো, কণ্ঠার হাড় ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, মাথায় কাঁচাপাকা চুল, পরনে এই সেটলমেন্ট থেকে দেওয়া কালো-পাড় সাদা শাড়ি, ঘোমটা নেই–বসে আছে ঘাসের জমিতে। আর কেঁদেই চলেছে। বিরামহীন। তার চারপাশে মানুষের দঙ্গল। সেদিকে এতটুকু হুশ নেই।
শেখরনাথ নরম গলায় বললেন, ‘কেঁদো না মা। কী কষ্ট আমাকে বল—’
মেয়েমানুষটি উত্তর দিল না। তার ডাইনে-বাঁয়ে সামনে-পেছনে এত যে লোকজন, এতটুকু দৃকপাত নেই। সে কেঁদেই চলেছে, কেঁদেই চলেছে।
আরও দু’চার বার বলেও মেয়েমানুষটির কাছ থেকে কিছুই জানা গেল না। অগত্যা ভিড়ের দিকে চোখ ফিরিয়ে শেখরনাথ জানতে চাইলেন।-–’কাদের সঙ্গে এ এসেছে?’
ভিড়ের ভেতর থেকে একটি ক্ষয়াটে চেহারার আধবয়সি লোক আর বছর চল্লিশেকের এক শীর্ণ মেয়েমানুষ ক’পা এগিয়ে এল। পুরুষটি বলল, ‘আমাগো লগে (সঙ্গে) আইছে বড়কর্তা–’ শেখরনাথ যে জেফ্রি পয়েন্টের সবচেয়ে মান্যগণ্য মানুষ, অশেষ প্রতাপ তার সেটা এখানে পা দিয়েই টের পেয়েছে সে।
শেখরনাথ জিগ্যেস করলেন, ‘এ তোমার কে হয়—মা?’
অস্বস্তি ফুটল লোকটার চোখেমুখে। ভেতরে ভেতরে তার যেন দ্বিধা চলছে। একটু চুপ করে থেকে সেটা কাটিয়ে মিনমিনে গলায় বলল, ‘উই মায়ের লাখান (মত)—’
লোকটার কথা বলার ভঙ্গি, চোখমুখের চেহারা–সব মিলিয়ে কী যেন রয়েছে। ছলচাতুরি? কেমন যেন ধন্দে পড়ে গেলেন শেখরনাথ। সোজাসুজি তার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন।–’মায়ের মতো বলছ। তবে কি মা নয়?’
শেখরনাথের কণ্ঠস্বরে এমন এক দৃঢ়তা ছিল যে চুপসে গেল লোকটা। বারকয়েক ঢোক গিলে বলল, ‘তাইলে (তা হলে) আপনেরে হগল (সকল) কথা খুইলা কইতে অয় (হয়)।‘
‘সত্যি কথা বলবে। যদি বুঝি কোনওরকম বজ্জাতি রয়েছে, এখানকার জমিজমা তো পাবেই না, তোমাকে এখানে থাকতেও দেওয়া হবে না।
হাতজোড় করে শিরদাঁড়া ঝুঁকিয়ে লোকটা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল, ‘মা কালীর কিরা (দিব্যি), সাচাই (সত্যিই) কমু। মিছা কইলে য্যান আমার মাথায় ঠাটা (বাজ) পড়ে।‘
ওদিকে আশ্চর্য একটা ব্যাপার ঘটে গেল। বয়স্কা মেয়েমানুষটি এতক্ষণ অনর্গল কেঁদে যাচ্ছিল। আচমকা একেবারে চুপ হয়ে গেল। তারপর হাতের ভর দিয়ে উঠে এলোমেলো পায়ে টলতে টলতে সামনের একটা তাঁবুতে ঢুকে পড়ল। বাইরে থেকে তাকে আর দেখা যাচ্ছে না।
বেশ অবাকই হলেন শেখরনাথ। আধবুড়ো সেই লোকটাকে বললেন, ‘বৃদ্ধা কি ওই তাবুতে থাকে?
লোকটা আস্তে ঘাড় কাত করল।’হ। আমরাও উই তাম্বুতে থাকি। আমাগো লগে (সঙ্গে) হ্যায়ও (সেও) থাকে।
শেখরনাথ এবার পরিতোষের দিকে তাকালেন।–’বিনয় আর আমার বসার জন্যে টুল-ফুল কিছু এনে দিতে পার?’
পরিতোষ রিহ্যাবিলিটেশনের বর্মী কর্মীদের হাত নেড়ে ইঙ্গিত করতেই চোখের পলকে কোত্থেকে তারা দুটো চেয়ার নিয়ে এল। বসতে বসতে শেখরনাথ সেই লোকটাকে জিগ্যেস করলেন, ‘তোমার নাম কী?’

ভালো ছিল
এর আগে– অনেক দিন আগে কেয়া পাতার নৌকা পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, তখন বয়স ছিল কুড়ি একুশ, এখন বাষট্টি , ঠিক তেমনই আগ্রহ নিয়ে উপন্যাসটি শেষ করলাম। কম্পিউটারাইজড প্রিন্টের জন্য কিছু মুদ্রন প্রমাদ থাকলেও ভীষন ভালো লাগলো। প্রফুল্ল রায়ের লেখা খুব ভালো লাগে। তবে শেষটা জানা গেল না।পরনতি কি হল জানার জন্য মনটা উতলা হয়ে থাকলো।